জাহাঙ্গীরনগরের শিক্ষার্থী এক ফকিরের ‘অনন্য’ গল্প

জীবনের নানা প্রতিকূলতার মাঝেও অনেকেই জীবনযুদ্ধে এগিয়ে যেতে বদ্ধ পরিকর, যেতেই হবে। পেছনে তাকানো যাদের স্ববিরোধী স্বভাব। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও খুঁজে পাওয়া গেছে এমন একজনকে। ক্যাম্পাসে ফকির হিসেবেই পরিচিত। যিনি জীবনের সাথে যুদ্ধ করে এগিয়ে চলেছেন। ফকির নাম শুনে অনেকেই মনে করতে পারেন, মুখ ভর্তি দাড়ি, গোঁফওয়ালা একজন বোহেমিয়ান মানুষ। তবে এই ফকির সাহেব জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের ৪৩তম ব্যাচের শিক্ষার্থী।

যার জীবনের অনেকটা সময়ই কেটেছে আধাপেট খেয়ে, আবার কখনও না খেয়েও দিন চলে গেছে। কিন্তু থেমে থাকেননি তিনি। ক্ষুধার কাছে হার মানেননি। জীবনের সাথে যুদ্ধ করে এগিয়ে চলেছেন। বহু গুণের অধিকারী তিনি। দেহতত্ত্ব, মারফতি, পল্লীগান চর্চায় বেশ পারদর্শী। জীবিকা পরিচালনায় পড়াশুনার পাশাপাশি মোটরবাইক গ্যারেজে কাজ করেন। বাইপাইলের একটি মোটরবাইক গ্যারেজে সপ্তাহে ২ দিন কাজ করে প্রতিমাসে ২ হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা পান।

২০১২-১৩ সালের ভর্তি পরীক্ষার সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা শেষ করে ক্যাম্পাসে ৩ মাস রিকশা চালিয়েছেন। সাভারের একটি গার্মেন্টেসেও ২ মাস চাকরি করেছেন। এখন জাহাঙ্গীরনগরে তিনিই নিজের তৈরি যন্ত্র দিয়ে গান পরিবেশনা করেন। ‘খমক, একতারা, কন্তা, আর ঢব’ দিয়ে গান পরিবেশন করেন।

ক্যাম্পাসে গান করলে অনেকেই টাকা দিতে চাইলেও তার মায়ের নিষেধ থাকায় কোনো টাকা নেন না। গ্যারেজে কাজ করেই নিজের স্বল্প খরচটুকু ও পড়শোনার খরচটুকু চালিয়ে নেন তিনি।

ফকির সাহেবের পুরো নাম ওয়াজকুরুনী ফকির। সাধু ও মোমেনা বেওয়ার দুই মেয়ে থাকলেও একমাত্র ছেলে তিনি। লালমনিরহাট জেলার হাতিবান্ধা থানার গাওচুল্বা গ্রামে জন্ম তাঁর। হাতিবান্ধা এস এস উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি (৪.৬৩) ও আলিমুদ্দিন ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন। টাকা পয়সা ছিল না পড়াশুনা করার মতো। আশরাফুজ্জামান দিদার নামের স্কুলজীবনের এক বন্ধু গান শুনে মুগ্ধ হয়ে কলেজে পড়াশুনার সকল খরচ বহন করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ফরমের টাকা থেকে ভর্তি হওয়ার সকল খরচ ও সেই বন্ধু দিদার দিয়েছেন।

২০০০ সালে ১১০ বছর বয়সে ফকির সাহেবের বাবা মারা গেলে অনেক সময় না খেয়ে থাকতে হয়েছে তাঁদের। বর্ষাকালে অনেক সময়ই না খেয়ে থাকতে হয়েছে তাঁকে। তিনবেলা ভাত খেতে পারবে বলে একটি বেসরকারি সংস্থায় নামও লিখিয়েছেন। তবে থেমে থাকেননি। ৯ বছর বয়সে ভারতের অন্ধ্র প্রদেশের এক গুরুর কাছে ৫ বছর দেহতত্ত্ব ও মারফতি গানের শিক্ষা গ্রহণ করেন। বর্তমানে হাতিবান্ধার আশরাফ উদ্দিন ভান্ডারির কাছ থেকে দেহতত্ত্ব ও মারফতি গানের শিক্ষা নিচ্ছেন।

ওয়াজকুরুনী ফকির বলেন, বাবা দেহতত্ত্বের গান গেয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়াতেন। বাবার মুখের শোনা ‘ভাব আছে যার গায়, দেখলে তারে চেনা যায়, সর্ব অঙ্গ তাহার পোড়ারে’ সবচেয়ে প্রিয় গান এখন ক্যাম্পাসেও অনেকে শুনতে চায়। ভবিষ্যতে বড় ধরনের গায়ক হবার ইচ্ছা রয়েছে বলেও জানান তিনি।