বাংলাদেশের বর্তমান অগ্রগতিতে বিস্মিত

বহুভাষাবিদ প্রাচ্যবিশারদ ড. ভিতালি ভিয়াচিস্লাভোভিচ নাউমকিন মস্কো রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বরাজনীতি অনুষদের চেয়ারম্যান, রুশ বিজ্ঞান একাডেমির প্রাচ্যবিদ্যা ইনস্টিটিউটের পরিচালক, মস্কোর সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট এবং প্রাচ্যবিষয়ক সাময়িকপত্র ভাস্তোক-এর প্রধান সম্পাদক। প্রাচ্যবিদ্যা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জীবন ও কর্মবিষয়ক একটি গ্রন্থ রচনা প্রকল্পের কাজে তিনি সম্প্রতি ঢাকায় এলে প্রথম আলোর সঙ্গে তাঁর আলাপ হয়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আব্দুল কাইয়ুম ও মশিউল আলম

প্রথম আলো : আমরা জেনেছি, বাংলাদেশে এটাই আপনার প্রথম সফর। কেমন লাগছে বাংলাদেশ?

ভিতালি নাউমকিন : আগে না এলেও বাংলাদেশ সম্পর্কে আমার ধারণা আছে। আর আমার এই আসাটা পর্যটক হিসেবে নয়, আমি একজন বিশেষজ্ঞ। বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস সম্পর্কে আমার যৎসামান্য ধারণা আছে। আমি এ দেশের ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস সম্পর্কেও ওয়াকিবহাল এবং মনোযোগের সঙ্গে এ দেশের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করার চেষ্টা করি। বাংলাদেশ আমার পছন্দের একটা দেশ। আমি সেই সব দেশ ও জাতিকে পছন্দ করি, যাদের জাতীয় স্বাতন্ত্র্য রয়েছে, যাদের ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্যের শিকড় গভীর। বাংলাদেশ প্রথমত সে রকমই একটা দেশ। এ দেশের মানুষ মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে আত্মোৎসর্গ করেছে, রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করে অসংখ্য প্রাণের বিনিময়ে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব অর্জন করেছে।
প্রথম আলো : আর বর্তমানের বাংলাদেশ?
ভিতালি নাউমকিন : বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশ যে অগ্রগতি সাধন করেছে, তাতে আমরা বিস্মিত হয়েছি। কারণ, স্বাধীনতার সময় দেশটি অত্যন্ত দরিদ্র ছিল, এর সমস্যার শেষ ছিল না। কিন্তু সেই অবস্থা থেকে বাংলাদেশ এখন অনেক এগিয়ে গেছে। প্রায় ১৭ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ, কিন্তু এর আয়তন সে তুলনায় খুবই কম, মাত্র ১ লাখ ৪৪ হাজার বর্গকিলোমিটার। রাশিয়া পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দেশ, আয়তন ১ কোটি ৬৩ লাখ ৭৭ হাজার বর্গকিলোমিটার, বাংলাদেশের চেয়ে ১৬৩ গুণ বড়। সেই রাশিয়ার লোকসংখ্যাও বাংলাদেশের চেয়ে কম, মাত্র ১৪ কোটি। এতটুকু একটা দেশে এই বিপুল জনগোষ্ঠীর টিকে থাকাই তো কঠিন ব্যাপার! কিন্তু বাংলাদেশ ৬ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে, নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় উঠে এসেছে। এ দেশে এখন প্রায় শতভাগ ছেলেমেয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাচ্ছে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীদের অংশগ্রহণ অনেক বেড়েছে। আমার মতে, বাংলাদেশের এই সাফল্য অত্যন্ত লক্ষণীয় একটা ব্যাপার।
প্রথম আলো : ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সোভিয়েত ইউনিয়ন সফরে গিয়েছিলেন। আমরা জেনেছি, আপনি সে সময় দোভাষীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে আপনি কেমন দেখেছেন?
ভিতালি নাউমকিন : প্রথমেই আমার মনে হয়েছে, তিনি একজন ক্যারিশমাটিক নেতা। তিনি যখন বক্তৃতা করছিলেন, তখন তাঁর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, দায়িত্ববোধ, দূরদর্শিতা ও প্রজ্ঞার প্রকাশ ঘটছিল। আর তিনি তাঁর দেশ ও মানুষের জন্য যা করেছেন, যেটা আমরা স্বাধীনতাযুদ্ধের আগে থেকে পর্যবেক্ষণ করেছি, সেটা আমাদের কাছে ছিল অত্যন্ত আবেদনময়। তিনি ছিলেন সুদর্শন। তাঁর দৈহিক উচ্চতায়, মানসিক দৃঢ়তায়, সুচিন্তিত, পরিশীলিত ও বুদ্ধিদীপ্ত কথাবার্তায় আমার মনে তাঁর ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে যে ছাপ পড়েছিল, তা এখনো প্রাঞ্জল হয়ে আছে। আমি মনে করি, এ রকম একজন মহান নেতাই জাতির পিতা অভিধা পাওয়ার যোগ্য। আমি অত্যন্ত বেদনাহত হই, যখন আমার মনে পড়ে যে তাঁর সেই মস্কো সফরের বছর খানেক পরেই তাঁকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। তবে তাঁর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের উন্নতিসাধনের যে বিষয়টি আমার পর্যবেক্ষণে এসেছে, তাতে আমার মনে হয়, তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা হিসেবে সেই মহান নেতাকেই প্রতীকায়িত করছেন।
প্রথম আলো : যেমন? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রধান দিকগুলো কী?
ভিতালি নাউমকিন : যেমন, বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা নির্ধারণ নিয়ে সমস্যাটি দীর্ঘ চার দশক ধরে অমীমাংসিত ছিল, তাঁর নেতৃত্বে সেটার সমাধান হয়েছে। এটি কিন্তু অত্যন্ত জটিল একটি সমস্যা; সমুদ্রসীমা নিয়ে নরওয়ের সঙ্গে রাশিয়ার বিরোধ ছিল অত্যন্ত জটিল। অতি সম্প্রতি আমরা সেটার সমাধান করতে পেরেছি। তারপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রজ্ঞাময় কূটনীতির কারণে ভারতের সঙ্গে ছিটমহল সমস্যাটিরও সমাধান হয়েছে। আমি যদি ভুল না করি, এই সমস্যার সমাধান হলো দীর্ঘ ৪৪ বছর পরে। এ ছাড়া বাংলাদেশের মতো একটা অত্যন্ত জনবহুল দেশ তার অজস্র সমস্যার মধ্যে অনেক সমস্যা যে দ্রুতগতিতে সমাধান করেছে, যেগুলোর কথা আমি আগেই বলেছি, তাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবদান বিরাট।
প্রথম আলো : সামাজিক ক্ষেত্রে তাঁর অবদান?
ভিতালি নাউমকিন : সামাজিক ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় আমি উল্লেখ করতে চাই। সেটা হচ্ছে নারীর ক্ষমতায়ন ও উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবদান। আমি আরব ও ইসলামি সমাজ নিয়ে গবেষণা ও পড়াশোনা করি। মুসলমান সমাজ আমার একটা আগ্রহের বিষয়। আরব বিশ্বে বা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর মধ্যে বেশি দেশ খুঁজে পাওয়া যাবে না, যেখানে নারী প্রধানমন্ত্রী বা নারী প্রেসিডেন্ট আছেন, বেনজির ভুট্টো কিংবা মেঘবতী সুকর্ণপত্রীর মতো হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া। এঁদের মধ্যে শেখ হাসিনা একজন বিশ্ব পর্যায়ের নেতা হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পাচ্ছেন। বাংলাদেশকে আমি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বিশ্বের একটা মডেল হিসেবে বিবেচনা করি। কারণ, এখানে নারীদের অগ্রগতি হয়েছে অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি। এবং সেটা ঘটেছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের গুণে। তা ছাড়া, তিনি উগ্র ইসলামপন্থা যেভাবে দমন করতে সক্ষম হয়েছেন, সেটাও উল্লেখ করতে হয়। তাঁর নেতৃত্বের এসব সাফল্যময় দিক আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, সে কারণেই আমরা ইনস্টিটিউট অব ওরিয়েন্টাল স্টাডিজ থেকে উদ্যোগ নিয়েছি তাঁর জীবন ও কর্ম সম্পর্কে একটা গ্রন্থ রচনার।
প্রথম আলো : কী ধরনের গ্রন্থ হবে সেটা? সেই গ্রন্থের পাঠক কারা হবে?
ভিতালি নাউমকিন : ইনস্টিটিউট অব ওরিয়েন্টাল স্টাডিজ থেকে আমরা একটা প্রকল্প হাতে নিয়েছি, যার লক্ষ্য হচ্ছে প্রাচ্যের উন্নয়নশীল দেশগুলোর যেসব নেতা, রাষ্ট্রনায়ক তাঁদের দেশ ও জাতির উন্নয়ন সাধনে অসাধারণ অবদান রেখেছেন বা রাখছেন, তাঁদের গোটা প্রাচ্যের জনসাধারণের সামনে তুলে ধরা। এর আগে আমরা মালয়েশিয়ার মাহাথির মোহাম্মদকে নিয়ে একটি গ্রন্থ রচনা ও প্রকাশ করেছি। এখন চলছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্পর্কে একটি গ্রন্থ রচনার কাজ। গ্রন্থটি আমরা প্রকাশ করব একসঙ্গে চারটি ভাষায়: রুশ, বাংলা, আরবি ও ইংরেজিতে। বইটির আরবি সংস্করণ করা হবে এই উদ্দেশ্যে, যেন আরব বিশ্বের জনগণ, বিশেষত নারীরা শেখ হাসিনার জীবন ও কর্ম সম্পর্কে জানতে পারেন।
প্রথম আলো : এখন আপনার দেশ সম্পর্কে কিছু বলুন। প্রেসিডেন্ট পুতিনের নেতৃত্বে কেমন চলছে রাশিয়া?
ভিতালি নাউমকিন : সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির পর রাশিয়ার অর্থনীতি একদমই ভেঙে পড়েছিল। সামাজিক অস্থিরতা, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, বেকারত্ব ইত্যাদি সমস্যায় পর্যুদস্ত হয়ে পড়েছিল রাশিয়া। ভ্লাদিমির পুতিন প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর রাশিয়াকে সেই দুরবস্থা থেকে টেনে তুলেছেন। অর্থনীতি প্রাণ ফিরে পেয়েছে, ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ ঘটেছে এবং রাশিয়া বিশ্ব অর্থনীতির অংশীভূত হয়েছে। পুতিনের দৃঢ় নেতৃত্বের কারণেই এসব সম্ভব হয়েছে। অবশ্য ভূরাজনৈতিক কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় মিত্র দেশগুলোর বৈরিতায় রাশিয়াকে এই মুহূর্তে কিছু সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। তবে সেই সব সমস্যা কাটিয়ে ওঠারও চেষ্টা চলছে। পশ্চিমের সঙ্গে আমাদের সমস্যা থাকার পরেও বিশ্বের সব অঞ্চলে আমাদের বন্ধুও আছে। আমরা এখন ব্রিকস জোটভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে, বিশেষত চীন, ভারত ও ব্রাজিলের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা বাড়ানোর প্রতি বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। আমার ধারণা, পুতিন রাশিয়ার জন্য একজন উপযুক্ত নেতা। তাঁর নেতৃত্বে রাশিয়া আরও শক্তিশালী হবে।
প্রথম আলো : রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের কী কী ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও বাড়ার সুযোগ আছে?
ভিতালি নাউমকিন : কিছু ক্ষেত্রে রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতা ইতিমধ্যে আছে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। বিদ্যুৎ বাংলাদেশের ভীষণ প্রয়োজন, কারণ বাংলাদেশ উন্নয়ন করতে চায়, মধ্য আয়ের দেশ হতে চায়। বিদ্যুৎ ছাড়া তা হবে না। উন্নয়নের জন্য আরও নানা ধরনের প্রযুক্তি প্রয়োজন। বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, কারিগরি জ্ঞান ও দক্ষতা ছাড়া ধারাবাহিকভাবে উন্নয়ন অব্যাহত রাখা যায় না। রাশিয়া ও বাংলাদেশের মধ্যে কিছু কিছু ব্যবসা-বাণিজ্য আছে, বাংলাদেশের কিছু পণ্য রাশিয়ায় রপ্তানি হয়, তবে সীমিত মাত্রায়। রপ্তানি বাড়ানোর বিপুল সুযোগ আছে। একইভাবে রাশিয়া থেকে অনেক প্রযুক্তি ও শিল্পের কাঁচামাল এ দেশে আমদানি হতে পারে। এক কথায়, বাণিজ্যিক লেনদেন বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে প্রভূত পরিমাণে।
প্রথম আলো : সোভিয়েত আমলে বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী সোভিয়েত সরকারের বৃত্তি নিয়ে উচ্চশিক্ষা লাভ করেছেন। এখন আর আগের মতো সেই সুযোগ নেই। রুশ সরকার কি বাংলাদেশে ছাত্রবৃত্তি বাড়াতে পারে না?
ভিতালি নাউমকিন : এখনো রুশ সরকার কিছু বৃত্তি দেয়, তবে এই সংখ্যা আরও বাড়ানো উচিত বলে আমি মনে করি। কারণ, বাংলাদেশের অনেক বিষয়ে আরও প্রচুরসংখ্যক বিশেষজ্ঞ প্রয়োজন, আরও চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী-প্রযুক্তিবিদ, কৃষিবিদ প্রয়োজন।
প্রথম আলো : আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
ভিতালি নাউমকিন : আপনাদেরও অনেক ধন্যবাদ।