বন্ধ হতে যাওয়া প্রতিষ্ঠানটি এখন দেশের অহংকার

খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেড

দেনার দায়ে বন্ধ হতে যাওয়া খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেডকে ১৯৯৯ সালে নৌবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করেছিল তত্কালীন আওয়ামী লীগ সরকার। নৌবাহিনীর দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও যোগ্য নেতৃত্বে কয়েক বছরের মধ্যে দায়-দেনা পরিশোধ করে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয় শিপইয়ার্ডটি। অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে এ অঞ্চলের শিল্প কারখানার জগতে।

২০১৩ সালে ৫টি ছোট যুদ্ধজাহাজ (পেট্রোল ক্রাফট) তৈরির অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এবার বড় আকারের অত্যাধুনিক দুইটি যুদ্ধ জাহাজ নির্মাণ কাজ শুরু করছে প্রতিষ্ঠানটি। যা লার্জ পেট্রোল ক্রাফট বা এলপিসি নামে পরিচিত। দেশের মাটিতে বড় যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের উদ্যোগ এটাই প্রথম। যা দেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্পে নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। সূত্র মতে, দেশের মাটিতে এত বড় উদ্যোগ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন অনেকে। কারণ এর আগের এলপিসিগুলো চীনে তৈরি করা হয়েছিল। পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রীসহ নৌবাহিনীর পদস্থ কর্মকর্তাদের সুপারিশে এলপিসি নির্মাণের দায়িত্ব খুলনা শিপইয়ার্ডকে দেয়া হয়। আর রবিবার সেই যুদ্ধজাহাজের নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

শিপইয়ার্ড সূত্রে জানা গেছে, নৌবাহিনী দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে এ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি ১১৬টি জলযান নির্মাণ এবং ৫২১টি জলযান মেরামত করেছে। সাবমেরিন হ্যান্ডলিংয়ে দুইটি টাগবোট নির্মাণের জন্য নৌবাহিনীর সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। ২০১৪ সালে বিআইডব্লিউটিসির জন্য ১৫৮ কনটেইনারবাহী জাহাজ নির্মাণ কাজ শুরু হয়। এছাড়া ব্যক্তি মালিকানাধীন আরো দুইটি কার্গো-কাম-কনটেইনার জাহাজ নির্মাণ কাজ চলছে।

সূত্র জানায়, এলপিসি দুইটি নির্মাণের জন্য গত বছরের ৩০ জুন নৌবাহিনীর সাথে চুক্তি করে খুলনা শিপইয়ার্ড। প্রতিটির জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। অথচ একই ধরনের দুইটি এলপিসি চীন থেকে তৈরি করতে খরচ হচ্ছে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা।

লার্জ পেট্রোল ক্রাফট প্রতিটির দৈর্ঘ্য ৬৪ দশমিক ২ মিটার এবং প্রস্থ ৯ মিটার। এর গভীরতা হবে ৪ মিটার। সমুদ্র পথে ঘণ্টায় ২৫ নটিক্যাল মাইল বেগে চলবে। জাহাজে ৭০ জন একসাথে থাকার ব্যবস্থা থাকবে। শুরুর দুই বছরের মধ্যে যুদ্ধ জাহাজের নির্মাণ কাজ শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। চীনের যুদ্ধজাহাজ বিশেষজ্ঞরা একাজে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা দিচ্ছে।

জাহাজে থাকবে স্বয়ংক্রিয় মিসাইলসহ অত্যাধুনিক সব যুদ্ধাস্ত্র। আরো থাকবে একটি মাল্টি রোল গান, একটি সিঙ্গেল ব্যারেল গান, দুইটি ট্রিপল টুবার টর্পেডো লাঞ্চার, দুইটি নেভিগেশন রাডার, একটি এয়ার অ্যান্ড সারফেস সার্চ রাডার, একটি ট্রাকিং রাডার এবং একটি হাল মাউন্টেড সোনার থাকবে। এই এলপিসি শত্রুপক্ষের সাবমেরিন শনাক্ত এবং তার ওপর আক্রমণ করতে সক্ষম। এটি দিয়ে সমুদ্র উপকূলীয় এলাকায় টহলও দেয়া যাবে।

সূত্র আরো জানায়, জাহাজের প্লেট, ইঞ্জিনসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম বিদেশ থেকে আমদানি করা হবে। শিপইয়ার্ডের ২৫০ জন শ্রমিক ও প্রকৌশলী জাহাজ নির্মাণ কাজে অংশ নিবে।

১৯৫৪ সালে রূপসা নদীর পাড়ে খুলনা শিপইয়ার্ড নামের এ প্রতিষ্ঠান স্থাপনের কাজ শুরু হয়। প্রায় ৬৯ একর জমির উপর নির্মিত এ প্রতিষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয় ১৯৫৭ সালের ২৩ নভেম্বর। বিভিন্ন প্রকার নৌযান, ভারী প্রকৌশল সরঞ্জামাদি তৈরি ও মেরামতের কাজ দিয়েই খুলনা শিপইয়ার্ডের যাত্রা শুরু হয়। ধীরে ধীরে এ প্রতিষ্ঠানের কাজের পরিধি আরো সম্প্রসারিত হতে থাকে। তাদের নির্মাণ কাজের সঙ্গে যুক্ত হয় অয়েল ট্যাঙ্কার, সার-বীজ পরিবহন কার্গো, বার্জ, কৃষি সেচ পাম্পসহ বিভিন্ন সামগ্রী। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে আশির দশকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত খুলনা শিপইয়ার্ড লাভজনক প্রতিষ্ঠান ছিল; কিন্তু ১৯৮৫ সালের শেষ দিকে এসে খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেডের তার সুনাম-সুখ্যাতি ক্রমে ক্রমে ম্লান হতে শুরু করে।