বাংলাদেশ ‘ক্ষুদে ডাক্তার’ কার্যক্রম আগ্রহ বাড়ছে বহির্বিশ্বে

জাপানে গবেষণা শুরু

বাংলাদেশের ‘ক্ষুদে ডাক্তার’ কার্যক্রম নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে বহির্বিশ্বেও। স্কুলের শিশুদের মাধ্যমে শিশুদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার এই কার্যক্রম সম্পর্কে গবেষণা করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে জাপানের একটি গবেষক দল। এ কর্মসূচি কি, সম্ভাবনা ও ঝুঁঁকি কতটুকুসহ নানা বিষয় নিয়ে চলতি বছরের আগস্ট মাসেই গবেষণা শুরু করছেন জাপানি গবেষক ড. তোমকাওয়া সাচি।

২০১১ সালে ‘ক্ষুদে ডাক্তার’ কার্যক্রম প্রচলন করেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের তৎকালীন পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ। অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ সংবাদকে বলেন, দেশে এবং দেশের বাইরেও আমাদের যারা উন্নয়ন সহযোগী আছে তারা ‘ক্ষুদে ডাক্তার’ কার্যক্রমকে বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য বিরাট একটা কর্মসূচি বলে মনে করছে। যা জনস্বাস্থ্যের জন্য অনেক উপকারি। এমনকি বহির্বিশ্বেও এ কার্যক্রম সম্পর্কে ভীষণ আগ্রহ বাড়ছে। এটা অবশ্যই আমাদের জন্য খুশির খবর। ‘ক্ষুদে ডাক্তার’ কার্যক্রম সম্পর্কে জাপানি গবেষক ড. তোমকাওয়া সাচি ইতোমধ্যে গবেষণা শুরু করছেন। গবেষক দলে আমি নিজেও রয়েছি।

জানা যায়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার একটি অংশ ফাইলেরিয়াসিস নির্মূল ও কৃমি নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম। বিদ্যালয়ে কৃমি নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে জোরদার করার লক্ষ্যে প্রাথমিক পর্যায়ে ২০১১ সাল থেকে উদ্ভাবন করা হয় এই ক্ষুদে ডাক্তার কার্যক্রম। এর পর ধীরে ধীরে সারাদেশ জুড়ে শিক্ষকদের মধ্যে আগ্রহের সৃষ্টি করে। শিক্ষার্থীরাও এই কার্যক্রমকে খুব পছন্দ করে। পর্যায়ক্রমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে কৃমি নিয়ন্ত্রণ, জলাতঙ্ক, ম্যালেরিয়া, পুষ্টিহীনতা, ভিটামিন এ-প্লাস ক্যাম্পেইন, ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য পরিচর্যা বিষয়ে স্বাস্থ্য-শিক্ষা দেয়াসহ শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা হয়।

এই কর্মসূচি প্রসঙ্গে অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন; শিশুদের সংশ্লিষ্ট কিছু বিষয়ে স্বাস্থ্য শিক্ষা দেয়াই এই কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য ছিল। এর সঙ্গে পরবর্তিতে আমরা যুক্ত করি কৃমির ওষুধ খাওয়ানো। প্রতিবছর আমরা আড়াই কোটিরও বেশি শিশুকে কৃমির ওষুধ খাওয়াই। এই কাজটাও আমরা ক্ষুদে ডাক্তারদের মাধ্যমে করি। সেখানে আমরা সাফল্য পেয়েছি। এরপর আমাদের মাথায় আসে বাচ্চাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা কার্যক্রম যেটা প্রয়োজন সেটা হচ্ছে না। তখন সারাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের নিয়ে ক্ষুদে ডাক্তার কার্যক্রম শুরু করি।

তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে সচেতন করার পাশাপাশি মানুষের প্রতি সহমর্মিতা, মমত্ববোধ জাগরিত করে একজন প্রকৃত সমাজসচেতন, দেশপ্রেমিক ও সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে এ কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে। এই ক্ষুদে ডাক্তার টিম থেকেই অনেকে ভবিষ্যতে প্রকৃত ডাক্তার হয়ে দেশ ও জনগণের সেবায় এগিয়ে আসবে বলে মনে করেন তিনি।

বে-নজির আহমেদ জানান, তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে ক্ষুদে ডাক্তার নির্বাচন করা হয়। প্রতি শ্রেণীর জন্য গড়ে ৩ জন করে ক্ষুদে ডাক্তার প্রয়োজন। কোন বিদ্যলয়ে ৫টি শ্রেণী থাকলে ১৫ জন ক্ষুদে ডাক্তার লাগবে, শাখা বেশি হলে অনুরূপভাবে ক্ষুদে ডাক্তারের সংখ্যা বাড়বে। দেশের এক লাখেরও বেশি প্রাথমিক পর্যায়ের বিদ্যালয়ের আড়াই কোটি শিক্ষার্থীর জন্য ১৫ লাখের মতো ক্ষুদে ডাক্তার কাজ করবে।

জানা যায়, তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণীর তুলনামূলকভাবে চটপটে এবং বাকপটু শিক্ষার্থীদের ‘ক্ষুদে ডাক্তার’ বানাতে অগ্রাধিকার দেয়া হয়। স্বাস্থ্য পরীক্ষা শুরুর দুই তিনদিন আগেই প্রত্যেক টিম যার যার নির্ধারিত ক্লাসে উপস্থিত হয়ে আগাম ঘোষণা দেয়। এরপর শ্রেণীভিত্তিক সকল শিক্ষার্থীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্পন্ন করে। স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর তারা শ্রেণীভিত্তিক মোট কতজন শিক্ষার্থী, কতজনের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়েছে, শ্রেণীভিত্তিক শিক্ষার্থীদের গড় ওজন, উচ্চতা এবং অস্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন শিক্ষার্থীদের তালিকা প্রণয়ন ও সংখ্যা নির্ণয় করে তা নির্ধারিত ফরমে লিপিবদ্ধ ও বিদ্যালয়ে সংরক্ষণ করে।

‘ক্ষুদে ডাক্তার’ কার্যক্রম এখন স্বাস্থ্য বিভাগের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের নিয়মিত কর্মসূচির অংশ। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরসহ ইউএসএইড, সেভ দি চিলড্রেন, জাইকাসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান এই কর্মকান্ডে যুক্ত হয়েছে।