মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে এশিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশ

মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে পুরো এশিয়া অঞ্চলের নেতৃত্ব দেবে বাংলাদেশ। এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপ (এপিজি) অন মানি লন্ডারিংয়ের প্রতিনিধিদের সন্তুষ্ট করতে পারলেই বাংলাদেশ নিয়ন্ত্রণ করবে পুরো এশিয়া অঞ্চলকে। মুদ্রা পাচার ও সন্ত্রাসী অর্থায়ন বন্ধে বাংলাদেশের নেয়া পদক্ষেপের সত্যতা যাচাইয়ে আগামী ১১ অক্টোবর ঢাকায় আসছে আন্তর্জাতিক মানি লন্ডারিং বিশেষজ্ঞ দল।
ইতিমধ্যে ভুটান ও মালদ্বীপকে এগমন্ট গ্রুপের সদস্য করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ চাইলেই কেবল ভুটান ও মালদ্বীপ এগমন্ট গ্র“পের সদস্য হতে পারবে। গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের তরুণরা মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশকে প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছে। ২০১৮-১৯ মেয়াদে বাংলাদেশ এপিজির কো-চেয়ারের দায়িত্ব পালনের জন্যে নির্বাচিত হয়েছে। আগামী বছর বাংলাদেশ এশিয়া প্যাসিফিক গ্র“প অন মানি লন্ডারিংয়ের (এপিজি) বার্ষিক সম্মেলন আয়োজন করবে। এর বাইরেও বাংলাদেশ জঙ্গীবাদবিরোধী দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নির্ধারণকারী সংস্থা ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্স (এফএটিএফ) বাংলাদেশকে এই স্বীকৃতি দিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান বলেন, মানি লন্ডারিং এবং সন্ত্রাসে অর্থায়ন বন্ধে বাংলাদেশ ব্যাংকে ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স বিভাগ রয়েছে। এটা এখন বিশ্বমানের। এ বিভাগের কর্মতৎপড়তার কারণে বাংলাদেশ ধূসর তালিকা থেকে বের হয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। এটা না হলে ঝুঁকিপূর্ণ দেশে পরিণত হতাম। তখন কেউ আমাদের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে চাইত না।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানান, ইতিমধ্যে ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্সের এফএটিএফ দেয়া ৪০টি শর্ত পূরণেও বাংলাদেশ কাজ করছে। ১১ থেকে ২৩ অক্টোবর এপিজির একটি প্রতিনিধি দল ঢাকায় আসবে। প্রতিনিধি দলটি টাইম বাউন্ড অ্যাকশন প্লান অনুযায়ী বাংলাদেশ কি করেছে তার ওপর আলোচনা করবে। পাশাপাশি সংস্থার দেয়া বিভিন্ন শর্ত বাংলাদেশ পূরণ করতে পেরেছে কিনা তাও খতিয়ে দেখবে দলটি।
এদিকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন সম্পর্কিত মামলা দায়েরের জন্য দুটি পৃথক যৌথ তদন্ত ইউনিট গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। যৌথ এ তদন্ত ইউনিটে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইডি) প্রতিনিধিরা থাকবেন। এ তদন্ত ইউনিট দুটি এর আগে অন্য আইনে দায়েরকৃত মানব পাচার ও সোনা চোরাচালান সম্পর্কিত মামলা এবং সন্ত্রাস প্রতিরোধ আইনে যেসব মামলা হয়েছে সংঘটিত সেসব সন্ত্রাসী ঘটনার সঙ্গে অর্থায়নের যোগসূত্রের বিষয়টি খতিয়ে দেখবে ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। সম্প্রতি সচিবালয়ে মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ আইন বাস্তবায়ন পর্যালোচনা সংক্রান্ত এক বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ম. মাহফুজুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে পুরো এশিয়া অঞ্চলকে নেতৃত্ব দেয়া শুরু করেছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ এগমন্ট গ্র“পের সদস্য হওয়া ছাড়াও এফএটিএফের ধূসর তালিকা থেকে বেরিয়ে এসেছে বাংলাদেশ। ধূসর তালিকা থেকে বেরিয়ে না এলে আমরা কালো তালিকায় ঢুকে যেতাম। তখন আন্তর্জাতিকভাবে আমাদের মানমর্যাদা প্রশ্নের মুখে পড়ত। তিনি বলেন, কোকোর পাচার করা টাকা ফেরত আনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টালিজেন্স ইউনিট বা বিএফআইইউ। এ প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে পৃথিবীর ৩৬টি দেশের সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের লেনদেন আর এফএটিএফের পর্যবেক্ষণের আওতায় থাকবে না।
সূত্রমতে, আইনে দুর্বলতা থাকায় শুরু থেকেই বাংলাদেশ গ্রে লিস্টে অন্তর্ভুক্ত ছিল। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৭ সালে অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধের আইনি কাঠামো আন্তর্জাতিক মানের করার উদ্যোগ নেয়। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ২০১২ সালে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ অধ্যাদেশ-২০১২, সন্ত্রাসবিরোধী আইন সংশোধন অধ্যাদেশ-২০১২ এবং অপরাধ সম্পর্কিত বিষয়ে পারস্পরিক সহায়তা অধ্যাদেশ-২০১২ নামে তিনটি অধ্যাদেশ জারি করে। তবে এগুলোয় অস্পষ্টতা থাকায় এফএটিএফের আঞ্চলিক সংস্থা এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপ অন মানি লন্ডারিং এপিজি বাংলাদেশকে ধূসর থেকে কালো তালিকাভুক্তির হুমকি দেয়। এরপরই নড়েচড়ে বসে সরকার। নতুন করে আবারও আইনি কাঠামো শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেয়া হয়। এপিজির পরামর্শে আইনগুলোকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একটি জাতীয় সমন্বয় কমিটি গঠন করা হয়। এ ছাড়া অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবের নেতৃত্বে একটি ওয়ার্কিং কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিগুলো দীর্ঘ দুই বছর কাজ করে এবং ১০০টিরও বেশি বৈঠক শেষে আইসিআরজির কাছে মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে নিজেদের সক্ষমতা তুলে ধরতে সমর্থ হয়। গত বছরের ২৩ নভেম্বর মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে বাংলাদেশের পদক্ষেপ সরেজমিন পরিদর্শনে আসে এফএটিএফের একটি প্রতিনিধি দল।