ঢাকা-আশুলিয়া এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা

উত্তরবঙ্গের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ করতে ঢাকা-আশুলিয়া এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সেতু কর্তৃপক্ষ। বিমানবন্দর সড়ক থেকে গাজীপুরের চন্দ্রা পর্যন্ত প্রায় ৩৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৩ হাজার ৬৫৩ কোটি টাকা। মূলত চীনের অর্থায়নে জিটুজি ভিত্তিতে এক্সপ্রেসওয়েটি নির্মাণে আগ্রহী সেতু কর্তৃপক্ষ। এজন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে প্রকল্পটির প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা।
প্রাথমিকভাবে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে (পিপিপি) ঢাকা-আশুলিয়া এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সেতু কর্তৃপক্ষ। তবে বিনিয়োগকারীদের আশানুরূপ সাড়া না পেয়ে বিদেশি অর্থায়নে নির্মাণ প্রস্তাব করা হয়েছে। এক্সপ্রেসওয়েটি নির্মাণ প্রস্তাবে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগ। বর্তমানে তা পরিকল্পনামন্ত্রীর অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সেতু বিভাগ ঢাকা-আশুলিয়া এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে ২০১২ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়কে (বুয়েট) দিয়ে একটি সমীক্ষা করায়। এতে বলা হয়, এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে ব্যয় হবে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা। এটি সংযুক্ত হবে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে শুরু হয়ে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধ, আবদুল্লাহপুর, আশুলিয়া, ঢাকা ইপিজেড হয়ে চন্দ্রায় গিয়ে শেষ হবে এক্সপ্রেসওয়েটি। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকার সঙ্গে ৩০ জেলার সংযোগ স্থাপনকারী আবদুল্লাহপুর-আশুলিয়া-বাইপাইল-চন্দ্রা করিডোরে যানজট অনেকাংশে কমে আসবে।
এদিকে দুই বছরের বেশি সময় পেরিয়ে যাওয়ায় নতুন করে প্রকল্প প্রাক্কলন করেছে সেতু কর্তৃপক্ষ। এক্ষেত্রে ব্যয় ধরা হয় ১৩ হাজার ৬৫৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে মূল এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে ব্যয় হবে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা, জমি অধিগ্রহণে ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা, বিস্তারিত নকশা প্রণয়নে ৩০০ কোটি ও পরিষেবা ব্যবস্থা স্থানান্তরে ১০০ কোটি টাকা। বাকি অর্থ পরামর্শক নিয়োগ, ব্যবস্থাপনা ফি ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য খাতে ব্যয় হবে।
এক্সপ্রেসওয়েটি নির্মাণে চীনের ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট কর্পোরেশনের (সিএমসি) সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করে সেতু বিভাগ। পিডিপিপির সঙ্গে এর কপিও সংযুক্ত করা হয়েছে। এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সেতু বিভাগ বলেছে, এটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকার সঙ্গে উত্তরের ৩০ জেলার চার কোটিরও বেশি মানুষ উপকৃত হবে।
জানতে চাইলে সেতু বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী কবির আহমেদ বলেন, প্রকল্পটি জনগুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু এ মুহূর্তে সরকারি অর্থে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। পিপিপিতেও ভালো বিনিয়োগকারী পাওয়া যায়নি। চীনা একটি কোম্পানি প্রস্তাব দিয়ে আর আসেনি। এখন আরেকটি চীনা প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এসেছে জিটুজি ভিত্তিতে অর্থায়নে। সবই যাচাই করা হচ্ছে। এর মধ্যে সরকারি অর্থে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের লক্ষ্যে পরামর্শক নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে।
সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনে বুয়েট জানায়, বর্তমানে ঢাকা প্রবেশের জন্য দেশের উত্তর-পশ্চিমের প্রায় ২৪টি জেলার জনগণ আবদুল্লাহপুর-আশুলিয়া-বাইপাইল-চন্দ্রা এবং দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ছয়টি জেলার জনগণ আবদুল্লাহপুর-আশুলিয়া-বাইপাইল-নবীনগর সড়ক ব্যবহার করে। এ অবস্থায় ৩০টি জেলার চার কোটির বেশি মানুষকে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে এ সড়কের মাধ্যমে সংযুক্ত করা সম্ভব হবে।
শ্রমঘন শিল্পাঞ্চল হিসেবে আশুলিয়া, সাভার, ডিইপিজেড ও গাজীপুরে প্রায় তিন হাজার টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি রয়েছে। এ এলাকার যানজটের কারণে রফতানিমুখী পণ্যবাহী ট্রাক এবং অন্যান্য যানবাহনকে শিল্পাঞ্চলের প্রায় ৩০ কিলোমিটার সড়ক অতিক্রম করতে অনেক ক্ষেত্রে ৩-৪ ঘণ্টাও লেগে যায়। এক্সপ্রেসওয়েটি নির্মাণ হলে শিল্প-কারখানার উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবীসহ ২৬ জেলার ৪০ লাখ মানুষের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগ সহজতর হবে।
সূত্র জানায়, সেতু বিভাগের সঙ্গে সিএমসির এমওইউতে প্রকল্পটি চীনা সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়ন (জিটুজি) করার কথা বলা হয়েছে। এমওইউর কপি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে (ইআরডি) পাঠানো হয়েছে। চূড়ান্ত চুক্তি সইয়ের কার্যক্রম ত্বরান্বিত করতে সেতু বিভাগ থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পুনরায় চিঠি দেয়া হয়।
সেতু বিভাগ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের অভিজ্ঞতা নেই সিএমসির। ফলে সহযোগী ঠিকাদার (সাব-কন্ট্রাক্টর) হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে চায়না রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানকে। এটা জানিয়ে সেতু বিভাগে চিঠিও দেয় প্রতিষ্ঠানটি। এছাড়া প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণের জন্য বাংলাদেশি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ডেভ কনসালট্যান্টসকে সমীক্ষার দায়িত্ব দিয়েছে সিএমসি। এটাও সেতু বিভাগকে জানিয়েছে সিএমসি। ওই চিঠিতে সিএমসি চীনের প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরের সময়ই চূড়ান্ত চুক্তি করার আগ্রহ প্রকাশ করে। সব মিলিয়ে চীনের সঙ্গে ওই সময় প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার ১০টি বড় অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পের চুক্তির পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে সরকার।
এদিকে সেতু বিভাগের কয়েক কর্মকর্তা বলেন, চীনা কোম্পানির মাধ্যমে জিটুজি পদ্ধতিতে প্রকল্পের খরচ বেড়ে যেতে পারে। কারণ একক ঠিকাদার কাজ করবেন বলে সেখানে প্রতিযোগিতার সুযোগ থাকবে না। এর আগে ২০১৩ সালে চীনের আরেক প্রতিষ্ঠান চায়না ইন্টারন্যাশনাল ট্রাস্ট অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন (সিআইটিআইসি) অর্থায়ন, সমীক্ষা, নকশা প্রণয়ন ও নির্মাণের যাবতীয় দায়িত্ব (টার্ন কি পদ্ধতি) নিয়ে ঢাকা-আশুলিয়া এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছিল। তাদের প্রস্তাবে ২ দশমিক ৭ থেকে ২ দশমিক ৯ শতাংশ সুদে অর্থের জোগান দেয়ার কথা বলা হয়েছিল। এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পর ব্যয় করা অর্থ ১৫ বছরে শোধ করার প্রস্তাব ছিল। এতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনারও অনুমোদন ছিল।
সিআইটিআইসির প্রস্তাব পেয়ে আগে থেকে চলা পিপিপি প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আহ্বান করা প্রাথমিক দরপত্রের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় সেতু বিভাগ। পিপিপিতে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ২০১১ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে বিনিয়োগকারী নির্বাচনে দুই দফা দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। সর্বশেষ দরপত্রে চীন, দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের সাতটি প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়ে তাদের প্রস্তাবও জমা দিয়েছিল।