দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরাও পড়ছে বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী

“মানুষের মুখে মুখে বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র কথা শুনে বইটি পড়ার খুব ইচ্ছে হতো। তবে ব্রেইল পদ্ধতির বই না থাকায় প্রবল ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও তা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ অপেক্ষার পর সে সুযোগ এসেছে ব্রেইল পদ্ধতিতে বইটি প্রকাশ হওয়ায়। বইটি পড়ে জানতে পারব বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবন, তার চিন্তা-চেতনাসহ অনেক বিষয়ে।” চট্টগ্রাম সরকারি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী স্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্রী তুলি দত্ত বলছিল এসব কথা। শুধু তুলি দত্তই নয়; তার মতো অনেক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে বইটি পড়ার জন্য। তাদের সামনে এ সুযোগ এনে দিয়েছেন চট্টগ্রাম সরকারি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আদুস সামাদ।

ব্রেইল পদ্ধতিতে দেশে প্রথমবারের মতো তিনি তৈরি করেছেন বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী! এ বই বিতরণ করা হবে দেশের সরকারি বিভিন্ন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে।

এ প্রসঙ্গে শিক্ষক আবদুস সামাদ সমকালকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের মতো নিজের মধ্যেও স্বপ্ন ছিল জাতির পিতার আত্মজীবনী ব্রেইল পদ্ধতিতে তৈরি করার। শিক্ষার্থীরা অসমাপ্ত আত্মজীবনী মানুষের মুখে মুখে শুনত। এতে তাদের উপযোগী কোনো বই না থাকায় পড়তে পারত না তারা। জানতে পারত না বঙ্গবন্ধুর নানা সৃজনশীল কর্মকাণ্ড সম্পর্কেও। এমন চিন্তা থেকেই বইটি ব্রেইল করার উদ্যোগ নিই। দীর্ঘ দিন পর হলেও এ অসাধ্য সাধন করতে পারায় খুব ভালো লাগছে।’

আবদুস সামাদ জানান, ব্রেইল পদ্ধতির বইটি প্রথম পর্যায়ে ৫০ কপি ছাপানো হয়েছে। বইটি ঢাকা, চট্টগ্রাম, জাহাঙ্গীরনগর ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বরিশাল ও খুলনা জেলার সরকারি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিতরণ করা হবে। ব্রেইল পদ্ধতিতে বই তৈরি অত্যন্ত কষ্টের ও কঠিন কাজ। এতে সময়ের প্রয়োজন হয় অনেক বেশি। যে কারণে কেউ দীর্ঘ দিনেও এ কাজটি করেননি। বইটি তৈরি করতে প্রায় এক মাস লেগেছে।

ব্রেইল পদ্ধতিতে বইটি তৈরি ও ছাপানোর ক্ষেত্রে সহযোগিতা করেছে রোটারি ক্লাব অব চিটাগাং ওশান ব্লু। ব্রেইল প্রিন্টারের (ইমবোসার) মাধ্যমে প্রথমে ৫০ কপি বই ছাপানো হয়েছে। এই প্রিন্টারটি আছে শুধু নগরীর আমিন সেন্টারের পাশের বিসমিল্লাহ কার সেন্টারে। এ কাজে যুক্তরাষ্ট্রের এলাবামা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর রাগিব হাসান ও মালয়েশিয়া প্রবাসী দিদারুল হক সহযোগিতা করেছেন। বইটি তৈরিতে দিদারুল হক ৫৯৫ ডলার দামের ‘ডাক্সবারি ব্রেইল ট্রান্সলেটর’ সফটওয়্যারটি দিয়েছেন। এ সফটওয়্যারের মাধ্যমে ক্যালেন্ডার, বই ইত্যাদি সহজে ও কম সময়ে কনভার্ট করা যায়।

যা আছে বইয়ে: ব্রেইল পদ্ধতিতে তৈরি বইটিতে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবন পরিচয় (১৯৫৫-৭৫), দেশ-সমাজ ও মানব জাতি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর চিন্তা-ভাবনা এবং ভালোবাসার কথা, বাবাকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার লেখা, কারাবন্দি থাকা অবস্থায় শেখ হাসিনার লেখা বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী বইয়ের ভূমিকা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিজের হাতে লেখা বেশ কয়েকটি পাণ্ডুলিপিসহ আরও অনেক কিছু বইটিতে ব্রেইল করা হয়েছে।

উৎফুল্ল দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা: বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়ে দারুণ খুশি চট্টগ্রাম সরকারি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী স্কুলের শিক্ষার্থীরা। স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রী সুইটি আক্তার জানায়, ‘বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়তে না পেরে এতদিন মনে অনেক কষ্ট ছিল। ইচ্ছে ছিল বলে অনেক সময় অন্যের মুখে বইটির নানা বিষয় শুনতাম। তবে দীর্ঘ দিন পর হলেও বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী বইটি পড়ে খুব ভালো লাগছে।’ সুইটির মতো দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী কাউসারা বেগম, রিপা আক্তার, সুরুত আলম, বেবি দে’সহ অনেক শিক্ষার্থীরই বইটি পড়ার সুযোগ এসেছে। এ জন্য তারা শিক্ষক আবদুস সামাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

আবদুস সামাদ ১৯৮৪ সালে প্রথমে রাজশাহী সরকারি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী স্কুলে যোগদান করেন। ১৯৭৭ সাল থেকে বিভিন্ন শ্রেণীর বই ব্রেইল পদ্ধতিতে তৈরি করে আসছেন তিনি। এর আগে তিনি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য বিভিন্ন শ্রেণীর পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি প্রথমবারের মতো তৈরি করেন ব্রেইল পদ্ধতিতে ইংরেজি ক্যালেন্ডার। সেই সঙ্গে তৈরি করেছেন জসীম উদ্দীনের নক্সী-কাঁথার মাঠ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্প নিয়ে বই, রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন ও সুফিয়া কামালের জীবনী, স্নাতকের নীতিবিদ্যা, ডিগ্রির ইংরেজিসহ আরও অনেক বই। ব্রেইল পদ্ধতিতে এ পর্যন্ত তিনি ১২০টি বই তৈরি করেছেন।