শত দিনে মেয়ররা যা করলেন

জলাবদ্ধতার সমস্যাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সংস্কার ও উন্নয়ন কাজ। জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ও গুরুত্বের ভিত্তিতে কাজ হচ্ছে সব সেক্টরেই। আর সে কাজ দৃশ্যমান করতে রাত-দিন খাটছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রথম নির্বাচিত মেয়র আনিসুল হক। গতকাল তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘দীর্ঘদিনের একটি সিস্টেমে পরিবর্তন আনতে সময় লাগে। আমরা গুরুত্বের ভিত্তিতে প্রতিটি সেক্টরেই কাজ শুরু করছি। দিন-রাত খাটছি। প্রাথমিক অবস্থায় সেগুলো দৃশ্যমান না হলেও দেড়-দুই বছরের মধ্যেই নগরবাসী ব্যাপক পরিবর্তন দেখতে পাবেন।’ ৬ মে মেয়র হিসেবে শপথ গ্রহণের পর ১৪ মে দায়িত্ব নেন আনিসুল হক। ইতিমধ্যে দায়িত্ব গ্রহণের ১০০ দিন পার করেছেন তিনি। গতকাল মেয়রের কাজের অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে ডিএনসিসি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা : ময়লা-আবর্জনা অপসারণ তথা বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন মেয়র আনিসুল হক। উত্তর সিটিতে দৈনিক প্রায় ২৫০০ টনের বেশি বর্জ্য উৎপাদিত হচ্ছে। আর এই বিশাল পরিমাণ বর্জ্য পরিবেশসম্মত উপায়ে অপসারণ করাকেই চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে সিটি করপোরেশন। আর এ কারণে প্রতিটি ওয়ার্ডে দুটি করে সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (ময়লা রাখার মধ্যবর্তী স্থান) নির্মিত হচ্ছে। জানা গেছে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মানোন্নয়নে জাইকা দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় জাপান সরকারের অর্থায়নে আগামী বছর ডিসেম্বরের মধ্যে পরিবেশবান্ধব আরও ৫৬টি বর্জ্য পরিবাহী আধুনিক গাড়ি এ কাজে নিয়োজিত করা হবে। বিভিন্ন ওয়ার্ডে গাড়ির স্বল্পতা থাকায় ইতিমধ্যে ৩০টি টিপিং ট্রাক, ৪০টি কনটেইনার, ছয়টি কনটেইনার ক্যারিয়ার এবং ২০০টি হাতগাড়ি ক্রয়ের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়েছে। নগরীর বিভিন্ন নর্দমা দ্রুত ও কার্যকরভাবে পরিষ্কারের জন্য একটি অত্যাধুনিক জেট অ্যান্ড সাকার মেশিন ক্রয় করা হয়েছে। এ ছাড়া বর্জ্য রিসাইক্লিংয়ের (পুনর্ব্যবহার উপযোগী) মাধ্যমে বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদন করতে বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নিয়েছে ডিএনসিসি।

জলাবদ্ধতা ও স্যুয়ারেজ সিস্টেম : জলাবদ্ধতা সামাল দিতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি বেগ পেতে হচ্ছে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষকে। দায়িত্বে নিয়োজিতরা বলছেন, অপরিকল্পিত নগরকাঠামোর কারণেই স্যুয়ারেজ সিস্টেম নিয়ে বিপদে পড়েছেন তারা। ঢাকা শহরের বর্তমান স্যুয়ারেজ সিস্টেমগুলো ১০ বছরের পুরনো হওয়ায় সেগুলো নষ্টের উপক্রম হয়েছে। গুলশান-বনানীসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় যেখানে বড় ধরনের স্যুয়ারেজ সিস্টেমের দরকার ছিল তা তৈরি করা হয়নি। অন্য যেসব এলাকায় করা হয়েছে তাও অতিবৃষ্টির কারণে বেহাল। কোথাও মাঠ তৈরি করে, কোথাও খাল-বিল বন্ধ করে অবৈধ বাড়ি কিংবা দোকান বানিয়ে স্যুয়ারেজ সিস্টেম নষ্ট করে ফেলা হয়েছে।

এগিয়ে চলেছে গ্রিন সিটির কাজ : নির্বাচনের আগে আনিসুল হকের অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল গ্রিন সিটি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে কাটখোট্টা ঢাকা শহরকে সবুজ শহরে পরিণত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ হাতে নিয়েছেন তিনি। ইতিমধ্যে এ উদ্যোগকে বাস্তবে রূপ দিতে কাজও শুরু হয়েছে। সবুজ নগরী গড়তে আনিসুল হককে পরামর্শ দিয়ে নানাভাবে সহযোগিতা করছেন স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন, স্থপতি ইকবাল হাবিবসহ সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। সংশ্লিষ্টরা জানান, নগরকে সবুজ করতে উত্তর সিটির আওতাধীন ৩৯টি ফুটওভারব্রিজকে বাগানবিলাস দিয়ে মুড়ে ফেলার কাজ শুরু হয়েছে। কেবল নগরীর সৌন্দর্য বৃদ্ধিতেই নয়, এতে বিশুদ্ধ অক্সিজেন উৎপাদনের মাধ্যমে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

রাস্তাঘাট : ভাঙাচোরা ও ঝুঁকিপূর্ণ রাস্তাঘাট থেকে নগরবাসীকে মুক্তি দিতে কোনোভাবেই বর্ষাকালে রাস্তাঘাট না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ডিএনসিসি। ওয়াসা, গ্যাস, ডিএনসিসিসহ কোনো সংস্থাই যাতে বর্ষা মৌসুমে রাস্তা কাটাকাটি না করে সে জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন মেয়র আনিসুল। তিনি রাস্তার কাজ অবশ্যই শীতের সময় করার অনুরোধ জানিয়েছেন। তবে এ ক্ষেত্রে বিদেশি সংস্থার টাকায় যেসব উন্নয়ন কার্যক্রম চলছে তাদের সঙ্গে ডিএনসিসির পরিকল্পনার মিল না থাকায় বেশ মুশকিলেও পড়তে হচ্ছে।

প্রশাসনিক কার্যক্রম : ডিএনসিসির কার্যক্রমকে গতিশীল করতে বিভিন্ন বিভাগ ঢেলে সাজাচ্ছেন মেয়র। সপ্তাহ দুয়েক আগে ৬৯ জন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীকে বদলি করা হয়েছে। ১৮ আগস্ট থেকে বদলির নির্দেশ কার্যকর হয়। যাদের বদলি করা হয়েছে তাদের অধিকাংশ একই দফতরে চার বছরের বেশি সময় ধরে কর্মরত ছিলেন। মশক নিধন : নির্বাচনের আগে আনিসুল হক এক জরিপের মাধ্যমে মশা সমস্যাকে সবচেয়ে বড় হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। আর সে কারণেই মশক নিধন কার্যক্রমের জন্য আগের ২০০টি হাতে চালানো স্প্রে মেশিন ও ১০০টি ফগার মেশিনের সঙ্গে আরও ১০০টি ফগার মেশিন, ১০০টি স্প্রে মেশিন এবং চারটি হুইল ব্যারো মেশিন কেনার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।

যানজট, বিলবোর্ড ও অন্যান্য : যানজট নিরসনে সিগন্যাল বাতি লাগানো ও ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে ডিএনসিসি। এ ছাড়া নিরাপত্তার খাতিরে ল্যান্ডফিল ব্যবহারকারী যানবাহনের তথ্য সংরক্ষণের জন্য সম্প্রতি সিসিটিভি স্থাপন করা হয়েছে। এগুলোকে দ্রুত অনলাইনের আওতায় আনা হবে। একই সঙ্গে সব গাড়িতে ভেহিকল ট্র্যাকিং সিস্টেম লাগানো হবে।

Views: 1