অর্থনীতি নাজুক অবস্থান থেকে ভালো ভিতে

ড. মোস্তাফিজুর রহমান প্রধান নির্বাহী, সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ বা সিপিডি

আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির স্বাধীনতা সংগ্রাম চূড়ান্ত পর্যায়ে সশস্ত্র রূপ নেয়। আমরা একটি পৃথক রাষ্ট্র, মানচিত্র, জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সঙ্গীত চেয়েছি। একই সঙ্গে তীব্র ছিল অর্থনৈতিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে বলেছিলেন, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। তিনি প্রথমেই বলেছিলেন ‘মুক্তির সংগ্রামের’ কথা। ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যে ইশতেহার ঘোষণা করে, তাতে অর্থনৈতিক কর্মসূচির বিশদ বিবরণ আছে। ১৯৬৬ সালে ঐতিহাসিক ৬ দফা স্বায়ত্তশাসনের কর্মসূচিতে অর্থনৈতিক দাবি-দাওয়া ছিল মুখ্য। কিন্তু আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে স্পষ্ট করেই বলা হয় যে, জনগণের জন্য অর্থনৈতিক মুক্তি আনতেই হবে। আমাদের জাতীয় নেতৃত্ব স্পষ্ট করেই বুঝতে পেরেছিলেন, রাজনৈতিক স্বাধীনতা যেমন অর্থনৈতিক মুক্তি ছাড়া হবে না, তেমনি অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিকল্প নেই।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হয়। সঙ্গত কারণেই বঙ্গবন্ধু সরকারের অন্যতম প্রধান কাজ হয়ে পড়ে যুদ্ধে বিধ্বস্ত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ এবং কৃষি-শিল্প-বাণিজ্যিক কার্যক্রম পূর্ণোদ্যমে শুরু করা। একই সঙ্গে প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাসহ সরকারের যাবতীয় অর্থনৈতিক দলিল এবং শীর্ষ নেতাদের ভাষণে উন্নয়নের পাশাপাশি মুক্তির আকাঙ্ক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পেতে থাকে। প্রথম দিকে এ কাজে সমস্যা ছিল তীব্র। বাংলাদেশ প্রায় ২৪ বছর পাকিস্তানের সঙ্গে ছিল। এ সময়ে দুই অঞ্চলের মধ্যে অর্থনীতিতে পরস্পর নির্ভর্রতা সৃষ্টি হয়। ১৯৭১ সালে এ সংযোগ ছিন্ন হয়ে গেলে আমাদের নিজস্ব অর্থনীতি গড়ে তোলার কাজে বড় ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। তদুপরি, ৯ মাসের সশস্ত্র সংগ্রামের সময় অর্থনীতির বিভিন্ন শাখায় ব্যাপক ক্ষতি হয়। আমাদের খনিজ সম্পদ তেমন ছিল না। জ্বালানি তেলের চাহিদার সবটাই আমদানি করে মেটানো হতো। খাদ্য উৎপাদনে ঘাটতি ছিল। শিল্প ভিত ছিল দুর্বল। একটি স্বাধীন দেশ যাত্রা শুরু করেছে; কিন্তু তার বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার ছিল শূন্য_ এমন নজির বিশ্বে মিলবে না। পাশ্চাত্যের কোনো কোনো পণ্ডিত এবং বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত কোনো বিশেষজ্ঞ সে সময়ে বাংলাদেশের সম্ভাবনা বিষয়ে চরম হতাশা ব্যক্ত করেছিলেন। হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে বলেছিলেন_ ‘বাস্কেট কেস’, যা অপরের সহায়তাতেই কেবল বেঁচে থাকতে পারে। ফারল্যান্ড এবং পার্কিনসন লিখেছেন_ ‘যদি বাংলাদেশে উন্নয়ন সফল হতে পারে, তাহলে এ বিষয়ে সামান্যতম সন্দেহও থাকা উচিত নয় যে, বিশ্বের যে কোনো স্থানেই উন্নয়ন সফল হবে। এ অর্থে বলা যায়, বাংলাদেশ হচ্ছে উন্নয়নের টেস্ট কেস।’ আমরা তাদের এ অভিমতকে এভাবেও ব্যাখ্যা করতে পারি যে, যদি বাংলাদেশ উন্নত ও সমৃদ্ধ হতে পারে, তাহলে বিশ্বের যে কোনো দেশ এ লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হবে।
বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য কী করতে হবে, সেটা বঙ্গবন্ধুসহ জাতীয় নেতৃত্বের অজানা ছিল না। লক্ষ্য অর্জনে আমাদের বৈদেশিক সহায়তা অত্যাবশ্যক ছিল। খাদ্যে ঘাটতি ছিল। আরও অনেক নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে ঘাটতি ছিল। জ্বালানি তেলের সবটাই আমদানি করতে হতো। অবকাঠামো ছিল বিপর্যস্ত। বিদ্যুৎ পেঁৗছাত সামান্য কিছু পরিবারে এবং সেখানেও ঘন ঘন লোডশেডিং চলত। শিল্প খাত ছিল দুর্বল। পাকিস্তানিদের পরিত্যক্ত কারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো সরকার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। এজন্য দক্ষ জনবলের অভাব ছিল। কিন্তু সরকারের কাছে বিকল্প ছিল না।
এ প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধুর সরকার অর্থনৈতিক উন্নয়নে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপন্থা গ্রহণ করে। এ ক্ষেত্রে দুটি দিক বিবেচনায় রাখা হয়। এক. দ্রুত উন্নয়ন এবং দুই. সম্পদের বণ্টনে দরিদ্র জনগোষ্ঠী যেন ন্যায্যপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত না হন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭০ সালে তার নির্বাচনী ভাষণগুলোতে বারবার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর কথা বলেছেন। স্বাধীনতার পর এ অঙ্গীকার বাস্তবায়নের প্রতি মনোযোগী হলেন। আয় বৈষম্য কমিয়ে আনার ওপর তিনি জোর দেন। বিশেষভাবে বলেন ইনসাফ কায়েমের কথা। তিনি দক্ষ ও যোগ্য লোকদের নিয়ে পরিকল্পনা কমিশন গঠন করেন, যাদের সঙ্গে তার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল ষাটের দশকে ঐতিহাসিক ৬ দফা কর্মসূচি প্রণয়নের সময়ে। তিনি কৃষি জমির সর্বোচ্চ সিলিং নির্ধারণ করেন। এর পরিমাণ এবং পরিবারের সংজ্ঞা নিয়ে মতের পার্থক্য ছিল; কিন্তু উদ্যোগটি ভালো ছিল তাতে সন্দেহ নেই। শিল্প-বাণিজ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত খাত সৃষ্টির মূলে ছিল সমাজে সম্পদের ন্যায্য বণ্টনের আকাঙ্ক্ষা। এসব স্বপ্ন কেবল বঙ্গবন্ধু কিংবা তার দলের ছিল না, জাতি হিসেবেই আমরা তা ধারণ করেছি। ১৯৭০ সালের নির্বাচন এবং স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে আরও কয়েকটি দলের কর্মসূচিতে শোষণ-বঞ্চনা থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা প্রায় অভিন্ন ভাষায় স্থান পেয়েছিল। আমাদের কাছে এটা স্পষ্ট ছিল যে, কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন নয়, অর্থনীতিতেও চাই ন্যায়বিচার।
১৯৭১ সালের পরবর্তী প্রায় সাড়ে চার দশকে আমাদের উন্নয়নের বিভিন্ন সূচক থেকে উন্নতি সম্পর্কে কিছু ধারণা মেলে। কারও কারও কাছে এ অগ্রগতি উৎসাহব্যঞ্জক, কেউবা মনে করেন আরও অর্জন সম্ভব ছিল। কৃতিত্ব কিংবা ব্যর্থতার দায়ভার নিয়ে আলোচনা চলতেই পারে। কিন্তু বাংলাদেশ যে ‘উন্নয়নের টেস্ট কেসে’ যথেষ্টই সফল_ সেটা নিয়ে এমনটি যারা এ তত্ত্ব দিয়েছিলেন তারাও দ্বিমত পোষণ করেন না। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের জিডিপি ছিল ৬২০ কোটি ডলার (চলতি হিসাবে), ২০১৪ সালে তার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৯ হাজার ৫০০ কোটি ডলার। আশির দশক থেকে প্রতি এক দশকে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ১ শতাংশ হারে বাড়ছে। মাথাপিছু আয় ১৯৭৩ সালে ছিল ১২০ ডলার, ২০১৫ সালে ১৩১৪ ডলার। দারিদ্র্যসীমার নিচে স্বাধীনতার পর দেশের প্রায় ৮০ শতাংশকে জীবন কাটাতে হতো, এখন তা ২২ শতাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। এ দেশ ছিল কৃষিভিত্তিক, জিডিপির বেশিরভাগ আসত কৃষি থেকে, এখন প্রায় ৮০ ভাগ আসে অকৃষি থেকে। খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে। আমদানি ও রফতানি খাত এখন অনেক বড়। প্রবাসে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি কাজ করছে। তারা প্রচুর অর্থ দেশে পাঠায়, যা বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডারকে ভালো অবস্থানে রাখছে। মোটা দাগের এসব তথ্য বলে দেয়, যে নাজুক অর্থনীতি নিয়ে বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়েছিল তা এখন ক্রমান্বয়ে শক্তি সঞ্চয় করছে। যারা এক সময়ে টেস্ট কেস ফর ডেভেলপমেন্ট বলেছিল, তারাই ২০০৯ সালে মতের পরিবর্তন ঘটান এবং লেখেন_ ‘দি টেস্ট কেস রিভিসিটেড’। তারা বুঝতে পারেন যে, বাংলাদেশ নিয়ে তাদের ধারণা ঐতিহাসিকভাবে ভ্রান্ত ছিল। এ সময়কালে বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তাবিহীন দেশ থেকে খাদ্য নিরাপত্তা অনেকটা নিশ্চিত করার অবস্থানে পৌঁছাতে পেরেছে, যার প্রশংসা মিলছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে। আমরা প্রবলভাবে ছিলাম বৈদেশিক সাহায্যনির্ভর দেশ, যেখান থেকে নিজস্ব সক্ষমতায় উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে পারছি। সত্তরের দশকে আমাদের রফতানি আয় ও বৈদেশিক সহায়তার পরিমাণ ছিল প্রায় সমান। এখন সে অবস্থা আর নেই। মুক্তবাজার অর্থনীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে বাংলাদেশ। বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা বেড়েছে। স্থানীয় শিল্পোদ্যোক্তারা রফতানি বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জন করতে পারছেন। রাষ্ট্রীয় খাতনির্ভর অর্থনীতি থেকে এখন বেসরকারি-ব্যক্তি খাতনির্ভর অর্থনীতি গড়ে উঠেছে এবং তাদের সরকার ও উদ্যোক্তা শ্রেণী উভয়েরই ভূমিকা রয়েছে। অর্থনীতিতে এ রূপান্তরের প্রভাব আমরা লক্ষ্য করছি জীবনযাত্রার ধরনে। মানুষের আয় বাড়ছে, ভোগে বৈচিত্র্য আসছে। হতদরিদ্র মানুষ এখন খুব কম। শিক্ষা-স্বাস্থ্যচিত্র বদলে যেতে শুরু করেছে। বস্তির সন্তানরাও মাধ্যমিক-উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পাচ্ছে। ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচিতে বাংলাদেশের সাফল্য বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হচ্ছে।
আমাদের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ভিশন ছিল আমদানি প্রতিস্থাপন শিল্পের ওপর গুরুত্ব প্রদান। তখন রাষ্ট্রীয় খাতের প্রাধান্য ছিল। সংরক্ষণমূলক নীতি অনুসরণ করা হতো। চার দশক পর বলা যায়, আমরা ঠিক সেই লক্ষ্য ধরে অগ্রসর হইনি। মাঝে নীতি-কর্মপন্থায় রদবদল হয়েছে; কিন্তু উন্নয়ন সূচকে পিছিয়ে পড়িনি।
এখন আমাদের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ। এগিয়েছি, কিন্তু এখন গতি বাড়াতে হবে। সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, চীন, ভারত, ভিয়েতনাম প্রভৃতি দেশ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। তাদের সঙ্গে আমাদের বৈদেশিক বাণিজ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। এখন জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের কিছু বেশি। ২০১৫ সালে ৮ শতাংশ লক্ষ্য ছিল এক সময়। তা অর্জন করা যায়নি। সামনে রয়েছে ২০২০ সালের জন্য চ্যালেঞ্জ_ ১০ শতাংশ। মাথাপিছু আয় আরও বাড়াতে হলে, নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে পেঁৗছাতে হলে ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতেই হবে। সামনে রয়েছে ২০২১ সালের আরেকটি চ্যালেঞ্জ_ উন্নত দেশের সারিতে যাওয়া। আমরা যদি ২০২১ সালে ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারি, তাহলে পরের ২১ বছরে মাথাপিছু আয় আটগুণ করা সম্ভব হবে। অর্থাৎ এখন ১৩১৪ ডলার থেকে ২১ বছরে বেড়ে হবে ১০ হাজার ডলারের মতো। বলা যায়, এক প্রজন্মেই এ উন্নত লক্ষ্যে পেঁৗছাতে হবে।
এজন্য বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতেই উৎপাদনশীল ও অনুৎপাদনশীল সব খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে জিডিপির ৩৫ শতাংশের মতো করা চাই। অর্থনীতির জন্য চাই দক্ষ জনশক্তি। অর্থনীতি, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি_ এসবের সমন্বয় চাই। কেবল দেশের অর্থনীতির চাহিদা পূরণের জন্য নয়, আন্তর্জাতিক বাজারের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। আমাদের তারুণ্যের শক্তি অনেক। সংখ্যায় তারা বেশি। উদ্ভাবনে-সৃজনে তারা নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ রাখছে বারবার।
বিশ্ববাজারে বৈচিত্র্যময় পণ্য নিয়ে যেতে হবে। ভারতসহ আশপাশের দেশগুলোতে বাজার সম্ভাবনা বেড়েছে। কানেকটিভিটি নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। আঞ্চলিক সহযোগিতার আরও কয়েকটি ফোরাম রয়েছে। তার সুযোগও কাজে লাগাতে হবে। বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার সুযোগ রয়েছে। গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ, বে অব বেঙ্গল গ্রোথ বেল্ট, এশিয়ান ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক_ বিশ্ব এগুলোর খবর রাখে। বাংলাদেশের ব্যাপারে চীন, ভারত ও জাপানের মতো অর্থনৈতিক শক্তি আগ্রহী_ এটাও আমাদের নতুন যুগে নিয়ে যেতে পারবে।
বিশ্বায়ন যেমন সুযোগ দেয়, তেমনি চ্যালেঞ্জও আনে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আমাদের পণ্যের প্রতিযোগী অনেক। ভিয়েতনাম সেখানে আমাদের চেয়ে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে। তারা শূন্য সুবিধা পায়, বাংলাদেশকে ১৬ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়। তাদের সঙ্গে টিকতে হলে নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। কৃষি-শিল্প সব খাতেই নতুন প্রযুক্তি চাই। দক্ষ জনশক্তি চাই। তাহলেই বিশ্বের সঙ্গে দাম ও মানের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব হবে।
আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ_ বৈষম্য কমানো। এখন এর গতি বিপরীতমুখী। উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে বৈষম্য বাড়ছে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা আছে। তবে সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করতে হলে শিক্ষায় জিডিপির অন্তত ৬ শতাংশ কিংবা জাতীয় বাজেটের ২০ শতাংশ বরাদ্দ করা চাই। এ ধরনের বিনিয়োগ এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের পার্থক্য তৈরি করে দেবে। আমাদের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনের জন্যও এর প্রয়োজন অপরিসীম। আমরা ২০৩০ সালের মধ্যে দারিদ্র্য সম্পূর্ণ দূর করতে চাই। এ ক্ষেত্রে মূল লক্ষ্য হবে_ কেউ যেন পিছিয়ে না থাকে, কেউ যেন সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়।
অর্থনীতির পাশাপাশি আমাদের সুশাসনের প্রতিও নজর দিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন_ এসব প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি জাতীয় সংসদসহ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোও শক্তিশালী করা চাই। অর্থনীতির ভিত মজবুত করার জন্যও ভালো রাজনীতি অপরিহার্য। এটা মনে রাখতে হবে, আমরা যখন হাঁটছি, আমাদের প্রতিযোগীদের অনেকে কিন্তু দৌড়াচ্ছে। তাদের সঙ্গে তাল মেলাতে আরেকটি প্রবল শক্তি আমাদের রয়েছে_ ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড। তাদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করা গেলে বাংলাদেশ প্রকৃতই বদলে যাবে।