আধুনিকায়ন হচ্ছে দুই পাটকল

পলিথিনের বিকল্প পাটপণ্য তৈরিতে সক্ষমতা বাড়াতে রাজধানী ঢাকার পাশে দুই পাটকল আধুনিকায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ প্রকল্পে সরকারি অর্থায়নের জন্য ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ ধরে পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। এ বিষয়ে পাট মন্ত্রণালয় থেকে একটি প্রকল্প প্রস্তাব পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

প্রকল্পের প্রস্তাবে পাটকল দুটির জন্য মোট ৪৮ কোটি টাকার কারিগরি স্পেয়ার পার্টস, ৮৫ কোটি টাকার অন্যান্য যন্ত্রপাতি, ২৪ কোটি টাকার বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি সংগ্রহ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেশ-বিদেশে প্রশিক্ষণসহ বেশ কয়েকটি খাত উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকল্পটির মাধ্যমে পাটকল দুটির বিদ্যমান অবকাঠামো সংস্কার, নতুন অবকাঠামো নির্মাণ, মেরামতযোগ্য যন্ত্রপাতি সংস্কার এবং মেয়াদোত্তীর্ণ যন্ত্রপাতি প্রতিস্থাপনসহ বিভিন্ন কার্যক্রম চালানো হবে। এতে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১৯৪ কোটি ২৪ লাখ টাকা। চলতি বছরের জুলাই থেকে বাস্তবায়নকাল ধরা হবে, যা শেষ হবে ২০১৮ সালের জুনের মধ্যে। কাজ শুরুর জন্য চলতি বছর এডিপিতে মোট ৪০ কোটি টাকার বরাদ্দ চেয়েছে পাট মন্ত্রণালয়। তবে ঢাকার অদূরে কোন দুটি পাটকল প্রাথমিকভাবে আধুনিকায়ন হবে তা এখনো সুনির্দিষ্ট করা হয়নি।

বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০১৬ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত মোট পাঁচ ধাপে ২৪টি পাটকল বিএমআরই সম্পন্ন হবে। আগামী বছর প্রথম ধাপে তিনটি, ২০১৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর পাঁচটি করে দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ ধাপের বিএমআরই শেষ হবে। ২০২০ সালে পঞ্চম ধাপে ছয়টি কলের বিএমআরই সম্পন্নের মাধ্যমে পুরো আধুনিকায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।

পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চলতি বছরের জুনে বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল চীন সফর করে। এ সময় চায়না ন্যাশনাল টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেল কাউন্সিল (সিএনটিএসি) ও সিটিএমটিসির সঙ্গে বিজেএমসির সমঝোতা চুক্তির অগ্রগতি পর্যালোচনা, চীনে পাটপণ্য বাজারজাতকরণ সম্ভাব্যতা যাচাই ও বাজার সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা হয়। এ ছাড়া সফরে সিটিএনটিসির সঙ্গে বিজেএমসির সঙ্গে বিএমআরই চুক্তি চূড়ান্ত করা নিয়েও আলোচনা হয়। চুক্তি অনুযায়ী বিএমআরইর জন্য ইকুইটি হিসেবে সিটিএমটিসি ১০ শতাংশ অর্থ দেবে। বাকি ৯০ শতাংশ দেবে চীন সরকার।

প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম এ বিষয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, দেশে পাট পণ্যের অনেক চাহিদা থাকার পরেও পাটকলগুলোর আধুনিকায়নের অভাবে চাহিদামতো পাটপণ্য সরবরাহ করা যাচ্ছে না। এ জন্য চীনা কম্পানির সঙ্গে গত বছর একটি চুক্তি করা হয়েছে। তবে এর আগে প্রাথমিকভাবে ঢাকার পাশের দুটি মিলকে আধুনিকায়ন করা হবে।

মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, পঞ্চাশ-ষাটের দশকের পুরনো মেশিন দিয়েই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে রাষ্ট্রায়ত্ত ২৬টি পাটকল। এতে একদিকে যেমন বাড়ছে অপচয়, অন্যদিকে লোকসান গুনছে বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন (বিজেএমসি)। তাই পাটকলগুলো আধুনিকায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আর এতে প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে বলে প্রাক-সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় জানিয়েছে চীনা প্রতিষ্ঠান চায়না টেক্সমাটেক কম্পানি লিমিটেড (সিটিএমটিসি)।

গত বছর চীনা প্রতিষ্ঠান সিটিএমটিসির সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি করে বিজেএমসি। এ চুক্তির আওতায় সম্পন্ন হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল আধুনিকায়ন-সংক্রান্ত প্রাক-সম্ভাব্যতা সমীক্ষা; যার প্রতিবেদনও এরই মধ্যে দাখিল করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ২৪টি পাটকল আধুনিকায়ন প্রকল্পে বিনিয়োগ হতে পারে পাঁচ হাজার ৯৯৭ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। গত বছরের অক্টোবরে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় পরিদর্শনকালে প্রধানমন্ত্রী পাটকলগুলোর পুরনো মেশিন বাদ দিয়ে আধুনিক মেশিন বসানোর নির্দেশনা দেন। ওই মাসেই চীনা সরকারের অর্থায়নে বিএমআরই প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)। ইআরডির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অক্টোবরেই অর্থায়নের অনুরোধ জানিয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে চীন সরকারকে চিঠি পাঠানো হয়। এর পরপরই বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরীর নেতৃত্বে উচ্চ পর্যায়ের একটি কমিটি চীন সফর করে।

পরিবেশবান্ধব পণ্য হিসেবে পাটের সুবিধা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। এটিকে ব্যবহারের পর সহজে ধ্বংস করা যায়। আবার এটিকে চাইলে পুনর্ব্যবহারও করা যায়। ইউরোপের অনেক দেশ এটির ব্যবহার শুরু করেছে। তাই বিশ্বে দিন দিন পাট এবং পাটজাত পণ্যের চাহিদা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বিজেএমসি সূত্র জানায়, সংস্থাটির অধীন বর্তমানে ২৬টি পাটকল এবং তিনটি অন্য কারখানা রয়েছে। সব চলমান রয়েছে। বর্তমানে পাটশিল্পের সঙ্গে দেশের প্রায় চার কোটি লোক জড়িত। প্রায় এক লাখ শ্রমিক-কর্মচারী এ শিল্পে কর্মরত।