সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বিনিয়োগে আকর্ষণীয় বাংলাদেশ

তৃতীয় বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট সামিটে বক্তারা

বাংলাদেশে গত এক বছরে বিদ্যুত্, গ্যাস ও অবকাঠামো খাতে বড় ধরনের উন্নয়ন হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে যোগাযোগ ব্যবস্থায়ও আমূল পরিবর্তন আসবে। কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও বাংলাদেশ এখন বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় স্থান। তাই বাংলাদেশে বিনিয়োগের এখনই উপযুক্ত সময়। গতকাল সিঙ্গাপুরের সেন্ট রেগিজ হোটেলে ‘তৃতীয় বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট সামিট, এশিয়া’য় বক্তারা একথা বলেন।

বিনিয়োগকারীদের এ সম্মেলনে সরকারের পক্ষ থেকে প্রদত্ত সহযোগিতার চিত্র তুলে ধরা হয়। বলা হয়, বাংলাদেশ গত এক দশকে তার যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছে। এ সময়ে অর্থনীতিতে বাংলাদেশের সাফল্য ছিল ঈর্ষণীয়। অন্যদিকে বিনিয়োগকারীদের পক্ষ থেকে অবকাঠামো বাধাসহ নিয়ন্ত্রক সংস্থা সৃষ্ট বিভিন্ন অসুবিধার বিষয় তুলে ধরা হয়। তারা উল্লেখ করেন, সস্তা শ্রমশক্তির কারণে বাংলাদেশ আকর্ষণীয় হলেও এখনো বেশকিছু বড় বাধা রয়ে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে যানজটসহ অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিধিনিষেধ ও নীতিগত বিষয়ে সরকারের অবস্থার পরিবর্তন।

স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের সিইও আবরার আনোয়ারের উদ্বোধনী বক্তৃতার মাধ্যমে সকাল ৯টা ১১ মিনিটে সম্মেলন শুরু হয়। তিনি বলেন, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক বাংলাদেশের বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী। ভৌগোলিক অবস্থানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ দেশ বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ স্থান। এ সুযোগ কাজে লাগালে বিনিয়োগকারী ও বাংলাদেশ উভয়ই লাভবান হবে।

সম্মেলনে শতাধিক বিদেশী প্রতিষ্ঠানসহ ২৫০ জন প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন। এর মধ্যে জেপি মরগান, এয়ারবাস, অ্যাবার্ডিন অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট, প্রুডেনশিয়াল ইন্স্যুরেন্স, ডয়েচে ব্যাংক অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক ও পেট্রো ভিয়েতনাম অন্যতম।

বাংলাদেশের সামাজিক উন্নয়নের ভূয়সী প্রশংসা করে সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী। তিনি বলেন, বাংলাদেশ কেবল অর্থনীতিতেই এগিয়ে যাচ্ছে না, সামাজিকভাবেও এগিয়ে যাচ্ছে। এ উন্নয়নকে ‘সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট’ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, গত এক দশকে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পুষ্টি উন্নয়নে বাংলাদেশ সীমাহীন অগ্রগতি দেখিয়েছে। নারী শিক্ষার উন্নয়ন, মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার কমানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ রেকর্ড সাফল্য দেখিয়েছে। এক্ষেত্রে প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলংকার চেয়েও অনেক এগিয়ে বাংলাদেশ।

গওহর রিজভী বলেন, বাংলাদেশ আর আগের অবস্থানে নেই। তলাবিহীন ঝুড়ি, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়ের বদনাম থেকে উঠে এসে বাংলাদেশ এখন নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ। শিগগিরই আমরা মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হব। ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশ কানেক্টিভিটির কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে। প্রতিবেশী বৃহত্ দুটি দেশ চীন ও ভারতে রয়েছে বাংলাদেশী পণ্যের ডিউটি ফ্রি প্রবেশাধিকার। এ সুযোগ কাজে লাগাতে অবশ্যই বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশকে বেছে নেবেন।

তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশকে নিয়ে আমরা আত্মবিশ্বাসী। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, রাজনীতি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত করবে না। তাছাড়া রাজনৈতিক সমস্যাও কমে এসেছে। বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশ করে তিনি বলেন, এ দেশে বিনিয়োগ নিরাপদ, বিনিয়োগ থেকে রিটার্ন বেশি। তাছাড়া বাংলাদেশের ক্রেডিট রেটিংও ভালো। ঋণগ্রহীতা হিসেবেও বাংলাদেশের সুনাম রয়েছে। তাই আপনারা নির্দ্বিধায় বিনিয়োগ করুন।

বাংলাদেশ সরকারের কিছু অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরে গওহর রিজভী বলেন, গত সাত বছরে দেশের বিদ্যুত্ উত্পাদনক্ষমতা ৪ হাজার থেকে ১৩ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেনের কাজ প্রায় শেষ। তিন বছরের মধ্যে পদ্মা সেতুর কাজ শেষ হবে। ঢাকার যানজট নিয়ন্ত্রণে আনতে মেট্রোরেলের কাজ হাতে নেয়া হয়েছে।

‘বাংলাদেশ টুডে’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, বাংলাদেশ ২০ বছর ধরে অর্থনীতিতে উন্নতি করে আসছে। রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও এ উন্নয়ন সম্ভব হয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে যদি অর্থনৈতিক সব অর্জন সম্ভব হয়, তাহলে বিনিয়োগকারীদের সমস্যা থাকতে পারে না।

প্যানেল আলোচনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের চিফ ইকোনমিস্ট বিরূপাক্ষ পাল বলেন, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে বর্তমান ঋণের সুদের হারের কোনো সামঞ্জস্য নেই। ২০১১ সালে মূল্যস্ফীতি ১১ শতাংশ থাকলেও ঋণের সুদের হার ছিল ১৬ শতাংশ। এখন মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশে নেমে এলেও সুদের হার ১২ শতাংশে রয়ে গেছে। তিনি ট্রেড-জিডিপি রেসিও হারেরও সমালোচনা করেন।

উচ্চ করপোরেট ট্যাক্স ও লাইসেন্স ফির সমালোচনা করেন টেলিনর এএসএর প্রকল্প ও করপোরেট ফিন্যান্স ডিরেক্টর পল স্টেট। তিনি বলেন, বাংলাদেশে তাদের বড় বিনিয়োগ। এখান থেকে তাদের রিটার্নও বেশি।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, গত ৩০ বছরে দেশের রফতানি ৩০ গুণ বেড়েছে। গত ১০ বছরে জিডিপি দ্বিগুণ হয়েছে। বাংলাদেশে আর্থিক কোনো সমস্যা নেই; সুযোগও অবারিত। আর বিনিয়োগকারীরা খুব সহজে এ সুযোগ নিতে পারেন।

স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের সিইও আবরার আনোয়ারের সঞ্চালনায় ‘সিইও ইনসাইট’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহেল আর কে হুসেন, জিফোরএস (গ্রুপ ফোরের) সিকিউর সলিউশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম চৌধুরী, আমারা কোম্পানিজের গ্রুপ সিইও সৈয়দ ফরহাদ আহমেদ ও অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজের সিইও তানভীর আলী।

সেলিম চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের মতো দেশে সিকিউরিটির ব্যবসা করে বছরে ৫০ মিলিয়ন পাউন্ড আয় করছেন তারা। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। বিনিয়োগকারীদেরও এগিয়ে যেতে হবে। আমরা মন্দ দিন দেখেছি, ভালো দিনও দেখেছি। এর মধ্যে দিয়েই এগিয়ে যাচ্ছি। বিনিয়োগকারীদেরও এগিয়ে আসতে হবে।

দ্য সিটি ব্যাংকের সিইও বলেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগের সীমাহীন সম্ভাবনা রয়েছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আইসিটি, অবকাঠামো এবং কৃষি খাতে বিনিয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ টানা এক দশকের বেশি সময় ধরে ৬ শতাংশের ওপর প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে। এ দেশে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে, রফতানি খাত ভালো করছে, রয়েছে গর্ব করার মতো রেমিট্যান্স খাত, কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যালান্সও ভালো। পৃথিবীর বড় সব গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশকে সম্ভাবনাময় দেশ হিসেবে দেখছে। তাই বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম স্থান।

সম্মেলনে ‘ডাইভার্সিফাইড ইকোনমি-এরিয়াস ফর ইনভেস্টমেন্ট’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট ফারুক সোবহান। এছাড়া করপোরেট বন্ড মার্কেট, পিপিপির অর্জন ও সম্ভাবনা, বিদ্যুত্ খাতে সরকারের উদ্যোগ, আইসিটি খাত বিষয়ে বিশেষ প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়। এগুলোর ওপর প্যানেল আলোচনা হয়।

ফিন্যান্স এশিয়ার আয়োজনে সম্মেলনের প্রধান পৃষ্ঠপোষক যৌথভাবে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক ও দ্য সিটি ব্যাংক লিমিটেড। এছাড়া কো-স্পন্সর হিসেবে ব্র্যাক ইপিএল, ব্র্যাক ব্যাংক এবং সহযোগী স্পন্সর হিসেবে থাকছে ডিএফডিএল। সম্মেলনের আয়োজকরা জানান, এ বছর সম্মেলন নিয়ে বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোর আগ্রহ বেশি ছিল। এ কারণে তাদের অংশগ্রহণও বেশি।