বিশ্বের ব্যয়বহুল বিআরটি হচ্ছে গাজীপুর থেকে এয়ারপোর্টে

বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) গাজীপুর-এয়ারপোর্ট লাইন নির্মাণে ২ বছর ৩ মাস আগে একনেক সভায় অনুমোদন দেয় হয়। কিন্তু গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আর্থিক ব্যয় হয়েছে মাত্র ২ শতাংশ। নির্মাণকাজে গতি না বাড়ায় প্রথমবারের মতো এবার সময় বাড়ানো হচ্ছে ৯ মাস। তবে আর্থিক ব্যয় বাড়ছে না। সরকার গাজীপুর, টঙ্গী ও উত্তরা এলাকাকে যানজটমুক্ত করতে ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ পথ নির্মাণে ব্যয় ধরে ২ হাজার ৪০ কোটি টাকা। এতে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১০২ কোটি টাকা, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ ব্যয়বহুল বলে জানা গেছে।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সূত্র মতে, চাহিদার তুলনায় রাজধানীতে নাগরিক সুবিধা বিশেষ করে কার্যকর ও নিরাপদ গণপরিবহন ব্যবস্থা একেবারেই অপ্রতুল। আবার গাজীপুর থেকে টঙ্গী ও উত্তরা পর্যন্ত যানজটও ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। তাই ঢাকা নগরীর পরিবহন সমস্যা দূর করতে ২০০৫ সালে বিশ্বব্যাংক একটি সমীক্ষা পরিচালনা করে। সমীক্ষায় ৬টি করিডর চিহ্নিত করা হয়। তারমধ্যে ৩টি করিডরে ম্যাস র‌্যাপিড ট্রান্সজিট (এমআরটি) বা মেট্রোরেল এবং ৩টি করিডরে বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) লাইন স্থাপনের মাধ্যমে পরিবহন ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য সুপারিশ করা হয়। এছাড়া এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকও ২০১১ সালে বিআরটি স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই করে গাজীপুর-এয়ারপোর্ট সড়ক সম্ভাব্য হিসেবে বিবেচনা করে। এরই অংশ হিসেবে সরকার গাজীপুর-এয়ারপোর্ট ২০ কিলোমিটার লাইন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়। এটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে সড়ক ও জনপথ অধিদফতরকে।
সূত্র জানায়, বিআরটি লাইন গাজীপুর থেকে এয়ারপোর্ট স্টেশন পর্যন্ত ধরা হয়েছে। এরমধ্যে গাজীপুর থেকে জয়দেবপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত বিদ্যমান সড়ক ৪ লেন বিশিষ্ট এবং জয়দেবপুর থেকে চৌরাস্তা থেকে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত বিদ্যমান সড়কটি ৮ লেনবিশিষ্ট হবে। গাজীপুরে ১টি বাস টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি কিছু সড়ক প্রশস্ত, সার্ভিস সড়ক ও গাজীপুরে ৩ কিলোমিটার ড্রেনেজ ব্যবস্থা নির্মাণ করা হবে। এ জন্য ব্যয় হবে ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। পাশাপাশি প্রকল্পটির আওতায় ৮ লেন বিশিষ্ট টঙ্গী সেতু ও ৭টি মোড়ে ফ্লাইওভার নির্মাণেরও কথা রয়েছে। এতে ব্যয় হবে ৬৪০ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে প্রকল্পে মোট ব্যয় হবে প্রায় ২ হাজার ৪০ কোটি টাকা। কিলোমিটার প্রতি ব্যয় হবে প্রায় ১০২ কোটি টাকা।
এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, প্রকল্পটির আওতায় বিআরটির পাশাপাশি কিছু সড়ক প্রশস্ত করা হবে। এছাড়া টঙ্গী ব্রিজটি নতুন করে নির্মাণ করা হবে। এ কারণেই ব্যয় কিছুটা বেশি হবে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, বিশ্বের সর্বোচ্চ ব্যয়বহুল বিআরটি লাইন নির্মাণে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় ২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা ব্যয় দেখিয়ে ‘গ্রেটার ঢাকা সাসটেইনেবল আরবান ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্ট (বিআরটি গাজীপুর-এয়ারপোর্ট) শীর্ষক প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা-ডিপিপি পরিকল্পনা কমিশনের পাঠায়। তা যাচাই বাছাই করতে ২০১২ সালের ২৩ মে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি-পিইসি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এ ব্যাপারে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটিও গঠন করা হয়। ওই কমিটির সুপারিশ ও পিইসির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এর নির্মাণ ব্যয় ধরা হয় ২ হাজার ৩৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে বৈদেশিক সাহায্য হচ্ছে এক হাজার ৬৫০ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ঋণ হচ্ছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ১৬ কোটি ডলার, ফ্রান্স ডেভেলপমেন্ট এজেন্সির সাড়ে ৪ কোটি ডলার। আর গ্লোবাল ইনভাইরনমেন্টাল ফ্যাসিলিটিজ-জিইএফের অনুদান ৪৬ লাখ ডলার। আর সরকারি অর্থায়ন হচ্ছে ৩৮৯ কোটি ১৫ লাখ টাকা। এর বাস্তবায়নকাল ধরা হয় ২০১২ সালের মার্চ থেকে ২০১৬ সালের মার্চ পর্যন্ত। ২০১২ সালের ২০ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি-একনেক সভায় অনুমোদিত হয়।
বিআরটির জন্য জয়দেবপুর চৌরাস্তা থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত বিদ্যমান সড়কের দুই পাশে ডিভাইডার (সড়ক বিভাজক) দিয়ে পৃথক লেন করা হবে ২০ কিলোমিটার। বাসে ওঠানামার জন্য পথিমধ্যে ১৫টি স্টপেজ থাকবে। এক্ষেত্রে ভূমি থেকে দুই-তিন ফুট উঁচুতে ছাউনির ব্যবস্থা করা হবে। স্টপেজের সামনে বাস থামার পর সোজা হেঁটে যাত্রীরা তাতে উঠে যাবেন। আর্টিকুলেটেড বাস পারাপারের জন্য ছোট আকারের সাতটি ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হবে। দুই লেনের এ ফ্লাইওভারগুলোর দৈর্ঘ্য হবে প্রায় সাড়ে ৪ কিলোমিটার। বিআরটির বাকি পথ ১৫ দশমিক ৫ কিলোমিটার ভূমির সমতলেই থাকবে। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ কাজটি বাস্তবায়নে গঠন করা হয়েছে ঢাকা বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড। আর্টিকুলেটেড বাস (একাধিক বগির জোড়া লাগানো) রাখার জন্য গাজীপুরে ডিপো নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আহ্বান করা হয়েছে ওই অংশের দরপত্র। তাতেই অনেক সময় চলে গেছে। কিন্তু কাজের অগ্রগতি তেমন হয়নি। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে চলতি বছরের গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আর্থিক ব্যয় হয়েছে ৪২ কোটি ৭৬ লাখ টাকা বা ২ দশমিক ১০ শতাংশ। এর মধ্যে সরকারি অর্থ ১৬ কোটি ৭৮ লাখ টাকা এবং বৈদেশিক সাহায্য ২৫ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। তাই কাজের অগ্রগতি না হওয়ায় সময় বাড়ানোর জন্য গত জুন মাসে মন্ত্রণালয় থেকে প্রাশত সংশোধিত ডিপিপি পাঠিয়েছে পরিকল্পনা কমিশনে। এতে মোট ব্যয় না বাড়লেও বৈদেশিক সাহায্য ৪৫ কোটি ৪৪ লাখ টাকা কমিয়ে সরকারি অর্থায়ন বেশি ধরা হয়েছে। আর বাস্তবায়নকাল সময় বাড়ানো হয়েছে ৯ মাস। অর্থাৎ ২০১৬ সালের ডিসেম্বর মাসে এর নির্মাণ কাজ শেষ হবে। তা যাচাই-বাচাই করতে পরিকল্পনা কমিশনে গত ৭ মে পিইসি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। পরিকল্পনামন্ত্রীর নীতিগত অনুমোদনের পর অতি শিগগিরই একনেক সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থান করা হবে সূত্র জানায়।
যানজট নিরসনে বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত এক ব্যবস্থা। তাই অন্যান্য দেশেও স্থাপন করা হয়েছে। তবে এটাই হবে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল বিআরটি। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এক প্রতিবেদনে এমনই তথ্য উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, বিশ্বে প্রথম বিআরটি চালু হয় ব্রাজিলের কুরিতিবা শহরে ১৯৭৪ সালে। ৫৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্যবস্থাটি চালু করতে সে সময় ব্যয় হয় ৮ কোটি ৭০ লাখ ডলার। অর্থাৎ প্রতি কিলোমিটারে ব্যয়ের পরিমাণ ১৫ লাখ ডলার। আর ২০১২ সালে ভারতের আহমেদাবাদে ৭৫ কিলোমিটার দীর্ঘ বিআরটি চালু করতে ব্যয় হয় ১৪ কোটি ৪৮ লাখ ডলার। অর্থাৎ প্রতিবেশী দেশটিতেও এ ব্যবস্থা চালু করতে প্রতি কিলোমিটারে খরচ হয়েছে ১৯ লাখ ৩১ হাজার ডলার। সেখানে বাংলাদেশে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১০২ কোটি টাকা।