২০২৫ সালের মধ্যে ক্ষুধা অপুষ্টি দূর করার লক্ষ্য

৪০ বছর পূর্ণ হলো আন্তর্জাতিক খাদ্য নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইএফপিআরআই)। এ সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে খাদ্য-সংক্রান্ত নীতি গবেষণায় ভূমিকা রেখেছে সংস্থাটি। কাজ করেছে বিভিন্ন দেশের সরকারের সঙ্গে। এরই ধারাবাহিকতায় আগামী ১০ বছরের মধ্যে বিশ্বব্যাপী ক্ষুধা ও অপুষ্টি দূর করতে চায় আইএফপিআরআই। এজন্য দেশগুলোর সঙ্গে আরো নিবিড়ভাবে কাজ করতেও আগ্রহী এ সংস্থা। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর একটি হোটেলে সংবাদ সম্মেলনে এ বক্তব্য তুলে ধরেন সংস্থাটির মহাপরিচালক ড. সেনজেন ফন।

আজ বুধবার রাজধানীতে আইএফপিআরআইয়ের ৪০ বছর পূর্তি উদযাপন করা হবে। এ উপলক্ষে গতকাল সকালে ঢাকা আসেন ড. সেনজেন ফন।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, বিশ্বে বর্তমানে ৮০ কোটি মানুষ পর্যাপ্ত খাবার পায় না। তাই শুধু খাদ্য উৎপাদন করলেই চলবে না, সেটা হতে হবে মান ও পুষ্টিসম্পন্ন। তাহলেই ২০২৫ সালে ক্ষুধা ও পুষ্টিহীনতা দূর করা যাবে। আইএফপিআরআই বর্তমানে ৫০টি দেশে কাজ করছে। লক্ষ্য অর্জনে এসব দেশে সংস্থাটি তার কার্যক্রম আরো জোরদার করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। এজন্য বিশ্বব্যাপী ‘কমপ্যাক্ট ২০২৫: এন্ডিং হাংগার অ্যান্ড আন্ডারনিউট্রিশন’ প্রোগ্রাম গ্রহণ করেছে আইএফপিআরআই।

বাংলাদেশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গত দুই দশকে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার দ্রুত কমছে। এতে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যাও কমছে। তবে বাংলাদেশের ৭৭ শতাংশেরই পুষ্টি আসে ভাত থেকে। এটা দুর্বল খাদ্যাভ্যাসের পরিচায়ক। কারণ অধিক পরিমাণ ভাত খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এক্ষেত্রে খাদ্যাভ্যাসের বহুমুখীকরণ করতে হবে। তাহলেই ক্ষুধার পাশাপাশি পুষ্টির ঘাটতি দ্রুত দূর করা সম্ভব হবে।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ড. সেনজেন ফন বলেন, বিশ্বব্যাপী চাল ও গমের দাম কমছে। আর সবজি, মাছ ও মাংসের দাম বাড়ছে। তাই বাংলাদেশে চালের উৎপাদন কমা নেতিবাচক কোনো বিষয় নয়। বরং চাল উৎপাদন কমার পর মাছ ও সবজির উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে, এটা গুরুত্বপূর্ণ। এতে পুষ্টির চাহিদাও দ্রুত মেটানোর পাশাপাশি কৃষকের আয় বাড়ছে।

চালের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর প্রতি জোর দিয়ে তিনি বলেন, এতে কৃষকের আয় বাড়বে। এছাড়া জিংক, আয়রনসমৃদ্ধ চাল উদ্ভাবনের চেষ্টা চলছে। এ ধরনের ধান চাষ কৃষকের আয় বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে। এছাড়া বাংলাদেশের চাল আমদানিও খারাপ নয়। চীন ও ভারত থেকে চাল আমদানি করছে দেশটি। বরং আমদানির পাশাপাশি বাংলাদেশ উচ্চমূল্যের চাল ও বিভিন্ন সবজি রফতানি করছে। এতে আমদানির কয়েক গুণ অর্থ রফতানির মাধ্যমে আয় হচ্ছে। কৃষকরা উপকৃত হচ্ছেন।

সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) বিষয়ে বাংলাদেশের প্রশংসা করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ এমডিজির কিছু লক্ষ্য দ্রুত অর্জন করেছে। তবে এতে আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই। কারণ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় (এসডিজি) ২০৩০ সালের মধ্যে অতি দারিদ্র্যের হার, তথা ক্ষুধার্তের হার প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনতে হবে। আগামী বছর থেকে এসডিজি চালু হবে। দ্রুত এ লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশকে চেষ্টা করতে হবে।

কৃষি ভর্তুকির বিষয়ে তিনি বলেন, কৃষি উৎপাদন বহুমুখী করতে ভর্তুকির পরিবর্তে সরকার সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে। এক্ষেত্রে উচ্চ উৎপাদনশীল ধান উদ্ভাবন, জিংক বা আয়রনযুক্ত ধান চাষ এবং সবজি ও মাছ চাষ ইত্যাদি ক্ষেত্রে ভর্তুকি বিস্তৃত করতে হবে। এতে তা ভর্তুকি আকারে না থেকে সহায়তা কার্যক্রমে রূপান্তর হবে।

বাংলাদেশে আইএফপিআরআইয়ের কার্যক্রমের বর্ণনা দিতে গিয়ে বাংলাদেশ পলিসি রিসার্চ অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজি সাপোর্ট প্রোগ্রামের চিফ অব পার্টি আকতার আহমেদ বলেন, আইএফপিআরআইয়ের পরামর্শে ১৯৯৩ সালে সরকার শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি গ্রহণ করে। ব্যাপক সাফল্যের কারণে শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এতে প্রাথমিকে বিশেষত মেয়েদের ভর্তির হার অনেক বেড়েছে।

১৯৯৮ সালে বেসরকারি খাতে চাল আমদানির পরামর্শও দেয় আইএফপিআরআই উল্লেখ করে তিনি বলেন, সে বছর বন্যায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। ফলে দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা করা হচ্ছিল। সে সময় শুধু সরকারিভাবে খাদ্যশস্য আমদানি করা হতো। তবে আইএফপিআরআই পরামর্শ দিলে সরকার বেসরকারি খাতেও চাল আমদানির সুযোগ দেয়। ফলে দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা কাটিয়ে ওঠা যায়। ২০১০ সালে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি মূল্যায়ন করে নগদ ও খাদ্য উভয় ধরনের সুবিধা চালুর পরামর্শ দেয়া হয়। এছাড়া বর্তমানে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কৃষি সহায়তা ইউনিট প্রতিষ্ঠায়ও কাজ করছে সংস্থাটি।

সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মাঝে উপস্থিত ছিলেন আইএফপিআরআইয়ের হেড অব পার্টনারশিপ/বিজনেস ডেভেলপমেন্ট তিউনিস ভান রিন্যান ও বাংলাদেশ পলিসি রিসার্চ অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজি সাপোর্ট প্রোগ্রামের কমিউনিকেশন স্পেশালিস্ট মো. শফিকুল করিম।