গঙ্গা ব্যারেজ নির্মাণের তোড়জোড়

‘গঙ্গা ব্যারেজ’ নির্মাণের কাজ শুরু করেছে সরকার। ভারতের ফারাক্কার মতো বাংলাদেশের পদ্মায় ‘গঙ্গা ব্যারেজ’ নির্মাণের তোড়জোড় চলছে। ইতোমধ্যে শেষ করা হয়েছে গঙ্গা ব্যারেজের সম্ভাব্যতা যাচাই ও সমীক্ষা। তবে ৩২ হাজার কোটি টাকা খরচে এ ব্যারেজ নির্মাণে এখনো অর্থের সংস্থান হয়নি। এরই মধ্যে শেষ হয়েছে সমীক্ষার আলোকে ব্যারেজ ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের ডিটেইলড নকশা তৈরির কাজ। ব্যারেজ নির্মাণে উন্নয়ন সহযোগীদের অংশগ্রহণের অভিপ্রায়ে প্রকল্পের প্রাথমিক উন্নয়ন প্রস্তাব (পিডিপিপি) অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে (ইআরডি) পাঠানো হয়েছে। এছাড়া প্রকল্পের উন্নয়ন প্রস্তাবও (ডিপিপি) চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে বিবেচনাধীন রয়েছে। অপরদিকে এরই মধ্যে ব্যারেজ নির্মাণের জন্য সম্ভাব্য স্থানও নির্ধারণ করা হয়েছে। রাজবাড়ী জেলার পাংশায় পদ্মা নদীতে এ ব্যারেজের সম্ভাব্য স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে।

জানা গেছে, পানিসম্পদমন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ আজ বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে তার মন্ত্রণালয়ের বোর্ড রুমে পানি উন্নয়ন বোর্ডের গঙ্গা ব্যারেজ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই ও সমীক্ষার ওপর নির্মিত তথ্যচিত্র প্রজেক্টরের পর্দায় দেখবেন। এটি পাওয়ার পয়েন্ট সফটওয়ারে উপস্থাপন করা হবে। এছাড়া গতকাল বুধবার রাজধানীর গুলশানের একটি অভিজাত রেস্টুরেন্টে ভারতের হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজে গঙ্গা ব্যারেজের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন পানিসম্পদমন্ত্রী। উল্লেখ্য, গত জুন মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকালে ‘গঙ্গা ব্যারেজ’ নির্মাণের অর্থায়ন নিয়ে চুক্তি হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি।

গঙ্গা ব্যারেজ সম্পর্কে পানিসম্পদমন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, প্রকল্পটি নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলছে। প্রাথমিকভাবে এ প্রকল্পে ৩২ হাজার কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। তিনি বলেন, গঙ্গা ব্যারেজ করে দেশের এক-তৃতীয়াংশে ইকোলজিক্যাল ব্যালেন্স আনা সম্ভব হবে। সুন্দরবন রক্ষা, লবণাক্ততা দূরীকরণ, আর্সেনিক কমানো, ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি, শতাধিক ছোট-বড় নদীতে শুষ্ক মৌসুমে পানি পৌঁছে দেয়া সম্ভব হবে।

পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নজরুল ইসলাম জানান, গঙ্গা ব্যারেজ প্রকল্প তথা গঙ্গা বাঁধ নির্মাণে ৪ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। এর মধ্যে ভারত সরকার ১ বিলিয়ন, জাইকা ২ বিলিয়ন এবং বিশ্বব্যাংকের কাছে ১ বিলিয়ন ঋণ সহায়তা চাওয়া হয়েছে। গঙ্গা বাঁধ নির্মাণের ফলে বাংলাদেশ-ভারত দুদেশেরই স্বার্থ সংরক্ষণ হবে। উল্লেখ্য, গত বছর সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ পরামর্শক কমিশনের (জেসিসি) তৃতীয় সভার সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ গঙ্গা ব্যারেজ সমীক্ষা প্রকল্পের সার-সংক্ষেপ ভারতের পানিসম্পদমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করেন। ভারতীয় পক্ষ রিপোর্টসমূহ পর্যালোচনা করে দুটি বিষয়ের ওপর মতামত দেয়। একটি হলো-ব্যারেজ নির্মাণের ফলে পানির উচ্চতা বাড়বে, যাতে ভারতীয় অংশে প্লাবন সৃষ্টি করবে। অপরটি হলো-নদীর তলদেশে পলি জমে পানির উচ্চতা আরো বাড়বে যাতে ভারতীয় অংশের প্লাবন আরো বাড়বে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ উপর্যুক্ত দুটি বিষয়ের ওপর মতামত দিয়েছে।

জানা গেছে, প্রস্তাবিত মূল ব্যারেজটি বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত থেকে ৮২ কিলোমিটার ভাটিতে এবং হার্ডিঞ্জ ব্রিজখ্যাত পাকশী ব্রিজ ও রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে ৫২ কিলোমিটার ভাটিতে অবস্থিত। সঠিক সময়ে অর্থের সংস্থান হলে আগামী ৫ বছরে গঙ্গা ব্যারেজ নির্মিত হবে। তবে এ প্রকল্প নির্মাণে চীন ও মালয়েশিয়া আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ ও ভারত সরকারের মধ্যে শুকনো মৌসুমে ফারাক্কা পয়েন্টে গঙ্গা নদীর পানি বণ্টনের লক্ষ্যে ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ৩০ বছর মেয়াদি এক ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালে শেষ হবে। সূত্র মতে, ১৯৭৫ সালে ভারত গঙ্গার উজানে ফারাক্কা নামক স্থানে ব্যারেজ চালু করায় বাংলাদেশের ভিতরে গঙ্গার প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। গঙ্গা চুক্তির আলোকে পাওয়া গঙ্গার পানির সমন্বিত ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বৃহত্তর রাজশাহী, কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, ফরিদপুর ও বরিশাল অঞ্চলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্যবিমোচন এবং পরিবেশ সংরক্ষণের উদ্দেশে গঙ্গা ব্যারেজ নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।

বাংলাদেশে গঙ্গার পানিনির্ভর এলাকা ৪৬ হাজার বর্গকিলোমিটার। গ্রোস উপকৃত এলাকা ৫১ দশমিক ৮৮ হেক্টর, চাষযোগ্য এলাকা ২৮ দশমিক ৭৭ হেক্টর এবং সেচযোগ্য এলাকা ১৯ হেক্টর। গঙ্গা ব্যারেজ ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি ধারণযোগ্য একটি বিশাল জলাধার সৃষ্টি করবে। জলাধারটি পাংশা থেকে পাংখা পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। যার দৈর্ঘ্য হবে ১৬৫ কিলোমিটার। ব্যারেজটি নির্মাণ সম্পন্ন হলে গঙ্গানির্ভর এলাকায় ১২৩টি আঞ্চলিক নদীতে পানি পৌঁছে দেয়া সম্ভব হবে। এছাড়া জলাধারের পানি প্রকল্প এলাকায় সারা বছর সেচ, ইলিশসহ মৎস্য সম্পদ উন্নয়ন, ১১৩ মেগাওয়াট পানিবিদ্যুৎ উৎপাদন, নৌপরিবহন, লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ, জলাবদ্ধতা সমস্যা নিরসন এবং প্রকল্প এলাকায় প্রাকৃতিক ভারসাম্য পুনরুদ্ধারসহ সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও বনজসম্পদ রক্ষার কাজে ব্যবহৃত হবে বলে প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে।

এছাড়া আরো জানা গেছে, গঙ্গা নদীর মোট দৈর্ঘ্য ২২শ কিলোমিটার। এর মধ্যে বাংলাদেশ অংশে পড়েছে মাত্র ২৪০ কিলোমিটার। আর এ অংশই পদ্মা নাম ধারণ করেছে। ফারাক্কা বাঁধের কারণে এই নদীতে দিন দিন কমে যাচ্ছে পানি। এর ফলে জীববৈচিত্র্য ধ্বংসসহ জলবায়ু পরিবর্তনে গোটা অঞ্চলে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে সার্বিক বিবেচনা আরো ভয়ঙ্কর। এক হিসাবে দেখা যায়, ১৯৭৬ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের সরাসরি ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কৃষিক্ষেত্রেই ৫০০ কোটি টাকার ওপর। সব মিলিয়ে বছরে ক্ষতি প্রায় ২৫০০ কোটি টাকা।