বদলে যাবে এই ঢাকা

আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বদলে যাবে যানজটের চিরচেনা এই নগরী ঢাকা। একের পর এক ফ্লাইওভার, উড়ালসড়ক, আন্ডারপাস, একাধিক মেট্রোরেল রুট, বিআরটি, অত্যাধুনিক শপিং মল, বিনোদন কেন্দ্র, সিনেপ্লেক্সসহ বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে পাল্টে দেওয়া হচ্ছে মহানগরী ঢাকাকে। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি ফ্লাইওভার ও নতুন সড়ক ঢাকার উত্তরের বেশির ভাগ অংশকে করেছে যানজটমুক্ত। কুড়িল-বিশ্বরোড ফ্লাইওভার, জিল্লুর রহমান ফ্লাইওভার (মিরপুর-বিমানবন্দর সড়ক), বনানী ওভারপাস ও পূর্বাঞ্চলে লিংক রোডের মাধ্যমে এ অঞ্চলে যাতায়াতে এসেছে তুলনামূলক স্বস্তি। মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার নগরবাসীকে দিয়েছে যাত্রাবাড়ী-সায়েদাবাদের দুঃসহ যানজট থেকে মুক্তি। নগরীর মধ্যস্থানে থাকা হাতিরঝিলও কাছে এনেছে গুলশান ও কারওয়ানবাজারকে। এখন বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার। পরিকল্পনায় আছে রাজধানীর জিরো পয়েন্ট থেকে মাওয়া পর্যন্ত দেশের সর্ববৃহৎ ফ্লাইওভার। বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে গাজীপুরের চৌরাস্তা থেকে বিমানবন্দর ও বিমানবন্দর থেকে কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি)। এ ছাড়া গাবতলী থেকে আজিমপুর পর্যন্ত একটি এবং গোলাপশাহ মাজার থেকে বাবুবাজার পর্যন্ত আরেকটি ফ্লাইওভার নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। ফ্লাইওভারের পরিকল্পনার বাইরে উত্তরা থেকে মিরপুর হয়ে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল প্রকল্প ও বিমানবন্দর থেকে যাত্রাবাড়ী পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনাও শিগগিরই বাস্তবায়নে আগ্রহী সরকার। ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে বড় এই দুই প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাজ। সব মিলিয়ে আগামী তিন থেকে চার বছরের মধ্যে এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে বদলে যাবে ঢাকার যানজটের চিত্র। সহজসাধ্য হবে ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা। জানা যায়, রাজধানীবাসীর অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ও রাজধানীর সঙ্গে পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোর যানজটমুক্ত যোগাযোগ নিশ্চিত করতে নেওয়া মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে জোর দিচ্ছে বর্তমান সরকার। এরই একটি অংশ হিসেবে তৈরি হচ্ছে দেশের বৃহত্তম ফ্লাইওভার। বাস্তবায়নাধীন পদ্মা সেতুর সঙ্গে ঢাকার সহজ সংযোগ স্থাপন এবং নতুন শহর ঝিলমিলকে মূল ঢাকার সঙ্গে যুক্ত রাখতে রাজধানীর জিরো পয়েন্ট থেকে মাওয়া রোড (রাজউকের ঝিলমিল আবাসিক প্রকল্প এলাকা) পর্যন্ত একটি ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হচ্ছে। এ ফ্লাইওভার প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই, জরিপ, সম্ভাব্য ব্যয় এবং নির্মাণের সময়কাল মোটামুটি ঠিক করে ফেলেছে সরকার। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) আওতায়। ফ্লাইওভারটি হবে চার লেনবিশিষ্ট। সরকারের নীতিনির্ধারণী সূত্রের খবর, দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য নেওয়া পরিকল্পনার মধ্যে আছে বিমানবন্দর-সংশ্লিষ্ট দুটি ফ্লাইওভারের নির্মাণ। এর মধ্যে গাজীপুর চৌরাস্তা থেকে হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত ১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট। এটি বিস্তৃত হবে কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত।

এ প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হলে মহানগরীর দীর্ঘদিনের যানজটের দুর্ভোগ অনেকটা কমে আসবে বলে মনে করছেন নগর-বিশেষজ্ঞরা। অন্যদিকে পুরান ঢাকার যানজট নিরসনে রাজউকের গুলিস্তান গোলাপশাহ মাজার থেকে বাবুবাজার পর্যন্ত একটি ফ্লাইওভার নির্মাণের উদ্যোগ ও পরিকল্পনা বেশ পুরনো। এ সংক্রান্ত প্রাথমিক প্রস্তুতি নিলেও অর্থাভাবে কাজ শুরু করতে পারেনি রাজউক। রাখা হয়েছিল ভবিষ্যৎ প্রকল্পগুলোর একটি হিসেবে। সরকার এখন এটি নিয়ে নতুন করে ভাবতে চায়। কারণ ঢাকার বাইরে থেকে গুলিস্তান ও পলাশীতে ইতিমধ্যেই যান চলাচলের গতি বাড়ানো গেছে। কিন্তু মাঝখানের এই সড়কের গতি বাড়ানো যায়নি। এদিকে পরিকল্পনায় আছে গাবতলী থেকে পুরো মিরপুর রোড ধরে একটি ফ্লাইওভার নির্মাণের। প্রাথমিক পরিকল্পনার পর ঢাকার এক জনপ্রতিনিধির প্রতিষ্ঠান এই ফ্লাইওভার নির্মাণের আগ্রহ দেখিয়ে প্রস্তাবও দিয়েছে। বাস্তবতা বিবেচনায় সরকার ওই প্রস্তাবকে গুরুত্বের সঙ্গে নেয়নি। তবে ফ্লাইওভারের পরিকল্পনাটি গুরুত্ব পেয়েছে। এ জন্য বিদেশি সহায়তা বা পিপিপি ভেবে দেখছে সরকার। অন্যদিকে, ইতিমধ্যেই মিরপুর মাটিকাটা থেকে জিয়া কলোনি পর্যন্ত ১ দশমিক ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ জিল্লুর রহমান উড়ালসড়ক প্রকল্পের মাধ্যমে বিমানবন্দর সড়কের সঙ্গে মিরপুরের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে। এখন আর মিরপুরবাসীকে উত্তরা বা বিমানবন্দরে যেতে বিজয় সরণি ঘুরতে হয় না। পূরবী থেকে কালশী পর্যন্ত তৈরি হয়েছে নতুন সড়ক। গত মাসে এর বিকল্প হিসেবেও তৈরি হয়েছে মিরপুর সিরামিক পার্শ্ববর্তী সড়ক। এ ছাড়া বিশ্বরোড মোড়ে তৈরি করা দৃষ্টিনন্দন কুড়িল ফ্লাইওভার গতি এনে দিয়েছে বিমানবন্দর সড়কে। বিশ্বরোড মোড়ের এই ফ্লাইওভার এই এলাকার যোগাযোগের হাবে পরিণত হয়েছে। তেমনি বনানী ওভারপাস দূর করেছে ট্রেন যাতায়াতের জন্য সৃষ্ট যানজট। তবে বনানী কাকলীর মোড়ে প্রতিদিনই পড়তে হচ্ছে যানজটে। অনেক সময়ই এই যানজট কেড়ে নিচ্ছে মহানগরীর মানুষের স্বস্তি। এটি দূর করতেও নেওয়া হয়েছে নতুন পরিকল্পনা। গুলশান ও বনানীমুখী যানবাহনগুলোকে উড়ালসেতু দিয়ে পারাপারের প্রস্তাব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এটাকে তারা বলছেন, ‘ইউ’ লুপ। মহাখালী উড়ালসেতু থেকে কাকলী পর্যন্ত চারটি ইউ লুপ নির্মাণে একটি প্রকল্পও নিয়েছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। এটি বাস্তবায়ন করা গেলে দূর হবে বনানীর ট্রাফিক জট।

এদিকে বাংলাদেশ টেলিভিশনের সামনে তৈরি ইউ লুপ বনশ্রী-হাতিরঝিল ইন্টারসেকশনের যানজট দূর করবে। এটির নির্মাণ কাজ এখন শেষ পর্যায়ে। রাজধানীর যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনে সর্বাধিক ভূমিকা রাখতে যাওয়া প্রকল্প দুটো হতে যাচ্ছে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও মেট্রোরেল। চলতি মাসে কাজ শুরু হওয়া ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পটির রুট হবে বিমানবন্দর-কুড়িল-বনানী-মহাখালী-তেজগাঁও-মগবাজার-কমলাপুর-সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ী-কুতুবখালী (ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক)। এর মধ্যে ২০ কিলোমিটার হবে উড়ালসড়ক। সংযোগ সড়কসহ এর দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ৪৬ কিলোমিটার। এ প্রকল্পের মূল অবকাঠামো নির্মাণ হলে নগরীর উত্তর-দক্ষিণে যানবাহন চলাচলে বিকল্প সড়ক সৃষ্টি হবে। ফলে নগরবাসীর ভ্রমণ সময় কমবে এবং ভোগ্যপণ্য বাধাহীনভাবে চলাচল করতে পারবে। জরিপ চলতে থাকা মেট্রোরেল গতি নিয়ে আসবে যোগাযোগ ব্যবস্থায়। ঢাকার উত্তরা থেকে মিরপুর হয়ে সরাসরি মতিঝিল পর্যন্ত এ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রতি ঘণ্টায় ৬০ হাজার যাত্রী পরিবহন সম্ভব হবে। এই মেট্রোরেলের দৈর্ঘ্য হবে ২০ কিলোমিটার। আর স্টেশন থাকবে ১৬টি। এগুলো হচ্ছে- উত্তরা উত্তর, উত্তরা সেন্টার, উত্তরা দক্ষিণ, পল্লবী, আইএলটি, মিরপুর সেকশন-১০, কাজীপাড়া, তালতলা, আগারগাঁও, বিজয় সরণি, ফার্মগেট, সোনারগাঁও, জাতীয় জাদুঘর, দোয়েল চত্বর, জাতীয় স্টেডিয়াম এবং বাংলাদেশ ব্যাংক। উত্তরা মডেল টাউনের তৃতীয় পর্যায়ের এলাকায় মেট্রোরেলের প্রধান ডিপো স্থাপন করা হবে। তবে ডিপো এলাকায় তিনটি স্টেশন থেকেও যাত্রীরা মেট্রোরেলে চড়তে পারবেন। নগর পরিকল্পনাবিদ ও সড়ক যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেট্রোরেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং নতুন ফ্লাইওভারসহ অন্যান্য প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে মহানগরীর দীর্ঘ দিনের যানজটের দুর্ভোগ ও ভোগান্তি দূর হবে। সেই সঙ্গে ঢাকার অদূরের মুন্সীগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, গাজীপুর, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জ জেলার সঙ্গে রাজধানী ও পার্শ্ববর্তী জেলা-উপজেলার যোগাযোগ সহজ হবে। পাশাপাশি কেরানীগঞ্জ, রূপগঞ্জ, সোনারগাঁ, টঙ্গী, শ্রীপুর, সাভার, উত্তরা, মিরপুর, বনানী, গুলশান, বারিধারা, রামপুরা, বাড্ডা, মহাখালী, তেজগাঁও ও বনশ্রী এলাকার অসহনীয় যানজট লাঘব হবে। মাত্র দেড় থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যে সরাসরি রাজধানীতে আসতে পারবেন ফরিদপুর, শরীয়তপুর ও মুন্সীগঞ্জের বাসিন্দারা। পাশাপাশি গাজীপুর ও উত্তরার বাসিন্দারা মতিঝিল এলাকায় যেতে পারবেন ২০ মিনিটের মধ্যে।