রেলওয়ের আধুনিকায়নের উদ্যোগ

কেনা হচ্ছে ২৩০০ কোটি টাকার ইঞ্জিন ও বগি

বাংলাদেশ রেলওয়ের ২৯৩টি ইঞ্জিনের মধ্যে ১৮৪টি বা ৬৩ শতাংশ আয়ুষ্কাল পার হয়ে গেছে। তারপরও ঝুঁকি নিয়ে ইঞ্জিনগুলো চলাচল করছে। তাই দুর্ঘটনা এড়াতে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০টি ইঞ্জিন, ২টি ক্রেন ও একটি সিমোলেটর কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। অপরদিকে, এক হাজার ১৬৫টি মিটারগেজ যাত্রী কোচের ৫৯০টির বয়স ৩১ থেকে ৩৫ বছরের বেশি। আর ৫৯১টি রেল কোচ নানা ত্রুটির মধ্যে চলাচল করছে। তাই যাত্রীসেবার মানোন্নয়নে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ২৬৪টি কোচ কেনার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। ভারত সাড়া না দিলেও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ঋণে এসব ইঞ্জিন এবং যাত্রী কোচ কেনা হচ্ছে। রেল মন্ত্রণালয় হালকা ইস্পাতের (মাইল্ড স্টিল) তৈরি পুরনো মডেলের কোচ কেনার প্রস্তাব করলেও পরিকল্পনা কমিশন তা নাকচ করে অত্যাধুনিক স্টেইনলেস স্টিলের কোচ কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের সূত্রমতে, ২ হাজার ৮৭৭ কিলোমিটার রেলপথে সেই মান্ধাতার আমলের রেলওয়ের বগি ও ইঞ্জিনের সংখ্যাই বেশি। এতে পথে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে। তাই এডিবির ঋণে এর মানোন্নয়নে বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য ২১৪টি মিটারগেজ ও ৫০টি ব্রডগেজ প্যাসেঞ্জার ক্যারেজ সংগ্রহ শীর্ষক প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে সরকার। এতে খরচ হবে এক হাজার ৪০৬ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। এছাড়া ২০টি লোকোমোটিভ সংগ্রহ শীর্ষক অপর একটি প্রকল্পও বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে সরকার। এটিও এডিবির ৭৮৫ কোটি টাকা ঋণে। এ দুটি প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত। রেলওয়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় গত ১৮ জুলাই রেল মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. ফিরোজ সালাহউদ্দিনের সভাপতিত্বে প্রকল্প যাচাই কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর একনেকে অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা- ডিপিপি পাঠানো হয়। তাতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে রেলওয়ের ২৯৩টি (লোকোমোটিভ) ইঞ্জিনের (১৯৬টি মিটারগেজ ও ৯৭টি ব্রডগেজ) মধ্যে ১৮৪টি বা ৬৩ শতাংশ ২০ বছর বয়স হওয়ায় অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল পার হয়ে গেছে। আবার ১৬৮টি (১১০টি মিটারগেজ ও ৫৮টি ব্রডগেজ) ইঞ্জিনের বয়স ৩০ বছরের বেশি। তারপরও ঝুঁকি নিয়ে এসব ইঞ্জিন চলাচল করছে। এগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করাও ব্যয়বহুল। তাই দুর্ঘটনা এড়াতে এডিবির ৭৮৫ কোটি টাকা ঋণে ১০টি মিটারগেজ ইঞ্জিন, ২টি ব্রডগেজ ক্রেন, একটি সিমোটার কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে সরকারি অর্থ ২৪০ কোটি টাকা এবং বাকি ৫৪৫ কোটি টাকাই এডিবির ঋণ নেয়া হচ্ছে।
অপরদিকে, রেলওয়ের এক হাজার ১৬৫টি মিটারগেজ যাত্রী কোচের ১৩৫টির বয়স ৩১ থেকে ৩৫ বছরের এবং ৪৫৫টির বয়স ৩৫ বছরের বেশি। ৫৯১টি রেল কোচ নানা ত্রুটির মধ্যে চলাচল করছে। তাই যাত্রীসেবার মানোন্নয়নে এক হাজার ৪০৬ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ২৬৪টি কোচ কেনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি অর্থ ৩৮২ কোটি ৬৫ লাখ টাকা এবং বাকি এক হাজার ২৩ কোটি ৯১ লাখ টাকা এডিবির ঋণ হিসেবে নেয়া হচ্ছে।
প্রায় ৪ বছর আগে এসব ইঞ্জিন, বগি কেনার জন্য ডিপিপি তৈরি করা হলেও ভারত সাড়া দেয়নি। বাধ্য হয়েই এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ঋণে এসব ইঞ্জিন এবং যাত্রী কোচ কেনা হচ্ছে। দুই প্রকল্পেরই মেয়াদকাল ধরা হয়েছে চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত। তা যাচাই-বাচাই করতে পরিকল্পনা কমিশনে গত ২৩ জুলাই প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি-পিইসি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় রেলওয়ে হালকা ইস্পাতের (মাইল্ড স্টিল) তৈরি পুরনো মডেলের কোচ কেনার প্রস্তাব করলে তাতে আপত্তি জানায় পরিকল্পনা কমিশন। সভায় প্রকল্পটি পুনর্গঠনে রেলওয়েতে ফেরত পাঠানো হয় এবং সাফ জানিয়ে দেয়া হয় যে, স্টেইনলেস স্টিলের বগি ভাঙাড়ির দরে হলেও শেষ পর্যন্ত বিক্রি করা যাবে।
সূত্র জানায়, এডিবির ঋণে গত বছরের ডিসেম্বরে ইন্দোনেশিয়া থেকে ১০০টি মিটারগেজ ও ৫০টি ব্রডগেজ অত্যাধুনিক স্টেইনলেস স্টিলের কোচ কেনার চুক্তি হয়। এতে মিটারগেজ কোচপ্রতি ব্যয় ধরা হয় ৩ কোটি ৪৫ লাখ ও ব্রডগেজে ৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ নতুন মডেলের স্টেইনলেস স্টিলের কোচগুলো কেনায় মিটারগেজে ১৮ লাখ ও ব্রডগেজে ১২ লাখ টাকা ব্যয় বেশি হবে। এতে ২৬৪টি কোচ কেনায় ৪৪ কোটি ৫২ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হবে।
মাইল্ড স্টিলের কোচের আয়ুষ্কাল সাধারণত ৩০-৩৫ বছর। অথচ স্টেইনলেস স্টিলের কোচের আয়ুষ্কাল ৮৫-৯০ বছর। এছাড়া স্টেইনলেস স্টিলের কোচের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় তুলনামূলক কম। তাই পুরনো মডেলের কোচ কেনার উদ্যোগ বাতিল হয়েছে।
উল্লেখ্য, রাষ্ট্রীয় ঋণ লাইন অব ক্রেডিটের আওতায় ভারত থেকেও ১২০টি ব্রডগেজ কোচ কিনছে রেলওয়ে। সেগুলোও স্টেইনলেস স্টিলের হবে এবং ঋণের শর্তানুযায়ী ভারত থেকেই কোচগুলো কিনতে হবে। গত জানুয়ারিতে কোচগুলো কেনার জন্য চুক্তি করা হয়। ১২০টি কোচ কেনায় ব্যয় হবে ৬২৪ কোটি টাকা। আর কর-ভ্যাটসহ মোট ব্যয় আসবে ৯৭৫ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে ভারত ঋণ দিচ্ছে ৭১০ কোটি ৬৩ লাখ টাকা।