শাসক দলের অপরাধীদের তালিকা করছে পুলিশ

আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগ-যুবলীগের যেসব ক্যাডার সারা দেশে বেপরোয়া অপরাধ কর্মকাণ্ড শুরু করেছে, তাদের তালিকা তৈরি করছে পুলিশ। দুর্ধর্ষ ক্যাডারদের তালিকা করতে ৬৪ জেলার পুলিশ সুপারদের বিশেষ নির্দেশনা পাঠিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। শাসক দলের নাম ভাঙিয়ে যেসব জেলায় যারা অপরাধ কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে তাদেরই তালিকাভুক্ত করতে বলা হয়েছে। পুলিশ সুপাররাও সব কটি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) তালিকা করার নির্দেশ দিয়েছেন। ওসিরা সে অনুযায়ী কাজ শুরু করে দিয়েছেন বলে জানা গেছে।

তবে নিরপরাধ কোনো নেতা বা কর্মী যাতে তালিকাভুক্ত না হন সেদিকে বিশেষ নজর রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। গত সপ্তাহ থেকে এ তালিকার কাজ শুরু হয়েছে বলে একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। তালিকাভুক্তদের পরিবার-পরিজন বা স্বজনরা সরকারের প্রতিপক্ষ কোনো রাজনৈতিক দল বা শক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত কি না তাও খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

ক্ষমতাসীন দল ও বিশেষ করে সহযোগী সংগঠনগুলোর কিছু নেতাকর্মীর লাগামহীন অপরাধ কর্মকাণ্ডের কারণে দেশ-বিদেশে সমালোচনার ঝড় ওঠায় সরকার তাদের ব্যাপারে কঠোর অবস্থান নিচ্ছে। ইতিমধ্যে ঢাকার হাজারীবাগ ও কুষ্টিয়ার দুই ছাত্রলীগ নেতা ‘ক্রসফায়ারে’ মারা গেছেন। ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও অন্যান্য অঙ্গসংগঠনের দুর্ধর্ষ ক্যাডারদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে ওপর মহল থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

শাসক দলের অপরাধীদের তালিকা করছে পুলিশ

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কালের কণ্ঠকে বলেন, সন্ত্রাসীদের কোনো দল বা সংগঠন নেই। তারা দেশের প্রধান শত্রু। যেসব অপরাধী সরকারের নাম ভাঙিয়ে অপরাধ কর্মকাণ্ড করে আসছে তাদের বিরুদ্ধে অ্যাকশনে যেতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন, অপরাধীদের ছাত্রলীগ বা যুবলীগে স্থান হবে না। নাম ও দলীয় লেবাস গোপন করে কেউ ছাত্রলীগ ও যুবলীগে প্রবেশ করেছে কি না তাও অনুসন্ধান করা হচ্ছে।

পুলিশের মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক বলেন, অপরাধী অপরাধীই। তাদের কোনো দল থাকতে পারে না। যুবলীগ বা ছাত্রলীগ বুঝি না, যারা অপরাধ করবে, সরকারের সুনাম নষ্ট করবে বা দেশের মানুষকে জিম্মি করবে তাদের রেহাই নেই। ইতিমধ্যে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সূত্র জানায়, ইতিমধ্যে তালিকাভুক্তদের মধ্যে ঢাকা, বরিশাল, চট্টগ্রাম, ফেনী, কুমিল্লা, যশোর, খুলনা, সিলেট, মাদারীপুর, হবিগঞ্জ, চুয়াডাঙ্গা, নাটোর, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর ও কুষ্টিয়া অঞ্চলে ছাত্রলীগ-যুবলীগের দুর্ধর্ষ ক্যাডারদের নাম এসেছে। কার বিরুদ্ধে কয়টি করে মামলা আছে তাও উল্লেখ থাকছে তালিকায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন পুলিশ সুপার এই প্রতিবেদককে জানান, এসব ক্যাডারের তালিকা করার কাজ শুরু হয়েছে। তাদের ধরার চেষ্টা চলছে। ইতিমধ্যে যেসব তালিকা করা হয়েছে এর মধ্যে একাধিক ক্যাডার বিএনপি ও জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল বলে তথ্য পাওয়া গেছে। তারা লেবাস পাল্টে এখন ছাত্রলীগ বা যুবলীগ নেতা হয়ে অপরাধ চালাচ্ছে। তাঁরা বলেন, তিন-চার দিনের মধ্যে তালিকার কাজ সম্পন্ন হবে। অপরাধী কাউকে ছাড় না দেওয়ার নির্দেশনা এসেছে।

এদিকে তালিকার খবর শুনে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের অনেক অপরাধী নেতাকর্মী আত্মগোপনে যাচ্ছে বলে খবর পাওয়া গেছে। ফেনীর এক ছাত্রলীগ নেতা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গত দুই দিন ধরে পুলিশ ও র‌্যাব আমার বাসায় অভিযান চালিয়েছে। ভয়ে আমি ঢাকায় এক আত্মীয়ের বাসায় চলে এসেছি। আমার বিরুদ্ধে টেন্ডারবাজিসহ কয়েকটি মামলা আছে।’ তবে এসব মামলা রাজনৈতিক বলে ওই নেতা দাবি করেন।

ঢাকার উত্তরার এক যুবলীগ নেতার মতে, অনেকেই আতঙ্কে আছে। তবে পুলিশ ও র‌্যাব যা করছে তা অবশ্যই সাধুবাদ পাবে। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই প্রকৃত নেতারা দলে থাকুক।’

পুলিশ সূত্র জানায়, গত ১৩ আগস্ট রাতে রাজধানীর বাড্ডায় গুলিতে স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা মাহবুবুর রহমান গামাসহ তিনজন খুন হন। এ ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারীসহ হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের সবাই শাসক দলের সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী। এই ঘটনার রেশ না কাটতেই গত ১৫ আগস্ট কুষ্টিয়ায় আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে দলীয় এক কর্মী নিহত হন। ১৬ আগস্ট চাঁদা না পেয়ে স্থানীয় যুবলীগকর্মীরা চাঁদপুরের কচুয়ায় একটি স্কুলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করে। এতে ৪০ শিক্ষার্থী আহত হয়। এদের মধ্যে ২০ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দলীয় নেতাকর্মীদের এসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ক্ষুব্ধ করে তোলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। যে কারণে গত মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে তিনি মন্ত্রীদের হুঁশিয়ার করে দলীয় লোক বিবেচনায় কোনো অপরাধীর পক্ষে কোনো রকম তদবির না করতে নির্দেশ দেন। এ ছাড়া কোনো অপরাধী যেন আশ্রয়-প্রশ্রয় না পায় সে ব্যাপারেও মন্ত্রীদের সতর্ক করেন তিনি। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে চলমান সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি ও খুনোখুনি ঠেকাতে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর এ নির্দেশনার বিষয়টি জানিয়ে দেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধানদের।