বছরে ৬ হাজার কোটি ডলার রফতানি আয়ের লক্ষ্য

পাঁচ বছর পর দেশের বার্ষিক রফতানি আয় হবে ৬ হাজার কোটি (৬০ বিলিয়ন) ডলার। এজন্য রফতানি আয়ের প্রবৃদ্ধি দুই অঙ্কের ঘরে রাখতে হবে। এসব লক্ষ্য ধরে রফতানি নীতি ২০১৫-১৮ গতকাল অনুমোদন করেছে অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। যদিও সমাপ্ত অর্থবছর রফতানি আয়ের প্রবৃদ্ধি ছিল এক অঙ্কের ঘরে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। আর চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসে রয়েছে ঋণাত্মক। এসব বিবেচনায় রফতানি আয়ের এ লক্ষ্য অর্জন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা।

রফতানির এ লক্ষ্য অর্জনে বিদেশে বাংলাদেশের মিশনগুলোকে অধিক বাণিজ্যবান্ধব করে তোলার কথা বলা হয়েছে রফতানি নীতিতে। বাংলাদেশী পণ্যের ব্র্যান্ডিং, আমদানি বিকল্প শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পাশাপাশি রফতানিনির্ভর বৈদেশিক বিনিয়োগকেও উৎসাহিত করা হয়েছে নীতিতে।

২০২১ সালে ৬ হাজার কোটি ডলার আয়ের লক্ষ্য অর্জনে প্রতি বছর দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধির প্রয়োজন পড়বে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে রফতানি আয়ের লক্ষ্য ধরা রয়েছে ৩ হাজার ৬০০ কোটি ডলার। এজন্য আয়ের প্রবৃদ্ধির প্রয়োজন হবে ১৬ শতাংশ। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৪ হাজার কোটি ডলার আয় করতে প্রবৃদ্ধি হতে হবে ১২ শতাংশ। এছাড়া ২০১৭-১৮ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত রফতানি আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে যথাক্রমে ৪ হাজার ৫০০ কোটি, ৫ হাজার ২০০ কোটি ও ৫ হাজার ৯০০ কোটি ডলার। এজন্য প্রবৃদ্ধির প্রয়োজন হবে যথাক্রমে ১২, ১৫ ও ১১ শতাংশ। আর এ সময় পর্যন্ত রফতানি আয়ের গড় প্রবৃদ্ধি হতে হবে বার্ষিক ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ।

রফতানি আয়ের এ লক্ষ্যমাত্রাকে উচ্চাভিলাষী বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, আয়ের বতর্মান প্রবণতা বিবেচনায় নিলে রফতানি লক্ষ্য অর্জন দুরূহ ও ক্ষেত্রবিশেষে অসম্ভব। তবে এ অসম্ভবকে সম্ভব করাও সম্ভব। সেজন্য প্রয়োজন যথাযথ পরিকল্পন গ্রহণ ও দ্রুততার সঙ্গে তা বাস্তবায়ন।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে রফতানি প্রবৃদ্ধির গতি অনেকটাই শ্লথ। আবার আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা বৃদ্ধি নিয়েও সংশয় আছে। এগুলো বিবেচনায় নিলে আপাতদৃষ্টিতে রফতানি লক্ষ্য অর্জন নিয়ে খুব বেশি আশাবাদী হওয়া যাচ্ছে না।

তবে লক্ষ্য অর্জন যে একেবারে অসম্ভব, তাও মনে করছেন না এ অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, ‘আমাদের রফতানিকারকদের সরবরাহ সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সেজন্য নিশ্চিত করতে হবে গ্যাস, বিদ্যুৎ, বন্দরের মতো ভৌত অবকাঠামো সুবিধা। লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সমন্বয় রেখে বিনিয়োগ চাঞ্চল্য বাড়াতে হবে। মূল কথা, লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সমন্বয় রেখে সব ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। তবে এ সমন্বয়ের জায়গায় আমাদের দুর্বলতা রয়ে গেছে।’

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০৯-১০ অর্থবছরে তার পূর্ববর্তী অর্থবছরের তুলনায় রফতানি খাতে আয়ের প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ১১ শতাংশ। ২০১০-১১ অর্থবছরে আয়ের প্রবৃদ্ধি বেড়ে হয় ৪১ দশমিক ৪৭ শতাংশ। এর পর শুধু ২০১১-১২ অর্থবছরেই রফতানি খাতের আয়ের প্রবৃদ্ধি ছিল এক অঙ্কে; যার হার ছিল ৫ দশমিক ৯৯ শতাংশ। সমাপ্ত ২০১৪-১৫ অর্থবছরে রফতানি আয়ের প্রবৃদ্ধি আবারো এক অঙ্কে নেমে আসে; যার হার ৩ দশমিক ৩৫ শতাংশ। গত অর্থবছর রফতানি খাত থেকে আয় হয়েছে ৩ হাজার ১১৯ কোটি ৮৪ লাখ ৫০ হাজার ডলার। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ১৭ কোটি ৬৮ লাখ ডলার।

এদিকে চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে রফতানি আয়ের ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হয়েছে বলে জানা গেছে; যার হার ঋণাত্মক ১১ দশমিক ৯৬ শতাংশ। নতুন অর্থবছরের প্রথম মাসে রফতানি থেকে আয় হয়েছে ২৬২ কোটি ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে আয় ছিলো ২৯৮ কোটি ডলার।

এ বিবেচনায় এ লক্ষ্যমাত্রাকে উচ্চাভিলাষী বললেও একেবারে অসম্ভব মনে করছেন না রফতানি খাতসংশ্লিষ্টরা। এজন্য তারা চান সরকারের নীতিসহায়তা।

রফতানিকারকদের সংগঠন এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) সভাপতি আবদুস সালাম মূর্শেদী বলেন, সরকারের কার্যকর শিল্পনীতির মাধ্যমেই রফতানি লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব। কারণ বর্তমানে আমাদের বেশকিছু সমস্যা রয়েছে, যেগুলো সক্ষমতার দিক দিয়ে আমাদের পিছিয়ে দিচ্ছে। এর মধ্যে আছে ডলারের বিপরীতে টাকা শক্তিশালী হওয়াসহ ইউরোর দরপতনের মতো বিষয়গুলো। আর এ ধরনের সমস্যা থেকে উত্তরণ সম্ভব সরকারের নীতিসহায়তার মাধ্যমে।

রফতানি লক্ষ্য অর্জন শুধু সময়ের ব্যাপার, এমন মন্তব্য করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়নের সিনিয়র সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল-মামুন (এনডিসি) বলেন, ‘আমাদের শিল্প খাতের কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাপনা বড় ধরনের শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে। এছাড়া চীনের বিনিয়োগ আসতে শুরু করেছে দেশে। সব মিলিয়ে বর্তমান শিল্প সক্ষমতা কাজে লাগাতে পারলে ২০২১ সালের লক্ষ্য অর্জন না হওয়ার কারণ নেই। এ লক্ষ্য সামনে রেখেই নতুন রফতানি নীতি করা হয়েছে।’

নতুন রফতানি নীতিতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে ১২টি খাতকে। এগুলো হচ্ছে— অধিক মূল্য সংযোজিত তৈরি পোশাক ও গার্মেন্ট অ্যাকসেসরিজ, সফটওয়্যার ও আইটি এন্যাবল সার্ভিসেস ও আইসিটি পণ্য, ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্য, জাহাজ নির্মাণ, জুতা ও চামড়াজাত পণ্য, পাটজাত পণ্য, প্লাস্টিক পণ্য, এগ্রো প্রডাক্ট ও এগ্রো প্রসেসড পণ্য, ফার্নিচার, হোম টেক্সটাইল ও টেরিটাওয়েল, হোম ফার্নিশিং ও লাগেজ।

এছাড়া ১৪টি খাতকে বিশেষ উন্নয়মূলক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে— বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিকস পণ্য, সিরামিক পণ্য, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য (অটোপার্টস ও বাইসাইকেলসহ), মূল্য সংযোজিত হিমায়িত মত্স্য, পাঁপড়, প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং, অমসৃণ হীরা ও জুয়েলারি, পেপার ও পেপার প্রডাক্টস, রাবার, রেশমসামগ্রী, হস্ত ও কারুপণ্য, লুঙ্গিসহ তাঁত শিল্পজাত পণ্য ও নারকেল ছোবড়া।