গ্রামেই মিলবে শহুরে সুবিধা

বাংলা সিনেমার অনেক জনপ্রিয় একটি গান ‘তেল ছাড়া বাত্তি জ্বলে/গড় গড়াইয়া গাড়ি চলে/মাটি ফাইট্টা পানি পড়ে …. ; এমন কাহিনি প্রথমে গ্রামের মানুষের কাছে একটু অদ্ভুতই মনে হতো। কিন্তু ধীরে ধীরে তাদের সেই ভ্রান্তি দূর হতে থাকে। আধুনিক নাগরিক ধারায় তারা এসবে অভ্যস্ত হতে হতে দেখে শহুরে জীবনে এসবই মিলে, কিন্তু গ্রামীণ জীবনধারায় এর বাস্তবতা কতটুকু। ধীরে ধীরে সেই অবস্থারও অবসান ইতোমধ্যেই ঘটেছে। গ্রামীণ জীবনে মিলেছে শহুরে জীবনের ছোঁয়া। আর সেটিকে আরো একধাপ এগিয়ে নিতে গ্রামের একদম নিম্নবিত্তদের জীবনেও মিলবে সেই আধুনিক নাগরিক জীবনের স্বাদ। এমনকি হাতের কাছেই থাকবে স্কুল, বিনোদন পার্ক, কাঁচাবাজার, কমিউনিটি সেন্টার, ডিপার্টমেন্টাল স্টোর।

বর্তমান সরকারের ভিশন ২০২১ বাস্তবায়নের এমন একটি প্রকল্পেই সুবিধাভোগীর আওতায় আসছেন গ্রামের নিম্নবিত্তরা। আর এটি এখন মোটেও স্বপ্ন নয়। নিভৃত গ্রামের মানুষ থাকবে শহরের মতোই বহুতল ফ্ল্যাট বাড়িতে। যেখানে থাকবে গ্যাস ও বিদ্যুত্। এমনকি ফ্ল্যাট কিনতে বেশি অর্থেরও দরকার নেই। সাধ্যের মধ্যে খুব কম ডাউন পেমেন্টে ঘরে ওঠা যাবে। তারপর কিস্তির অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা করে দেবে ফ্ল্যাট বরাদ্দের সরকারি কর্তৃপক্ষ। কৃষি জমি রক্ষায় বর্তমান সরকারের এটি একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

‘পল্লী জনপদ’ নামে নেয়া এই আবাসন প্রকল্পের কাজ ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে দেশের ৭ বিভাগের একটি করে গ্রামে। আগামী বছরেই ফ্ল্যাট নির্মিত হয়ে প্রতিটি চারতলা ভবনে ২শ’৭২টি করে পরিবার আশ্রয় পাবে। পর্যায়ক্রমে তা দেশের সকল এলাকায় স্থাপন করা হবে।

জানা গেছে, বহুতল এসব ভবনে চার ধরনের ফ্ল্যাট থাকবে। প্রতিটি ফ্ল্যাটেই বেডরুম, ড্রইংরুম, রান্নাঘর, খাওয়ার স্পেস ও এ্যাটাস্ট বাথরুম সুবিধা আছে। এই প্রকল্পের প্রথমে কাজ শুরু হয়েছে ঢাকা বিভাগের গোপালগঞ্জের মোকসেদপুর উপজেলার জলিরপাড়া গ্রামে। সেখানে ৩ দশমিক ৭৫ একর খাস ভূমির ওপর নির্মিত হচ্ছে এমন ফ্ল্যাট ভবন। এভাবে সিলেট বিভাগের দক্ষিণ সুরমা, খুলনা বিভাগের রূপসা, বটিয়াঘাটা, রংপুর সদরের নিয়ামতপুর, বগুড়ায় শাজাহানপুর উপজেলার জামালপুরে। প্রতিটি স্থানে জমি কেনা হয়েছে।

চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগে শীঘ্রই জমি কেনা হবে। দেশের প্রতিটি গ্রামে একই পরিমাণ জমিতে ভবন নির্মিত হবে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হচ্ছে স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অধীনে বগুড়া পল্লী উন্নয়ন একাডেমির (আরডিএ) মাধ্যমে।

অধিক জনসংখ্যার চাপে পরিবারের সংখ্যা বেড়ে গিয়ে বসতবাড়ি নির্মাণে দিনে দিনে দেশের আবাদী জমি কমে যাওয়া ঠেকানো রোধে বগুড়া আরডিএর গবেষণায় উদ্ভাবিত এই পরিকল্পনাটি এসেছে। গ্রামের মানুষকে রোজগারের ব্যবস্থা করে দিয়ে স্বল্প খরচে বহুতল ভবনে আবাসনের ব্যবস্থাটি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিতে আনার পর একনেক বৈঠকে উপস্থাপিত হলে গত বছর (২০১৪) তা পাস হয়ে বরাদ্দ মেলে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই এই প্রকল্পটির নাম দেন ‘পল্লী জনপদ’।

জানা যায়, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ব্রিটেন সফরকালে সেখানে এমন ব্যবস্থা দেখে বাংলাদেশে তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তারই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। আবাদি জমি রক্ষা করে অধিক মানুষের মুখে আহার ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে গিয়ে বাস্তবায়নকারী সরকারি প্রতিষ্ঠানকে হোঁচটও খেতে হচ্ছে। তবে এই অবকাঠামোর স্থাপনা নির্মাণের জন্য জমি কিনতে গেলে একটি শ্রেণি বাদ সেধে সরকারের ভাল উদ্যোগকে ভুল করতে চাচ্ছে। গ্রামের লোক যখন বুঝতে পারছে তাদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য এতসব হচ্ছে এবং জায়গা বিক্রি করার পরও তারা ফ্ল্যাটে অগ্রাধিকার পাবে তখন ভুল বুঝতে পেরেছে। এভাবেই গ্রামের মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে জমি কেনা হয়েছে।

পল্লী জনপদের এই ফ্ল্যাটের জীবনধারা হবে শহরের মতোই। হাতের কাছেই থাকবে স্কুল, বিনোদন পার্ক, কাঁচা বাজার, কমিউনিটি সেন্টার, ডিপার্টমেন্টাল স্টোর। মিলবে নাগরিক জীবনের সকল সুবিধা।

বহুতল ফ্ল্যাটে ২শ’ ৭২ পরিবার ঠাঁই নিলে ৪৩ একর কৃষি জমি ও ১৭ কিলোমিটার বৈদ্যুতিক তারের সাশ্রয় হবে। ভবনে বসবাসকারী মানুষের টয়লেট রান্নাঘর পোল্ট্রি ক্যাটেলের বর্জ্য থেকে প্রতিদিন প্রায় এক টন জৈবসার উত্পাদন হবে, যা আবাদি জমির জৈব ঘাটতি মেটাবে। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, কৃষি জমিতে যেখানে ৫ শতাংশ জৈবসার থাকার কথা সেখানে পাওয়া যাচ্ছে এক শতাংশের কম।

ফ্ল্যাটের প্রত্যেক মালিক গরু-ছাগল ও হাঁস মুরগি পালনের জন্য ৮২ বর্গফুট জায়গা বিনামূল্যে পাবেন। তবে তিনি অতিরিক্ত জায়গা চাইলে প্রতি বর্গফুট নামমূল্যে কিনতে পারবেন। ভবনে বসবাসকারী প্রত্যেক সদস্য কমিউনিটি ভিত্তিতে ৫শ’ গরু ও ১০ হাজার মুরগির খামারের অংশীদারিত্ব পাবেন। ভবন সংলগ্ন ফার্ম হাউসে বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট দিয়ে গ্যাস উত্পাদিত হয়ে প্রতিটি ফ্ল্যাটে গ্যাস সংযোগ যাবে এবং বিদ্যুত্ উত্পাদিত হবে। জেনারেটরের বিদ্যুতের পাশাপাশি সোলার প্যানেলের বিদ্যুত্ থাকবে। নিরাপদ পানি ও বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা থাকবে। জানা গেছে, এই ভবনে এককেন্দ্রিক রাস্তা নির্মাণ করা হবে। বিক্ষিপ্তভাবে অনেকগুলো রোড তৈরি না করে একটি এপ্রোচ রোড তৈরি করা হবে। আর এতেও প্রতি গ্রামে প্রায় ১৬ একর জমি রক্ষা পাবে।

তাই দেশের কৃষি জমির অপচয়রোধ, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে সমবায়ভিত্তিক বহুতল ভবন ‘পল্লী জনপদ’ নির্মাণ গ্রামের নিম্নবিত্ত মানুষের আলোকবর্তিকা হয়ে ওঠবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে করে ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর একদিকে যেমন আবাসন সমস্যা নিরসন হবে অপরদিকে তেমনি কৃষিভিত্তিক কর্মকাণ্ড গতি পাবে।

লেখক : খায়রুল আলম
গণমাধ্যমকর্মী
ইমেইল: alammym@gmail.com