ঐতিহ্যবাহী পণ্যের স্বত্ব নিবন্ধন সেপ্টেম্বরে

বাংলাদেশের রুপালি ইলিশের সুনাম বিশ্বজুড়ে। পদ্মার ইলিশের স্বাদ ও ঘ্রাণ এমন যে, শুধু নাম শুনলে অনেক বঙ্গসন্তানের জিভে জল চলে আসে। মাঝেমধ্যে রপ্তানি বন্ধের ঘোষণা এলে উত্তাপ ছড়ায় রাজনীতিতেও। প্রকৃতি ও ঐতিহাসিকভাবে পাওয়া ইলিশ মাছ ভৌগোলিক নির্দেশক (জিওগ্রাফিক্যাল ইনডিকেটর-জিআই) পণ্য হিসেবে শুধু এ দেশের। শীতলক্ষ্যা পারের জামদানি যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য ধারণ করে আসছে, যার বুননশৈলীর জন্য সুখ্যাতি আছে বিশ্বব্যাপী। জিআই পণ্য হিসেবে জামদানিও দেশের অন্যতম পরিচায়ক। এমনিভাবে নাটোরের কাঁচাগোল্লা, বগুড়ার দই, কুমিল্লার রসমালাই, রাজশাহীর সিল্ক, ফজলি আমসহ এমন অনেক ঐতিহ্যবাহী বিখ্যাত পণ্য রয়েছে, যেগুলো যুগ যুগ ধরে দেশের সুনাম বহন করে চলেছে। প্রকৃতিগতভাবে পাওয়া এগুলো এ দেশেরই পণ্য। এসব পণ্য যে নিজস্ব তা এত দিন বিশ্বব্যাপী দাবি করতে পারেনি বাংলাদেশ। আইন ও বিধি না থাকায় এসব পণ্য জিআই হিসেবে নিবন্ধিত করা যায়নি। অথচ পাশের দেশ ভারত এরই মধ্যে তাদের ৪০০টি ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য নিবন্ধন করে ফেলেছে।

তবে দেরিতে হলেও দেশের সব ঐতিহাসিক বিখ্যাত পণ্যের নিবন্ধন দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রকৃতি, কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত এ তিন শ্রেণি জিআই পণ্যের নিবন্ধন দিতে যাচ্ছে শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেড মার্ক অধিদপ্তর (ডিপিডিটি)। সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলছেন, আগামী মাস থেকে নিবন্ধনের কার্যক্রম শুরু হবে। সবাইকে সচেতন করার জন্য এবং পণ্যের নিবন্ধন করতে পত্রিকা ও টেলিভিশনে সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান ও বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হবে। কর্মকর্তারা বলছেন, ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের নিবন্ধন হলে অন্য কোনো দেশে এ পণ্য নকল করার সুযোগ থাকবে না। পাশাপাশি এটি যে শুধু বাংলাদেশের নিজস্ব পণ্য তা বিশ্বের দরবারে উপস্থাপন করা যাবে। যার মাধ্যমে দেশের সুনাম বাড়বে। একই সঙ্গে ওই পণ্যের প্রচার ও প্রসার হবে।

ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য বলতে বোঝায় যে পণ্য স্বাদ, ঘ্রাণ ও গুণে অতুলনীয়। যে পণ্যের ইতিহাস ও ঐতিহ্য দীর্ঘদিনের। যে পণ্যের বৈশিষ্ট্য সম্পূর্ণ আলাদা। যে পণ্য নির্দিষ্ট একটি জায়গায় উৎপাদিত হয়। যে পণ্যের রয়েছে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্রতা। যেসব পণ্যের রয়েছে স্বতন্ত্র ও অনন্য বৈশিষ্ট্য। এসব বৈশিষ্ট্য থাকলেও কেবল ওই পণ্য ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য বলে বিবেচিত হবে। বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের (বিএফটিআই) এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে ৪৫টি পণ্য আছে, যেগুলো ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে নিবন্ধনের দাবি রাখে। যেখানে প্রকৃতি, কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত এ তিন শ্রেণির পণ্য রয়েছে। প্রকৃতি ও ঐতিহাসিকগত শ্রেণিতে আছে, ইলিশ মাছ, জামদানি, কুমিল্লার রসমালাই, ফজলি আম ও পাট অন্যান্য পণ্য। কৃষিজাত পণ্যের মধ্যে রয়েছে নিম, কালিজিরা, শুঁটকি। আর প্রক্রিয়াজাত পণ্যের মধ্যে রয়েছে মসলিন, মিরপুরের কাতান, টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি, কুমিল্লার খাদি কাপড় ও মণিপুরি শাল। এসব পণ্য নিজ নিজ বৈশিষ্ট্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দেশের ঐতিহ্য ও সুনাম বহন করে চলেছে। আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) ভবনে আয়োজিত এক সেমিনারে বিএফটিআইয়ে গবেষণাটি উপস্থাপন করা হবে। যেখানে প্রধান অতিথি থাকবেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ।

ট্রেড রিলেটেড ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস (টিআরআইপিএস) চুক্তির আওতায় বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডাব্লিউটিও) সদস্য দেশগুলো তাদের দেশের পণ্য নিবন্ধন করতে পারে। ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইট চুক্তির ২২, ২৩ ও ২৪ ধারা অনুযায়ী, ডাব্লিউটিওর সদস্য প্রতিটি দেশের নিজেদের জনপ্রিয়, ঐতিহ্যবাহী ও বিখ্যাত পণ্য সংরক্ষণের অধিকার রয়েছে। এই চুক্তির আওতায় ভারত ইতিমধ্যে চার শতাধিক পণ্যের স্বত্ব নিজেদের করে নিয়েছে। তারা আরো ১৫৮টি পণ্যের তালিকা তৈরি করেছে পেটেন্ট করার জন্য। তবে বাংলাদেশ সরকার এখনো বিধিমালা চূড়ান্ত করতে পারেনি, পণ্যের ভৌগোলিক নির্দেশক নিবন্ধন তো দূরের কথা। বিধিমালা চূড়ান্ত না হওয়ার কারণে বিসিক কয়েক বছর আগে জামদানির নিবন্ধন পাওয়ার জন্য যে আবেদন করেছিল, তা অনুমোদন করতে পারেনি ডিপিডিটি। সংস্থার ডেপুটি রেজিস্ট্রার সাঈদুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, বিসিককে আবার আবেদন করতে হবে জামদানির নিবন্ধনের জন্য। আগের যে আবেদন করেছিল, সেটি বিধিমালা না থাকার কারণে দেওয়া যায়নি।

ডিপিডিটির কর্মকর্তারা বলছেন, ভৌগোলিক পণ্যের নিবন্ধন বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য একেবারেই নতুন বিষয়। অনেকে এ বিষয়ে অবগত নয়। স্বাধীনতার পর গত ৪০ বছরে আইন প্রণয়ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তবে ঐতিহাসিক ও স্বতন্ত্র পণ্যের সুরক্ষা দিতে শিল্প মন্ত্রণালয় আইন করার উদ্যোগ নেয় ২০০৯ সালে। পাঁচ বছর পর গত বছরের সেপ্টেম্বরে ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য (নিবন্ধন ও সুরক্ষা) আইন ২০১৩ সংসদে পাস হয়েছে। তবে বিধিমালা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। কবে নাগাদ বিধিমালা চূড়ান্ত হবে জানতে চাইলে ডিপিডিটির রেজিস্ট্রার সানোয়ার হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, জিআই আইন হয়েছিল ২০১৩ সালে; কিন্তু বিধিমালা চূড়ান্ত না হওয়ার কারণে এত দিন পণ্যের নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু হয়নি। তবে এ মাসের মধ্যেই বিধিমালা মুদ্রিত আকারে গেজেট হবে। সেপ্টেম্বর থেকেই নিবন্ধনের কার্যক্রম শুরু হবে। সানোয়ার হোসেন বলেন, ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের নিবন্ধন দেওয়া হবে দুই ক্যাটাগরিতে। প্রথমত, কয়েকজন মিলে একটি সমিতি করবে, সে সমিতিকে নিবন্ধন দেওয়া হবে। আর দ্বিতীয়ত, যারা উৎপাদক ও বিক্রেতা তাদের লাইসেন্স দেওয়া হবে।

পেটেন্ট, ডিজাইন ও টেড্র মার্ক অধিদপ্তরের (ডিপিডিটি) কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইলিশ মাছ কিংবা ফজলি আমের সঙ্গে যারা সংশ্লিষ্ট তাদের এককভাবে কোনো নিবন্ধন দেওয়া হবে না। নিবন্ধন দেওয়া হবে সমিতিকে। নিবন্ধন পেতে হলে ১০ হাজার টাকা দিয়ে আবেদন করতে হবে। এরপর সে আবেদন যাচাই-বাছাই করার পর যদি নিশ্চিত হওয়া যায়, ওই পণ্য ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে নিবন্ধনের যোগ্যতা রাখে, তবেই কেবল নিবন্ধন দেওয়া হবে। পণ্যটি ঐতিহাসিক কি না কিংবা এর মালিক এবং ওই পণ্যটি কোন জেলায় উৎপাদিত হয়, তার তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে। উদাহরণ দিয়ে এক কর্মকর্তা বলেন, পদ্মার ইলিশের জন্য রাষ্ট্রের পক্ষে মৎস্য অধিদপ্তর স্বত্বাধিকার পাওয়ার জন্য আবেদন করতে পারে।

ডিপিডিটির রেজিস্ট্রার সানোয়ার হোসেন বলেন, জিআই পণ্যের নিবন্ধন করা হলে কৃষক তার ন্যায্য দাম পাবে। পাশাপাশি ভোক্তাও ভালো বিষমুক্ত পণ্য পাবে। এতে দুই পক্ষই লাভবান হবে। তবে ভালো পণ্যের জন্য ভোক্তাকে বাড়তি দাম দিতে হবে।

এদিকে বিশেষজ্ঞরা অভিযোগ করেছেন, আইন না থাকার কারণে বাংলাদেশের জামদানি শাড়ি, নকশিকাঁথা ও ফজলি আমের মালিকানা হাতছাড়া হয়েছে। ওই সব পণ্যের মালিকানা স্বত্ব নিয়ে নিয়েছে ভারত। আরো অনেক পণ্যের মালিকানাও হাতছাড়া হতে চলেছে। কিন্তু সরকার পণ্যগুলো নিজের করে রাখতে কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। যত দ্রুত সম্ভব আইনের বিধিমালা চূড়ান্ত করে হারানো পণ্যের মালিকানা স্বত্ব ফিরে পেতে উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেন তাঁরা।

অবশ্য ডিপিডিটির কর্মকর্তারা বলছেন, ভারতের যেসব অঞ্চলে জামদানি, নকশিকাঁথা ও ফজলি আম উৎপাদিত হয়, সেসব অঞ্চলের নাম দিয়েই তারা পেটেন্ট করিয়েছে। বাংলাদেশের যে স্থানে ইলিশ উৎপাদিত হয়, সে স্থানের নামে পেটেন্ট করা হবে। অর্থাৎ বাংলাদেশের নিজস্ব আইনে পণ্যের নিবন্ধন হবে। একই কথা জামদানি ও আমের বেলায়ও প্রযোজ্য হবে। কর্মকর্তারা বলছেন, জিআইয়ের অন্যতম শর্তই হলো পণ্যের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে। পাশাপাশি স্থানের নাম থাকতে হবে। সেই হিসেবে জামদানির নিবন্ধন করতে হলে তা ঢাকার জামদানি, ইলিশের নিবন্ধন করতে হলে পদ্মার ইলিশ নামেই করতে হবে।