মাইলফলকে পদ্মা সেতু

কাজ শেষ হবে নির্ধারিত সময়ের আগেই

শেষ হয়েছে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদ্মা বহুমুখী সেতুর এক-চতুর্থাংশ কাজ। বাকি কাজ এগিয়ে চলেছে দ্রুতগতিতে। যেভাবে কাজ চলছে তাতে নির্ধারিত সময় ২০১৮ সালের মধ্যে এ স্বপ্নের সেতু দিয়ে পারাপার হতে পারবেন দেশের দক্ষিণাঞ্চলের অধিবাসীরা।

সেতুর মূল নির্মাণকাজের জন্য চীনের চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন কোম্পানি নিয়মিতভাবে ও শিডিউল অনুযায়ী কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ দক্ষতার সঙ্গে এগিয়ে নিচ্ছে সেতু নির্মাণের কাজ। নির্ধারিত সময়ে বিশ্বের অন্যতম এই সেতু চালু করার লক্ষ্যে তারা একঝাঁক চীনা ও বাংলাদেশি প্রকৌশলী, টেকনিক্যাল পরামর্শক বিশেষজ্ঞ প্যানেল অব এক্সপার্ট, দক্ষ দেশি-বিদেশি প্রায় সাড়ে তিন হাজার শ্রমিক নানা সরঞ্জাম নিয়ে দ্রুতগতিতে সম্পন্ন করছেন শিডিউলমাফিক কাজ। এ কাজে যেসব সরঞ্জাম তারা এখানে এনেছেন এর মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় জার্মানির তৈরি বিশ্বের সেরা প্রায় আড়াই হাজার টন ক্ষমতাসম্পন্ন ১৪৭ টন ওজনের হাইড্রলিক হ্যামার, ৫০০ টন ক্ষমতাসম্পন্ন হ্যামার, চীনের ন্যানটং ওয়ার্কশপ থেকে তৈরি ১০টি টেস্ট পাইল, অত্যাধুনিক ও হেভি ক্ষমতাসম্পন্ন ড্রেজার মেশিন, পাওয়ারফুল ক্রেন, ড্রেজারসহ নানা ধরনের ভারী যন্ত্র। ভুটান থেকে আনা হচ্ছে পাথর। মূল সেতুর ৮০ শতাংশ উপকরণ বিভিন্ন দেশ থেকে আনা হবে। চীন থেকে এরই মধ্যে ৩০০ জন প্রকৌশলীসহ পাঁচ শতাধিক চীনা কর্মী এই সেতু বাস্তবায়নে কর্মরত আছেন। আরও বেশ কিছু চীনা কর্মকর্তাসহ দক্ষ শ্রমিক আসার কথা রয়েছে বলে জানিয়েছেন চীনা প্রকৌশলী মি. লিউ। পদ্মা সেতু প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী দেওয়ান আবদুল কাদের জানান, এ প্রকল্পের প্রায় ২৩ শতাংশ কাজ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। আর সেতুর দুই পাশের সংযোগ সড়ক নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে ৪৯ শতাংশ। ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ দেশের সর্ববৃহৎ এই সেতুটি নির্মিত হচ্ছে ৪২টি পিলারের ওপর। দুই তলাবিশিষ্ট এ সেতুর নিচতলা দিয়ে রেল এবং উপরতলা দিয়ে যানবাহন চলাচল করবে। এর পাইলগুলো ১২০ মিটার, যা ৪০ তলা ভবনের সমান কাঠামো পানির নিচে রাখা হচ্ছে। ১৫০ মিটার পর পর বসানো হচ্ছে পিলার। এ ছাড়া দেড় কিলোমিটার করে উভয় পারে তিন কিলোমিটার সংযোগ সেতুর জন্য আরও ২৪টি পিলার করা হবে। মোট ৬৬টি পিলারের জন্য ৬৬ পয়েন্টে মাটি পরীক্ষার কাজ হচ্ছে। মূল সেতুর ৪২টি পিলারের মধ্যে ডিজাইন করার সময় ১৩টি পয়েন্টে মাটি পরীক্ষা হয়েছে। এ ছাড়া মূল সেতুর বাকি ২৯ পয়েন্টে এখন মাটি পরীক্ষা হচ্ছে। মূল সেতুর ৪০টি পিলারে ছয়টি করে ২৪০ এবং দুই পারের দুটিতে ১২টি করে ২৪টি, অর্থাৎ ২৬৪টি পাইল করতে হবে। এযাবৎ ১০টি পরীক্ষামূলক পাইলিংয়ের মধ্যে কাজ শেষ হয়েছে তিনটির। ১২টি ভায়া ডাক্টের মধ্যে শেষ হয়েছে চারটির। নির্বাহী প্রকৌশলী (পু. বা.) তোফাজ্জেল হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের স্বার্থে বিভিন্ন অংশে দেশি-বিদেশি নিয়মিত ও অনিয়মিত প্রায় পাঁচ হাজার শ্রমিক কাজ করে চলেছে। সেতু নির্মাণে ব্যয় হবে ২৫ হাজার কোটি টাকা। এখন পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকার মতো খরচ হয়েছে। কাজ দ্রুত এগিয়ে নিতে ক্ষেত্রবিশেষে দুই-তিন শিফ?টে কাজ চলছে। দ্রুত এগিয়ে চলেছে নদীশাসনের কাজ। নদীশাসনের দায়িত্বে রয়েছে চীনের সিনোহাইড্রো করপোরেশন লিমিটেড। দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সেতুর মূল নির্মাণকাজের জন্য চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন কোম্পানিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আর দুই পারে সংযোগ সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে যৌথভাবে আবদুল মোনেম লিমিটেড ও মালয়েশিয়ার হাইওয়ে কনস্ট্রাকশন ম্যানেজমেন্ট। এ ছাড়া সেতুর কাজ তদারকির জন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার কোরিয়ান এক্সপ্রেসওয়ে ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে। তিনি জানান, ইতিমধ্যে সেতু প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ মূল পাইলিংয়ের আদলে ওয়ার্ক অ্যাবিলিটি পাইলিংয়ের কাজ শুরু করেছে। এর আগে এ বছরের ২০ মার্চ প্রতিষ্ঠানটি শুরু করে পরীক্ষামূলক পাইল বসানোর কাজ। এরও আগে ১ মার্চ অ্যাংকর পাইল বসানোর কাজ শুরু করে তারা। এসব পাইল বসাতে প্রথমে মাওয়া প্রান্তে পদ্মায় প্রস্তুত করা হয় বিশেষ মঞ্চ। এ মঞ্চ ব্যবহার করে নদীর ওপর ভাসমান ক্রেন থেকে পরীক্ষামূলক পাইল বসানো হবে পদ্মাবক্ষে মাটির নিচে। এরই মধ্যে এই পরীক্ষামূলক পাইলের ওপর প্রায় আড়াই হাজার টন ওজনের চাপ দেওয়া হয়েছে যথাযথভাবে বহন করতে সক্ষম হয় কি না তা দেখার জন্য। এ ক্ষেত্রে শতভাগ সাফল্য পাওয়া গেছে। এরপর শুরু হয়েছে মূল পাইলের আদলে ওয়ার্ক অ্যাবিলিটি পাইলের কাজ। এর মধ্য দিয়ে দেশবাসীর বহুপ্রত্যাশিত পদ্মা বহুমুখী সেতুর কাজ আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল। পরীক্ষামূলক এসব পাইলিংয়ের পর এ বছরের অক্টোবরের যে কোনো দিন শুরু হবে মূল পাইলিংয়ের কাজ। এ কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ উপলক্ষে পদ্মা সেতুর মাওয়া প্রান্ত প্রস্তুত হচ্ছে। দিনটিকে স্বর্ণাক্ষরে লেখার জন্য প্রস্তুত বিক্রমপুর তথা মুন্সীগঞ্জবাসী। এ সেতু বাস্তবায়নের কাজ শেষ করতে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে সরকার। নিয়মিত খোঁজখবর নিচ্ছেন একাধিক মন্ত্রী আর উভয় পারের স্থানীয় প্রশাসন। সবচেয়ে বেশি তদারক করছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। ২৩ আগস্ট পর্যন্ত ১৩১ বার মুন্সীগঞ্জ, মাদারীপুর ও শরীয়তপুরের পদ্মাপাড়ে গিয়ে সেতু প্রকল্পের কাজ পর্যবেক্ষণ করেছেন তিনি। পদ্মার মুন্সীগঞ্জ পারের মাওয়া পয়েন্ট এলাকা ঘুরে দেখা গেছে সেতু নির্মাণের বিশাল কর্মযজ্ঞ। দ্রুত সম্পন্ন হতে চলেছে সংযোগ সড়ক, ওয়ার্কশপ, ইঞ্জিনিয়ার ও শ্রমিকদের আবাসন, টোল প্লাজা, সংযোগ সড়কে থাকা ব্রিজ, সংযোগ সড়কের পাশের সার্ভিস সড়ক নির্মাণ, ড্রেজিং ও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের কাজ। ভারী ভারী নির্মাণযন্ত্র দিয়ে চলছে পাথরভাঙা, মাটিকাটা, মাটি ভরাট, রাস্তা সমান করার কাজ। বিশাল স্তূপাকারে রাখা হয়েছে পাথর, ইট, বালু। সব মিলিয়ে মুন্সীগঞ্জের পদ্মাপাড়ে চলছে উৎসবের আমেজ। পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলো ঘুরে দেখা যায়, পরিকল্পিতভাবে দৃষ্টিনন্দন করে সাজানো হয়েছে সেগুলো। সেখানে স্কুল, মসজিদ, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, মার্কেট শেড, ওয়াটার ট্যাঙ্ক, বিদ্যুৎ সাব-স্টেশন, পাকা রাস্তা, পাকা ড্রেন, সুয়ারেজ লাইন ও পুকুর রয়েছে।মুন্সীগঞ্জ-২ আসনের এমপি, সাবেক হুইপ অধ্যাপিকা সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি মুঠোফোনে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, দেশের সর্ববৃহৎ এই সেতুর কাজ নিজস্ব অর্থায়নে করা হচ্ছে। বর্তমান সরকারের এক নম্বর চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশবাসীর অন্যতম প্রত্যাশার পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়ন। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র, হরতাল-অবরোধ, বৈরী আবহাওয়া আর প্রমত্ত পদ্মার ভয়াল ভাঙনসহ বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে মূল ডিজাইন অনুযায়ী সেতুর কাজ বাস্তবায়নের দিকে ছুটে চলেছে। এ নিয়ে পদ্মাপাড়ের মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে উৎসবের আমেজ। তিনি বলেন, শত বাধা আর বিপত্তি পার করে দেশবাসীর স্বপ্নের পদ্মা সেতু বাস্তবায়িত হবেই। পদ্মা সেতু নির্মিত হলে ঢাকাসহ দেশের পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলার তথা সারা দেশের যোগাযোগ নিশ্চিত হবে। উন্মোচিত হবে নতুন দিগন্ত। বিক্রমপুরবাসী এ সেতু বাস্তবায়নে প্রাণান্ত সহযোগিতা করে আসছেন। এ জন্য বিক্রমপুরবাসীর কাছে সরকারের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।