জাহাজ নির্মাণ শিল্পে আশা জাগাচ্ছে ব্লু ইকোনমি

বিপুল সম্ভাবনা সত্ত্বেও কয়েক বছর ধরে খারাপ সময় পার করছে দেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্প। ইউরোপের মন্দায় সংকট দেখা দিয়েছে জাহাজ রফতানিতে। এর মধ্যেই জাহাজ নির্মাণ শিল্পে নতুন আশা জাগাচ্ছে ব্লু ইকোনমি।

জাহাজ নির্মাণ শিল্পের উদ্যোক্তারা বলছেন, ব্লু ইকোনমি পুরোপুরি কাজে লাগানো শুরু হলে বঙ্গোপসাগরে জাহাজের উপস্থিতি ব্যাপক হারে বাড়বে। দেশীয় জাহাজের পাশাপাশি বিদেশী জাহাজও এ কার্যক্রমে অংশ নেবে। এতে বিভিন্ন ধরনের জাহাজের চাহিদা বাড়বে। বাংলাদেশের শিপইয়ার্ডগুলোর এ বাজারের সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণের দক্ষতা রয়েছে। এছাড়া জাহাজের সার্ভিসিং, রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচর্যাও হবে শিপইয়ার্ডগুলোয়। এতে নতুন করে প্রাণ পাবে দেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্প।

ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মো. সাখাওয়াত হোসেন এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সমুদ্র ও সামুদ্রিক সম্পদ অন্বেষণ এবং আহরণ ব্লু ইকোনমির মূল উদ্দেশ্য। ব্লু ইকোনমি ধারণা বাস্তবায়নে প্রথমত একটি রোডম্যাপ তৈরি করা প্রয়োজন। তাতে জাহাজ নির্মাণ পরিধি আরো ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে। তাছাড়া ব্লু ইকোনমি থেকে প্রতিবেশী যেসব দেশ একই সুবিধা ভোগ করবে, তাদেরও এ ধরনের জাহাজের প্রয়োজন হবে। এটা ঠিক যে, এক্ষেত্রে আমাদের অনেক প্রতিযোগী থাকবে। তবে আমরা নিশ্চিত, যোগ্যতা ও প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে আমাদের অবস্থান প্রতিবেশী যেকোনো দেশের তুলনায় শীর্ষে থাকবে।’

২০০৯-১০ অর্থবছর থেকে দেশের রফতানি আয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে থাকে জাহাজ নির্মাণ শিল্প। অগ্রাধিকারমূলক খাত হিসেবেও একে ঘোষণা দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। কিন্তু গত কয়েক বছরে ইউরোপের চলমান মন্দায় বড় সংকটে পড়ে এ খাতের রফতানি।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে রফতানি হয় মাত্র ৪ লাখ ডলার। ২০১২-১৩ অর্থবছর আয় হয় ৫৯ লাখ ডলার। যদিও ২০১০-১১ অর্থবছরে এ শিল্প থেকে মোট রফতানি আয়ের পরিমাণ ছিল ৪ কোটি ৪ লাখ ডলারের। গত অর্থবছর জাহাজ রফতানি থেকে আয় বেড়ে হয় ১ কোটি ৫৯ লাখ ডলার।

সমুদ্রসীমা বিরোধ মীমাংসার পর বঙ্গোপসাগরে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার এলাকায় বাংলাদেশের অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়েছে। এ সমুদ্র অঞ্চলের ২০০ নটিক্যাল মাইলের বিশেষ অর্থনৈতিক এলাকাসহ ৩৫৪ নটিক্যাল মাইলের মহীসোপানে, সব ধরনের খনিজ ও প্রাণিজ সম্পদের মালিকানা বাংলাদেশের।

মেরিন সায়েন্সেস অ্যান্ড ফিশারিজ সূত্রমতে, সমুদ্র অর্থনীতিতে মত্স্যসম্পদ, জলজ সম্পদ, তেল ও গ্যাস, মেরিন মাইনিংসহ অনেক কিছুই রয়েছে। এসব সম্পদ আহরণে প্রয়োজন হবে বিভিন্ন ধরনের জাহাজ ও মেরিন সরঞ্জামের। বিশেষত বিভিন্ন ধরনের সার্ভে ও গবেষণাকাজে ব্যবহারযোগ্য জাহাজ ও ওয়ার্কবোটের প্রয়োজন পড়বে। দেশের শিপইয়ার্ডেই এগুলো তৈরি করা সম্ভব বলে মনে করছেন অনেকে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সেস অ্যান্ড ফিশারিজের অধ্যাপক ড. হোসেন জামাল বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের সমুদ্রসীমায় খনিজ ও প্রাণিজ সম্পদ কতটুকু আছে, তা নিরূপণে দ্রুত জরিপ করা দরকার। দেশের জাহাজ নির্মাণ খাত এখন অনেক বেশি শক্তিশালী হওয়ায় কাজটি সহজ হবে।’

উল্লেখ্য, জাতিসংঘের মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল (এমডিজি) প্রতিস্থাপন করে ২০১৫ সালে সাস্টেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল (এসডিজি) বা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সবচেয়ে বড় ইনস্ট্রুমেন্ট হচ্ছে ‘ব্লু ওশান ইকোনমি’ বা সংক্ষেপে ‘ব্লু ইকোনমি’। প্রতিবেশী দেশগুলো আরো আগেই এ অর্থনীতিকে নিজেদের প্রবৃদ্ধি অর্জনে কাজে লাগালেও মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিরসনের পর বাংলাদেশও এখন এদিকে জোর দিচ্ছে।