শতাধিক ব্যক্তি বিচারের আওতায় আসছে এ বছর

মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও শান্তি কমিটির স্থানীয় পর্যায়ের আরো সাড়ে তিন হাজারের মতো সদস্যকে বিচারের মুখোমুখি করার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশন (রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী দল)। ওই সাড়ে তিন হাজার ব্যক্তির তালিকা ধরে তদন্তও চালিয়ে যাচ্ছে তদন্ত সংস্থা। তালিকাভুক্ত শতাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে তদন্ত এ বছরের মধ্যেই শেষ হবে বলে সংস্থার আশা। এদের বিরুদ্ধে পর্যায়ক্রমে তদন্ত শেষ করে সংস্থাটি প্রতিবেদন দেবে প্রসিকিউশনের কাছে। ওই সব তদন্ত প্রতিবেদন যাচাই-বাছাই করে ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করবে প্রসিকিউশন। তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

এদিকে আইন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, স্থানীয় পর্যায়ের বিপুলসংখ্যক ব্যক্তির বিচার সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে ট্রাইব্যুনালের জনবল বাড়ানোসহ যা যা করা দরকার তা-ই করবে সরকার।

মুক্তিযুদ্ধকালীন হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগে ২০০৯ সাল থেকে বিভিন্ন জেলায় শত শত মামলা দায়ের করা হয় প্রচলিত আইনের আওতায়। তদন্ত সংস্থা সূত্রে জানা যায়, স্থানীয় পর্যায়ে দায়ের হওয়া ছয় শতাধিক মামলা তদন্ত করার জন্য তদন্ত সংস্থার কাছে নথি জমা হয়েছে। এ পর্যন্ত এ ধরনের ৬১৮ মামলায় তিন হাজার ৩৭৬ জন আসামির নাম এসেছে তদন্ত সংস্থার কাছে। বর্তমানে তদন্তাধীন আছে গ্রেপ্তার ও পলাতক ৫৬ আসামির বিরুদ্ধে ২২টি মামলা। কক্সবাজারের মহেশখালীর ১৯ জন একটি মামলার আসামি। এদের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করলেও গ্রেপ্তার হয়েছে ছয়জন।

জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। যেকোনো মূল্যেই হোক এই বিচার সম্পন্ন করা হবে। চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন প্রায়। এখন যারা একাত্তরে এ দেশে ৩০ লাখ মানুষকে হত্যার জন্য ও নারীদের ধর্ষণের জন্য পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে সহযোগিতা করেছে তাদেরও বিচার করা হবে। এ জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের জনবল বৃদ্ধি, নিরাপত্তা বৃদ্ধিসহ যা যা করা দরকার সরকার তা করবে।’

তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক আবদুল হান্নান খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ২০০৯ সাল থেকে বিভিন্ন জেলায় দায়ের হওয়া ছয় শতাধিক মামলার বিষয়ে তদন্ত করার জন্য তদন্ত সংস্থার কাছে এসেছে। এই মামলাগুলো ধরেই কাজ চলছে। এদের মধ্যে অনেকেই ১৯৭২ সালের দালাল আইনে দণ্ডপ্রাপ্ত। দালাল আইনে যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল তাদের বেশির ভাগের বিরুদ্ধেই হত্যা, ধর্ষণসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ স্পষ্ট। এমনকি সাধারণ ক্ষমার আওতায় যাদের মুক্তি দেওয়া হয়েছিল, তাদেরও কারো কারো বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এ কারণে তাদের ট্রাইব্যুনালে বিচারের মুখোমুখি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনে বলেন, এ বছরের মধ্যে শতাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে তদন্ত সম্পন্ন করে বিচারের মুখোমুখি করা যাবে। পর্যায়ক্রমে অন্যদেরও বিচারের আওতায় আনা হবে। তদন্তের স্বার্থে এসব ব্যক্তির নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি তিনি।

ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যারা একাত্তরে হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতনসহ মানবতাবিরোধী নানা অপরাধ করেছে, তাদের অনেকের বিচার হয়নি। বঙ্গবন্ধু তাদের ক্ষমাও করেননি। ফলে তাদের বিচার হবে। তাদের মধ্যে যারা জীবিত রয়েছে, তদন্ত সংস্থা তাদের তালিকা প্রস্তুত করেছে। এ ছাড়া জিয়াউর রহমান যাদের জেল থেকে ছেড়ে দিয়েছিলেন, তাদেরও বিচার হবে।’

এ বিষয়ে প্রসিকিউটর ড. তুরিন আফরোজ কালের কণ্ঠকে বলেন, তদন্ত সংস্থা এরই মধ্যে স্থানীয় পর্যায়ের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে। এ জন্য বিভিন্ন তদন্ত কর্মকর্তাকে দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে। যুদ্ধকালীন অপরাধের জন্য বিভিন্ন জেলায় প্রচলিত দণ্ডবিধির আওতায় ২০০৯ সাল থেকে যে মামলাগুলো দায়ের হয়েছে, সেগুলো ধরেই তদন্ত সংস্থা কাজ করছে। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ১৯৭২ সালের দালাল আইনে দণ্ডপ্রাপ্তরাও রয়েছে। তিনি বলেন, ‘দালাল আইনে যে বিচার হয়েছিল ওইটা ভিন্ন, এখন তাদের বিচার করা হবে ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনে। এ আইনের কার্যক্রম শুরুই হয়েছে ২০১০ সাল থেকে। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু যাদের ক্ষমা করেছিলেন, তাদের মধ্যেও অনেকের বিরুদ্ধে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। তাই ভিয়েনা কনভেনশনের ৫৩ অনুচ্ছেদ অনুসারে ওই ক্ষমার আদেশ বাতিল বলে গণ্য হবে।’ তুরিন বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের মাহিদুর ও চুটুর দালাল আইনে সাজা ভোগ করেছে। কিন্তু এবার তাদের মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছেন। এ রকম অন্যদেরও বিচারের আওতায় আনা হবে।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক এ এস এম সামছুল আরেফিনের “মুক্তিযুদ্ধ ‘৭১” এবং আজাদুর রহমান চন্দনের ‘যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যা ১৯৭১’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধকালে হানাদার পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করা ও স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের হত্যাসহ মুক্তিযুদ্ধবিরোধী কার্যকলাপ সংঘটনের বিভিন্ন অভিযোগে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে ১৯৭৩ সালের ৩১ নভেম্বর পর্যন্ত আটক করা হয়েছিল ৩৭ হাজার ৪৭১ জন রাজাকার, আলবদর ও দালালকে। সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পর প্রায় ২৬ হাজার জন মুক্তি পায়। অবশিষ্ট প্রায় ১১ হাজার অপরাধী বিচারের আওতায় ছিল। তাদের মধ্যে দুই হাজার ৮৪৮ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়েছিল। ১৯ জনের হয়েছিল মৃত্যুদণ্ড। ওই ১৯ জনসহ মোট ৭৫২ জনের সাজা হয়েছিল।

বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বলেন, রাজাকারমুক্ত বাংলাদেশ সবার চাওয়া। তবে স্থানীয় পর্যায়ের রাজাকারদের বিচারের জন্য শতভাগ স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করতে সরকারকে সব ধরনের ব্যবস্থা নিতে হবে।

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘শুনেছি তদন্ত সংস্থা স্থানীয় পর্যায়ের রাজাকারদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে। কিন্তু যে কয়টি ট্রাইব্যুনাল ও যে পরিমাণ জনবল রয়েছে, তা দিয়ে এত আসামির বিচার দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। তাই আইন মন্ত্রণালয়ের উচিত হবে পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ করা।’