পদ্মা সেতু আর স্বপ্ন নয়

দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে পদ্মা সেতুর কাজ। পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণকে কেন্দ্র করে এখন নদীতীরে রাত-দিন চলছে বিশাল কর্মযজ্ঞ। প্রায় তিন হাজার শ্রমিক দেশের সর্ববৃহৎ ও স্বপ্নের এই সেতু নির্মাণে কঠোর শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন। সেতু নির্মাণে জড়িত শ্রমিকদের বর্ষা কিংবা তপ্ত রোদ কিছুই দমিয়ে রাখতে পারছে না। দেশি শ্রমিক ও প্রকল্প কর্মকর্তাদের সঙ্গে চীনা শ্রমিকরাও পদ্মা সেতুর অবকাঠামো গড়ে তুলতে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। ঢাকা থেকে ৩০ কিমি দূরে অবস্থিত মাওয়া ঘাটে পদ্মা সেতুর নির্মাণস্থলে পৌঁছালে নতুন দৃশ্য চোখে পড়বে। উত্তাল পদ্মার বুক চিরে সম্প্রতি বসানো হয়েছে ইস্পাতের পরীক্ষামূলক একটি পাইলিং। জার্মানি থেকে বিশাল ক্ষমতার অত্যাধুনিক হ্যামারটিও ইতিমধ্যে নির্মাণস্থলে এসে পৌঁছেছে।

প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা জানান, এখন পদ্মা সেতুর প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ চলছে। আশা করা হচ্ছে অক্টোবরের শেষ নাগাদ নদীতে মূল পাইলিং বসানোর কাজ পুরোদমে শুরু হবে। সে ক্ষেত্রে ২০১৮ সালের মধ্যেই পদ্মা সেতুর কাজ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তবে এরই মধ্যে প্রকল্প ব্যয় ২০ হাজার কোটি টাকা থেকে আরও ৮ হাজার ৭০০ কোটি টাকা বাড়িয়ে ২৮ হাজার ৭০০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমরা আশা করছি অক্টোবরের শেষ নাগাদ নদীতে পাইলিংয়ের কাজ শুরু হবে।’ তিনি বলেন, পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজ শেষ করার জন্য ২০১৮ সালের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে তা ঠিক আছে। আর কাজ সময়মতো শেষ হলে প্রকল্পব্যয় খুব একটা বৃদ্ধি পাবে না। তবে এখন জরুরি প্রয়োজনে কিছু অর্থ ব্যয় হচ্ছে। সামনেই ৩০০ কোটি টাকা ব্যয় হবে। বিশেষ করে ভাঙনরোধ ও নদীশাসনের জন্য যে ব্যয় হয় তা অনেকটা অপ্রত্যাশিত। শনিবার সকালে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, মাওয়া ঘাট থেকে প্রায় তিন কিমি দূর থেকেই পদ্মা সেতু প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। প্রকল্পের বিভিন্ন কর্মকর্তার অফিস ও আবাসনস্থল তৈরি শেষে পদ্মা সেতুর মূল সংযোগ সড়ক তৈরির কাজও এগিয়ে চলেছে। এর কিছুটা সামনে এগিয়ে গেলেই পদ্মা সেতুর মূল স্থাপনা তৈরির দৃশ্য চোখে পড়ে। মাওয়া ঘাট থেকে সামান্য দূরেই নদীতে কমলা রঙের বিশাল একটি ইস্পাতের অবকাঠামো বসানো হয়েছে। এটিই হচ্ছে সেতু তৈরির আগে মূল চ্যালেঞ্জ। অর্থাৎ পদ্মা সেতুর প্রথম টেস্ট পাইলিং। বেশ কয়েক দিন ধরে এ পাইলিংটির ভর সহ্য করার ক্ষমতা পরীবিক্ষণ শেষে অবশেষে পরীক্ষামূলক পাইলিংটি সফলভাবে স্থাপন সম্ভব হয়েছে বলে জানান প্রকল্পের কর্মকর্তারা। তারা জানান, এটি ছাড়াও পরীক্ষামূলকভাবে আরও কয়েকটি টেস্ট পাইলিংয়ের কাজ চলছে। পর্যায়ক্রমে বাকি টেস্ট পাইলিংগুলো স্থাপন করা হবে। তবে প্রথমটির মতো এগুলো স্থাপনে খুব বেশি সময় লাগবে না। টেস্ট পাইলিং বরাবর হাতের বাঁয়ে কিছুটা এগিয়ে যেতেই মূল সেতুর নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ কো. লিমিটেডের অফিসের প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সেতু-সংলগ্ন এলাকা ঘুরিয়ে দেখান।

দেখা যায় অফিসের সামনেই বিশাল এক ওয়ার্কশপ। সেখানে সেতু নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় সব যন্ত্রপাতি শ্রমিকরা তৈরি করছেন। শ্রমিকরা এই ওয়ার্কশপে পদ্মা সেতু তৈরির জন্য যে বিশাল পাইপ ব্যবহৃত হবে সেগুলো তৈরি করছেন। লোহার তৈরি প্রতিটি পাইপ দুই ইঞ্চি পুরু। এ ছাড়া পুনর্বাসন ও সার্ভিস এলাকা নির্মাণের কাজও শেষ পর্যায়ে। নদীভাঙন রোধে মাওয়ার দেড় কিমি এলাকাজুড়ে কাজ চলছে। পদ্মা নদীর চর কেটে নাব্যতা বৃদ্ধি করতে তিনটি ড্রেজার দিয়ে চলছে খননকাজ। নির্মাণ এলাকার আশপাশে জনসাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ। সেতু এলাকার বিভিন্ন জায়গায় ইট, পাথর ও বালুর স্তূপ। নিরাপত্তা-টুপি ও পোশাক পরা দেশি শ্রমিকদের পাশাপাশি চীনা শ্রমিক ও কর্মকর্তাদের দৌড়ঝাঁপই বলে দেয় বিশাল এই পদ্মা সেতু সময়মতো শেষ না হয়ে উপায় নেই! চীনা শ্রমিকদের স্পিডবোটে করে পদ্মা নদীর এক মাথা থেকে আরেক মাথায় চষে বেড়াতে দেখা যায়। দু’দণ্ড বিশ্রাম ও কথা বলার ফুরসতও যেন তাদের নেই। এদিকে সেতুর আশপাশে পদ্মা নদীতে মাটি ও বালু ফেলে সেখানে সড়ক তৈরির জন্য আরেক দল শ্রমিককে কাজ করতে দেখা যায়। এ ছাড়া নদীর বিভিন্ন অংশে বড় বড় চীনা ড্রেজিং মেশিনে শ্রমিকদের কাজ করতে দেখা যায়। পদ্মা সেতুর প্রকল্প পরিচালক সাইফুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমরা প্রথম টেস্ট পাইলিং বসাতে সক্ষম হয়েছি। আশা করছি নভেম্বর থেকে নদীতে পাইলিং বসানোর কাজ শুরু করতে পারব। মোট ১৮টি পরীক্ষামূলক পাইলিং বসানো হবে। আমরা প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ করছি। কাজের গতি দেখে আশা করছি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে, অর্থাৎ ২০১৮ সালের মধ্যে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শেষ করতে পারব।’ জানালেন, সর্বশেষ পদ্মা সেতুর জন্য নির্মাণব্যয় দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। বিষয়টি আজ-কালের মধ্যে একনেকে উঠবে। জানা যায়, বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এই সেতুতে যান চলাচলের পাশাপাশি রেলও চলবে। এর ওপর দিয়ে যানবাহন ও নিচ দিয়ে চলবে ট্রেন। ৬ দশমিক ১৫ কিমি দৈর্ঘ্য, দ্বিতলবিশিষ্ট এই সেতু কন্ক্রিট ও লোহায় তৈরি হচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় মূল সেতু ও সংযোগ সড়ক নির্মাণ, ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন, নদীশাসন ও পরামর্শক নিয়োগের জন্য প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছে। নির্মীয়মাণ সেতুর পাশেই অবস্থিত বাড়ির মালিক লাবলু খান বলেন, ‘আমার বাড়ির কিছু জায়গা প্রকল্প এলাকার মধ্যে পড়ায় সরকার আমাকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিয়েছে। এ ছাড়া মাওয়া ঘাটের পাশে যেসব পরিবার বাস করত তাদের অধিকাংশকেই অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।’ জানা যায়, ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে পদ্মার দুই পারে সাতটি পুনর্বাসন কেন্দ্রে তিন হাজার প্লট দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এরই মধ্যে দেড় হাজার প্লট হস্তান্তর করা হয়েছে।