বাংলাদেশকে হারতে দেয়া যাবে না

আবারো এক আগস্ট ট্রাজেডি তৈরির পাঁয়তারা চলছে। মহড়া চলছে সন্ত্রাস, খুন, জখম, রাহাজানি, ধর্ষণ, গুম প্রভৃতির মধ্য দিয়ে এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করার এবং তার কবলে ফেলে মানুষকে উত্তেজিত করার। আর এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত আছে একাধিক মহল। একাত্তরের পরাজিত শক্তির উত্তরাধিকার জামায়াত-শিবির, দ-প্রাপ্ত ও দ-প্রতীক্ষ যুদ্ধাপরাধীদের মিত্রপক্ষ, সরকারের ভেতরে সাধু সেজে ঘাপটি মেরে থাকা মিত্রবেশী শত্রুপক্ষ, দেশ-বিদেশের ভাড়াটে লবিস্ট প্রভৃতি মিলে জনবিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করছে সরকারকে। সরকারের অসামান্য সাফল্যগুলোকে ছাপিয়ে রেখে ত্রুটিগুলোকে বড় করে দেখানোর পাঁয়তারা চলছে। ঠিক যেমনটি করা হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর সময়ে। ড. রাশিদ আসকারী কথাসাহিত্যিক, লেখক, কলামিস্ট, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক

জাহেলিয়া যুগে আরব বিশ্বে শুনেছি শিশু নির্যাতনের কথা। কন্যাসন্তান জীবন্ত পুঁতে ফেলার কথা। কিন্তু বাংলাদেশে, আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিতে, অনেক চড়া দামে যার স্বাধীনতা আমাদের কিনতে হয়েছে, সেখানে যদি দেখি পৈশাচিক নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা যাচ্ছে একের পর এক শিশু_ এখন তাকে কী বলব? এক সময় ‘ছেলে-ধরা’র কথা শুনতাম। ছেলে ধরারা নাকি শিশুদের ধরে বস্তাবন্দি করে নিয়ে যেত। তারপর তাদের বেচত। ক্রেতারা তাদের বাধ্যতামূলকভাবে বিভিন্ন অসামাজিক কাজ করাত। আবার অনেককে হত্যা করে তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বাজারজাত করত। কিন্তু আজকালকার ‘ছেলে-মারা’রা তো ছেলে-ধরাদের চেয়ে ঢের বেশি ভয়ঙ্কর। ছেলে-ধরাদের কার্যপ্রণালি ছিল গোপন, কিন্তু ছেলে-মারারা সবকিছু করে প্রকাশ্যে। তারা ছিঁচকে চুরির অভিযোগে তেরো বছরের শিশুকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে পিটিয়ে হত্যা করে এবং সেই বর্বরতার দৃশ্য ভিডিওবন্দি করে ইন্টারনেটে ছাড়ে। বারো বছরের শিশুকে ফুটবলের মতো পাম্প করে হত্যা করে। ভূত ছাড়ানোর নামে আপন সন্তানকে পিটিয়ে হত্যা করে। এসব কিসের আলামত? এদের কর্মকা-কে কি জাহেলিয়া যুগের কর্মকা-ের সঙ্গে তুলনা করলে খুব অন্যায় হবে?
মধ্য জুলাই ২০১৫ থেকে আগস্টের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত চারটি নিষ্পাপ শিশু নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা গেছে। সিলেটের রাজনকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে শৃঙ্খলিত পশুর মতো পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ভয়ার্ত রাজনের আর্তচিৎকারের প্রতিধ্বনি মিলিয়ে যেতে না যেতেই খুলনার রাকিবকে বীভৎস পৈশাচিকতায় হত্যা করা হয়। পায়ুপথে গ্যাস কমপ্রেসার নজল ঢুকিয়ে প্রবল বায়ু প্রয়োগ করে তার ইনটেস্টাইন ছিন্নভিন্ন করা হয়েছে, লাঙন্স ফুটো করা হয়েছে বলে তার অটোপসি রিপোর্ট জানিয়েছে। এই বীভৎসতার নমুনা নাৎসি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পেও মিলবে কিনা জানিনা। রাকিব হত্যাকা-ের মাত্র একদিন পর আবারো পিটিয়ে শিশু হত্যার একটি ঘটনা ঘটল। কথিত ভূতে পাওয়া সুমাইয়াকে ভূত ছাড়ানোর নামে তার বাবা-মা এমনভাবে প্রহার করে যে, সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। এদিকে সামান্য মাছ চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে কিশোর মাদ্রাসা ছাত্র রবিউল ইসলামকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এগুলোই বা কিসের আলামত? কোনো সংঘবদ্ধ চক্রের দ্বারা এ ধরনের হত্যাকা- সংঘটিত হলেও না হয় একটা ব্যাখ্যার জায়গা পাওয়া যেত। কিন্তু তাৎক্ষণিক যৌথ উত্তেজনায় মানুষ যখন মারমুখী হয়েই থাকে এবং সুযোগ পেলেই তার প্রতিফলন দেখায়, তখন তার ব্যাখ্যার জায়গাটা এতটা যুক্তিনিষ্ঠ শোনায় না।
আর শুধু শিশু হত্যার কথাই বা বলছি কেন। হত্যাকা-ই যেন একটা রুটিন কর্মসূচি হয়ে দাঁড়িয়েছে। হারাধনের দশটি ছেলের মতো একের পর এক বস্নগার হত্যা করা হচ্ছে। ২০১৩-তে রাজীব হায়দার হত্যার মাধ্যমে বাংলাদেশে বস্নগার হত্যাকা-ের যে নৃশংস ধারা সূচিত হয়েছিল- তা অতি সম্প্রতি নিলয় হত্যাকা- পর্যন্ত এসে ঠেকেছে। তালিকা ধরে ধরে হত্যা করা হয়েছে অভিজিৎ রায়, ওয়াশিকুর রহমান, অনন্ত বিজয় এবং নিলয় চ্যাটার্জির মতো সোনার টুকরো ছেলেদের। যে পদ্ধতি ও পৈশাচিকতায় তাদের মারা হচ্ছে, তা বর্ণনার অতীত। এসব ঠা-া মাথার হত্যাকা-ে মনোবিশ্লেষকরা অনেক কিছুরই গন্ধ পাচ্ছেন। সে গন্ধের উৎসগুলো দৃশ্যমান হলে তখন হয়তো আর শেষ রক্ষাটুকু হবে না।
মানছি, সংঘটিত হত্যাকা-গুলোর সবই পরিকল্পিত নয়। সবই বিশেষ এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য করা হয়নি। কিন্তু হত্যাকা-, সে পরিকল্পিতই হোক, আর অপরিকল্পিতই হোক, সমাজে এক ধরনের নৈরাজ্য সৃষ্টি করে। আর এ নৈরাজ্য যদি পৌনঃপুনিকতা পায়, তাহলে তার সুযোগে বড় ধরনের কোনো নাশকতা সৃষ্টি হতে পারে। সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ছোট দুর্ঘটনার রেশ ধরে বড় দুর্ঘটনার আগমন ঘটে।
পঁচাত্তরের আগস্ট ট্রাজেডির আগে দেশে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এ ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করা হয়েছিল। খুন, জখম, নৈরাজ্য বাড়িয়ে মানুষের মনে একটা ক্ষোভ ও উৎকণ্ঠার ভাব সৃষ্টি করে মানুষকে সরকার বিদ্বেষী করে তোলার চেষ্টা করা হয়েছিল এবং ব্যাপক গণঅসন্তোষের জন্ম দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। পরে সুযোগ বুঝে আগস্ট ট্রাজেডির জন্ম দেয়া হয়। সংঘবদ্ধ খুনিচক্রের ঘৃণ্য চক্রান্ত বুঝে ওঠে কোনো প্রকার ব্যবস্থা গ্রহণের আগেই তাদের চক্রান্তের শিকার হন বঙ্গবন্ধু সপরিবারে। এখনো অনেকে মনে করেন, বঙ্গবন্ধু কঠোর হাতে পরিস্থিতি দমন করতে সক্ষম হলে তার নির্মম পরিণতি হয়তো বা ঠেকানো যেত। রক্তাক্ত আগস্টের সৃষ্টি হতো না। আবার এসেছে সেই মর্মান্তিক আগস্ট মাস। বাঙালির কান্নার মাস। আগস্ট এলেই আমরা আমাদের জাতীয় ষড়যন্ত্রগুলো গন্ধ পাই। এখনো পাওয়া যাচ্ছে। এখনো গভীরভাবে চিন্তা করলে বোঝা যাবে সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করে গণমানুষকে অসহিষ্ণু করে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে এক পর্যায়ে মানুষ অসহিষ্ণু হয়ে পড়বেও বৈকি। শিশু নির্যাতনের কিংবা বস্নগার নিধনের ঘটনার পরিসমাপ্তি না ঘটলে সরকারের ভিশন ২০২১-এর স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে। মানুষের সামাজিক অস্বস্তি নিরুদ্বিগ্ন না হলে উর্ধ্বমুখী আর্থিক সূচক দেখিয়ে তাদের শান্ত করা যাবে না।
একটি মধ্যযুগীয় ধর্মরাষ্ট্র ভেঙে গণমানুষের বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুকে প্রাণ হারাতে হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর রক্ত ও রাজনীতির সুযোগ্য উত্তরাধিকার শেখ হাসিনাকেও একাত্তরের ঘাতকদের মোকাবেলা করতে গিয়ে প্রাণ বাজি রাখতে হচ্ছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে গিয়ে সে বাজির মাত্রা অনেকখানিই বেড়ে গেছে। লেজে পা পড়া বিষাক্ত নাগ-নাগিনীরা যে প্রলয়কা- ঘটাতে চাইবে তাতে অস্বাভাবিকতা নেই। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় তারা একবার মহাপ্রলয় ঘটানোর চেষ্টা করেছিল। ভাগ্যগুণে বেঁচে যাওয়া শেখ হাসিনা তাদের নিত্যগাত্রদাহের কারণ। অতএব, সন্ত্রাস ও নৈরাজ্য সৃষ্টির মাধ্যমে সমাজকে অস্থির করে তুলতে পারলে এবং পর্যাপ্ত গণরোষ উৎপাদন করতে পারলে তাকে তার পিতার পরিণতি বরণ করানো অসম্ভব নয় বলে মনে করতে পারে ২১ আগস্টের পরিকল্পনাকারীরা।
বঙ্গবন্ধু পরিস্থিতি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন কিনা জানিনা। তবে তিনি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেননি। তার কন্যা আশা করি, অভিজ্ঞতার আলোকে পরিস্থিতি উপলব্ধি করবেন এবং যথাযথ ব্যবস্থা নেবেন। বর্তমান বাংলাদেশে ক্রমবর্ধিষ্ণু হত্যাকা-ের ঘটনায় উদ্বেগ জানাচ্ছে দেশ-বিদেশের মানুষ। সরকারের মানবাধিকার কমিশনই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্লিপ্ততায় বিস্ময় প্রকাশ করেছে। বিস্ময় প্রকাশ করছে সরকার পক্ষের মানুষও।
এখন সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের পক্ষ থেকে শূন্য সহিষ্ণুতা দেখানোর কোনোই বিকল্প নেই। কঠোরতম হাতে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে অবনতিশীল পরিস্থিতি। বিচারহীন, শাস্তিহীন অপরাধ ও বেপরোয়া অপরাধীরা চেইন বিক্রিয়ায় অপরাধ সংঘটিত করে যাচ্ছে এবং এক ধরনের দায়মুক্তির সংস্কৃতি সৃষ্টি হচ্ছে। এই অবস্থা অব্যাহত থাকলে-অর্থনৈতিক উন্নয়নে সরকারের যে ধারাবাহিক সাফল্য তার কৃতিত্ব একদিন মস্নান হয়ে যাবে। মানুষের অসন্তোষ বাড়বে এবং ষড়যন্ত্রকারীদের নীল নকশা বাস্তবায়নের পথ সুগম হবে_ যেমনটি হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর ক্ষেত্রে। আমরা বঙ্গবন্ধুকে হারিয়েছি। সে ক্ষতি কখনো পূরণ হওয়ার নয়। আমরা আর কাউকে এভাবে হারাতে চাই না। আর কোনো আগস্ট ট্রাজেডি বাংলার মাটিতে দেখতে চাই না। আবারো কোনো আগস্ট ট্রাজেডি এলে তার শিকার হবে বঙ্গবন্ধুরই আদর্শের কোনো উত্তরাধিকারী। শিকার হবে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের অবশিষ্টাংশ। পঁচাত্তরের আগস্ট ট্রাজেডির ধারাবাহিকতায় এসেছিল ২০০৪-এর আগস্ট ট্রাজেডি। আর তার ধারাবাহিকতায় যে কোনো সময় আসতে পারে আবারো কোনো আগস্ট ট্রাজেডি।
আবারো এক আগস্ট ট্রাজেডি তৈরির পাঁয়তারা চলছে। মহড়া চলছে সন্ত্রাস, খুন, জখম, রাহাজানি, ধর্ষণ, গুম প্রভৃতির মধ্য দিয়ে এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করার এবং তার কবলে ফেলে মানুষকে উত্তেজিত করার। আর এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত আছে একাধিক মহল। একাত্তরের পরাজিত শক্তির উত্তরাধিকার জামায়াত-শিবির, দ-প্রাপ্ত ও দ-প্রতীক্ষ যুদ্ধাপরাধীদের মিত্রপক্ষ, সরকারের ভেতরে সাধু সেজে ঘাপটি মেরে থাকা মিত্রবেশী শত্রুপক্ষ, দেশ-বিদেশের ভাড়াটে লবিস্ট প্রভৃতি মিলে জনবিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করছে সরকারকে। সরকারের অসামান্য সাফল্যগুলোকে ছাপিয়ে রেখে ত্রুটিগুলোকে বড় করে দেখানোর পাঁয়তারা চলছে। ঠিক যেমনটি করা হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর সময়ে। মাত্র সাড়ে তিন বছরের শাসনামলে একটি সম্পূর্ণ যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে দেশি-বিদেশি চক্রান্তের মোকাবেলা করে ধ্বংসস্তূপের ওপর সামাজিক-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইমারতের যে অবকাঠামো গড়ে তুলেছিলেন বঙ্গবন্ধু, তাকে ব্যর্থ প্রমাণ করে হত্যার পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল একাত্তরের পরাজিত শক্তি। এখন তারা উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রেও সেই কাজটি করতে চায়। তাদের চক্রান্ত প্রতিহত না করতে পেরে যদি হেরে যায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তি_ তাহলে আবারো হারবে বাংলাদেশ। আর বাংলাদেশকে হারতে দেয়া যাবে না কোনোভাবেই।