বাংলাদেশের ট্রাউজার যুক্তরাষ্ট্রে শীর্ষে

২০১২ সাল থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে পুরুষদের পরা ট্রাউজার বাজারে বাংলাদেশের প্রাধান্য। এর আগে বাজারটি ছিল মেক্সিকোর হাতে। আর্থিক মূল্যেও যুক্তরাষ্ট্রে সর্বোচ্চ ট্রাউজার রপ্তানি হয় বাংলাদেশ থেকে। চীন, ভিয়েতনাম ও মেক্সিকোকে পেছনে ফেলে শীর্ষে ওঠা যদি সুখবর হয় তাহলে এর উল্টো চিত্রও আছে। যুক্তরাষ্ট্রে অন্য দেশগুলোর ট্রাউজারের ইউনিটপ্রতি দর তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও গত কয়েক বছর ধরেই ধারাবাহিকভাবে কমছে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি করা ট্রাউজারের দাম। মন্ত্রী থেকে প্রধানমন্ত্রী সব পক্ষ থেকে বাংলাদেশি পোশাকের দাম বাড়ানোর জন্য বায়ারদের প্রতি আহ্বান জানালেও এখন পর্যন্ত সেভাবে সাড়া পাওয়া যায়নি।

সম্প্রতি চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ অ্যাপারেল অ্যান্ড সেফটি এক্সপো-২০১৫-এর ‘ফিন্যানশিয়াল অ্যাপারেল গ্রোথ’ শীর্ষক সেমিনারে যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. জেনিফার বেয়ার ১৯৯০-২০১৪ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে কটন ট্রাউজার আমদানির একটি তথ্যচিত্র তুলে ধরেন। তথ্যচিত্রে দেখা যায়, ২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পুরুষের কটন ট্রাউজার সবচেয়ে বেশি আমদানি হয়েছে বাংলাদেশ থেকে। এ সময় বাংলাদেশ থেকে ৩১০ মিলিয়ন বর্গমিটার ট্রাউজার রপ্তানি হয়েছে। ২২৫ মিলিয়ন বর্গমিটার ট্রাউজার রপ্তানি করে এরপরেই আছে চীন। মেক্সিকো ও ভিয়েতনাম থেকে গেছে যথাক্রমে ১৭৫ ও ৭৫ মিলিয়ন বর্গমিটার ট্রাউজার।

ফলে গত বছর বাংলাদেশ থেকে ১৩০ কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের পুরুষের ট্রাউজার রপ্তানি হয়। ২০১২ সাল পর্যন্ত আর্থিক মূল্যে এই বাজারটি ছিল মেক্সিকোর দখলে। গত বছর মেক্সিকো থেকে যুক্তরাষ্ট্রে গেছে ১২০ কোটি ডলারের ট্রাউজার। আর চীন এবং ভিয়েতনাম থেকে যথাক্রমে ১১২ এবং ৪০ কোটি ডলারের ট্রাউজার রপ্তানি হয়েছে।

ড. জেনিফার বেয়ারের দেওয়া তথ্য-উপাত্তে যুক্তরাষ্ট্রে পুরুষের ট্রাউজার রপ্তানির পরিমাণ ও মূল্য বাংলাদেশ নিয়ন্ত্রণ করলেও ট্রাউজারের ইউনিটপ্রতি দর সবচেয়ে কম বাংলাদেশি পণ্যের। ১০ বছর আগেও বাংলাদেশ থেকে ট্রাউজারপ্রতি আমদানি ছিল ৩.৪ ডলার। গত বছরে বাংলাদেশ থেকে ইউনিটপ্রতি গড় খরচ দাঁড়িয়েছে মাত্র আড়াই ডলারে। একই সময়ে মেক্সিকো থেকে আমদানি করা ট্রাউজারের ইউনিট খরচ ৪.১ ডলার; চীন ও ভিয়েতনাম থেকে আমদানি করা ট্রাউজারের প্রতি ইউনিট খরচ হয়েছে তিন ডলার। প্রসঙ্গত, গত অর্থবছরে তৈরি ট্রাউজার রপ্তানি করে বাংলাদেশের আয় হয়েছিল ৫৬৯ কোটি ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ৪৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। রপ্তানি পণ্য হিসেবে টি-শার্টের পরেই দ্বিতীয় প্রধান রপ্তানি পণ্য হিসেবে যথারীতি ট্রাউজার বা প্যান্টের অবস্থান।

গার্মেন্ট ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে পোশাকের দাম কমে এসেছে। এর মধ্যে কাপড়সহ অন্যান্য জিনিসের দাম কমে যাওয়াও আরেকটি কারণ। তবে দাম কমার এই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ শীর্ষে থাকার অন্যতম কারণ হিসেবে নিজেদের মধ্যেই প্রতিযোগিতা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শীর্ষ গার্মেন্ট উদ্যোক্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সস্তা শ্রম যেমন দাম কম থাকার একটি কারণ, তেমনি নিজেদের মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতাও এদেশি পণ্যের দাম কমিয়ে দিচ্ছে। দাম কমিয়ে নিজেদের ক্ষতি নিজেরাই করছি। হাতে অর্ডার না থাকলে কম দরেই কাজ নিয়ে নিচ্ছে অনেকে। আর এই সুযোগটি নিচ্ছে বিদেশি ক্রেতারা।’

উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘কোনো বায়ারের সঙ্গে একটি পণ্যের উৎপাদন মূল্য কেউ পাঁচ ডলারে দর প্রস্তাব করেছে। অন্য কেউ সেই কাজ সাড়ে চার ডলারে নিয়ে নিচ্ছে। কারণ তার হাতে সেই সময় তেমন অর্ডার নেই। এভাবে দাম পড়ে যাচ্ছে এখানে। এ ধরনের ঘটনা হরহামেশাই ঘটছে।’

মূলত তীব্র প্রতিযোগিতার কারণেই পোশাকের ইউনিটপ্রতি দাম কমছে বলে জানালেন বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সহসভাপতি ও ইস্টার্ন অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাছির উদ্দিন চৌধুরী। এ প্রসঙ্গে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পোশাকশিল্পে এখন তীব্র প্রতিযোগিতা। কেউ সুযোগ হাতছাড়া করতে চায় না। আগামী দুই মাস পর যার হাতে কাজ থাকবে না, মেশিন বন্ধ থাকবে, সে তো শ্রমিকদের কর্মহীন রাখতে চাইবে না। কাজ না থাকলে যদি মাসে ৮০ লাখ টাকা লস হয়, সেখানে কম দামে অর্ডার নিয়ে সেই ক্ষতি ১০ লাখ থেকে ১৫ লাখে কমিয়ে আনার চেষ্টা করবে। সে ক্ষেত্রে অন্যদের তুলনায় কিছু কম দামে হলেও কাজটা নিয়ে নেবে। এটাই প্রতিযোগিতা। সব মার্কেটেই চলছে এই প্রতিযোগিতা। বরং ইউরোপে আরো খারাপ অবস্থা। ইউরোর দর পড়ে যাওয়ায় ইউরোপে ব্যবসা করা বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’

দাম বাড়ানোর আহ্বানের সঙ্গে একমত নন জানিয়ে বিজিএমইএর সাবেক এই নেতা বলেন, ‘বায়ারদের কাছে এ ধরনের আবদার করে লাভ নেই। তারা যেখানে দাম কম পাবে সেখান থেকেই পণ্য কিনবে। রপ্তানি বাড়াতে আমরা বরং নতুন নতুন মার্কেটের সন্ধান করতে পারি।’ জাপান, চীনের উদাহরণ দিয়ে তিনি জানান, এই মার্কেটগুলোতে ইদানীং বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ছে।