৫৯ কোটি টাকা মুনাফায় রেকর্ড গড়ল খুলনা শিপইয়ার্ড

বাংলাদেশ নৌবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন খুলনা শিপইয়ার্ড বিগত অর্থবছরে এযাবৎ কালের সর্বোচ্চ প্রায় ৫৯ কোটি টাকা কর পূর্ব মুনাফা অর্জনের রেকর্ড গড়েছে। ১৯৯৯ এর অক্টোবরে তৎকালীন ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে শত কোটি টাকার দায়দেনা নিয়ে রুগ্ন তালিকাভুক্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান- খুলনা শিপইয়ার্ড নৌবাহিনীর কাছে হস্তান্তরের পর গত ১৬ বছরে সব দায়দেনা ও লোকশান কাটিয়ে দু’শতাধিক কোটি টাকা মুনাফা অর্জন করেছে। প্রতিষ্ঠানটি গত ২০১৩-১৪ অর্থবছরের ৪৭.৫৯ কোটি টাকা নিট মুনাফা অর্জনের পর সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে খুলনা শিপইয়ার্ডের মুনাফার পরিমাণ ৫৮.৮০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পরিষদ গত অর্থবছরের নিরীক্ষিত হিসাব অনুমোদন করেছে। খুলনা শিপইয়ার্ড সরকারি কোষাগারে বিপুল পরিমাণ ভ্যাট ও আয়করসহ বিভিন্ন ধরনের কর প্রদান করে আসছে। গত চার বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সর্বশ্রেষ্ঠ করদাতা প্রতিষ্ঠানের গৌরব অর্জন করে আসছে। ১৯৯৯ সাল হতে মাত্র ১৫ বছরে এ শিপইয়ার্ডটির টার্নওভার ১০.৬৯ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ১৬ কোটি হতে ১৭১ কোটিতে উন্নীত হয়েছে বলে জানিয়েছেন এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর এস ইরশাদ আহমদ। আগামী ৬ সেপ্টেম্বর খুলনা শিপইয়ার্ডে প্রায় ৮শ’ কোটি টাকা ব্যয়ে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জন্য ২টি ‘লার্জ পেট্রোল ক্রাফট-এলপিসি’ নির্মাণ কাজের আনুষ্ঠানিক সূচনা করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ১৯৫৪ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান শিল্প উন্নয়ন সংস্থা- ইপিআইডিসি জার্মানির কারিগরি সহায়তায় খুলনা শিপইয়ার্ডের নির্মাণকাজ শুরু করে। ১৯৫৭ সালের ২৩ নভেম্বর খুলনা মহানগরীর অদূরে লবণচরা এলাকায় রূপসা নদীর ধারে প্রায় ৭০ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন শুরু হয়। সে সময় নানা ধরনের আধুনিক নৌ-নির্মাণ সরঞ্জামসমূহ স্থাপন ও সংযোজনের মাধ্যমে শিপইয়ার্ডটিকে উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নৌ-নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে রূপ দেয়া হয়। ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত শিপইয়ার্ডটি জার্মাণ ব্যবস্থাপনায় ও ১৯৬৫ পর্যন্ত জার্মান-ব্রিটিশ যৌথ ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হলেও পরবর্তীতে এর পরিচালন ব্যবস্থা ইপিআইডিসি গ্রহণ করে। স্বাধীনতার পরে উত্তরাধিকার সূত্রে বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল সংস্থা- বিএসইসিকে এর দায়িত্ব প্রদান করা হয়। কিন্তু ১৯৫৭ সাল থেকে ’৬২ সাল পর্যন্ত খুলনা শিপইয়ার্ড ৪৬ লাখ টাকা লোকসান দেয়। আর ১৯৬২ থেকে ’৬৯ পর্যন্ত লাভ হয় মাত্র ৬৬ লাখ টাকা। ১৯৬৯ থেকে ’৭৩ সাল পর্যন্ত পুনরায় প্রতিষ্ঠানটি ৪২ লাখ টাকা লোকসান গোনার পর ১৯৭৩Ñ’৮৪ সাল পর্যন্ত ৫.৯১ কোটি টাকা মুনাফা অর্জনে সক্ষম হয়। কিন্তু এর পর থেকেই খুলনা শিপইয়ার্ড লাগাতার লোকসান গুনতে থাকায় রুগ্ন শিল্পে পরিণত হয়। এমনকি পরবর্তীকালে প্রতিষ্ঠানটি বিরাষ্ট্রীয়করণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে সরকার। কিন্তু কয়েক দফা চেষ্টায়ও বিক্রী করা সম্ভব না হওয়ায় তৎকালীন ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে খুলনা শিপইয়ার্ডকে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। খুলনা শিপইয়ার্ডে সোয়া ৩শ’ ফুট দৈর্ঘের ৭শ’ টন ক্ষমতার যেকোনো ধরনের নৌযান ডক ও আনডকসহ মেরামত ও নির্মাণ করার ক্ষমতা সমৃদ্ধ স্লিপওয়ে রয়েছে। গত বছর প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে বিশাল ফেব্রিকেশন সেড নির্মাণ সম্পন্ন করে যেকোনো আবহাওয়ায় নৌযানের নির্মাণ ও মেরামত সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। ডকইয়ার্ডটির স্লিপওয়ের ৮টি বার্থে প্রতিটিতেই প্রায় সোয়া ৩শ’ ফুট দৈর্ঘের যেকোনো নৌযান নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত সুবিধা রয়েছে। এছাড়াও প্রতিষ্ঠানটিতে ৮ টন ক্ষমতার ১টি ও ৫ টন ক্ষমতার ২টি বার্থ ক্রেন, ৩০ টন ক্ষমতার ১টি মোবাইল ক্রেন ছাড়াও একই ক্ষমতার অপর একটি ড্রিক ক্রেনও সংযুক্ত রয়েছে। শিপইয়ার্ডটির অভ্যন্তরে ৫-১০ টন ক্ষমতার একাধিক ওয়ার্কশপ ক্রেন ছাড়াও ফর্ক লিফটারের মতো বিশেষায়িত বিভিন্ন ধরনের কারখানা-সরঞ্জামও রয়েছে। খুলনা শিপইয়ার্ড বিভিন্ন সরকারি ও আধা সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের জন্যও ইতোমধ্যে ৩টি অয়েল ট্যাংকার নির্মাণ শেষে হস্তান্তর করেছে। পাশাপাশি অনুরূপ একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নির্মাণাধীন ২টি কন্টেইনার কাম কার্গো ভেসেলও খুব শিগগিরই হস্তান্তর করা হবে বলে জানা গেছে। খুলনা শিপইয়ার্ড আন্তর্জাতিক মান নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের অধীনে নির্মিত উপকূলীয় কন্টেইনার নৌযান নির্মাণের ক্ষেত্রে দেশের প্রথম নৌ-নির্মাণ প্রতিষ্ঠান। এছাড়াও বাংলাদেশ নৌবাহিনীর নৌ-কল্যাণ ফাউন্ডেশনের জন্য ৭৫ মিটার দৈর্ঘের, ১৪০ টিইইউ কন্টেইনার পরিবহনে সক্ষম আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন দুটি নৌযানও নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করেছে খুলনা শিপইয়ার্ড। গত ৫৭ বছরে, খুলনা শিপইয়ার্ড ৬৯৬টি নতুন নৌযান নির্মাণ ছাড়াও দু’হাজার ১৬৮টি নৌযান মেরামত করে। যার মধ্যে বাংলাদেশ নৌবাহিনী দায়িত্ব গ্রহণের পর পন্টুন ও বার্জসহ ১১৫টি নতুন নৌযান নির্মাণ এবং ৫১৮টির মেরামত সাফল্যজনকভাবে সম্পন্ন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। গত অর্থবছরে খুলনা শিপইয়ার্ড প্রায় ১৬ কোটি আয়কর প্রদান করেছে। যা বিগত যেকোন সময়ের চেয়ে বেশি। এছাড়াও প্রতিষ্ঠানটি শ্রমিক কল্যাণ তহবিলেও নিয়মিত চাঁদা প্রদান ছাড়াও অতিরিক্ত বোনাসও প্রদান করে আসছে। যা দেশের সরকারি যেকোনো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে যথেষ্ট নজিরবিহীন বলে জানা গেছে।