মহাপরিকল্পনায় পর্যটন শিল্প

পর্যটন শিল্পে বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে। থাইল্যান্ড ও মালদ্বীপের মতো দেশের আয়ের অন্যতম উৎস পর্যটন খাত। অথচ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের নীলাভূমি বাংলাদেশ পর্যটন খাতে উন্নত হয়নি আজও। এবার পর্যটন খাতকে সমৃদ্ধ করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। পর্যটন খাত উন্নয়নে তদারকি করছে খোদ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। বেশ কয়েকটি পর্যটনসংশ্লিষ্ট প্রকল্প হাতে নিয়েছে বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেছেন, বাংলাদেশের পর্যটন খাত থেকে তৈরি পোশাক খাতের চেয়েও বেশি আয় সম্ভব। পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতি একজন বিদেশি পর্যটকের বিপরীতে ১১ জনের কর্মসংস্থান হয়। মন্ত্রী বলেন, যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে এ খাতকে বিনিয়োগের থ্রাস্ট সেক্টরে পরিণত করার পথে এগিয়ে যাচ্ছি, বিমান পরিবহন খাতেও আমরা ইতোমধ্যে বহুদূর এগিয়েছি।
পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবদের কাছে ডিও দিয়ে স্ব-স্ব মন্ত্রণালয় ও সংস্থার উদ্যোগে কর্মসূচি ঘোষণার অনুরোধ করেছে বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। এই সঙ্গে জাতীয়ভাবে কী-কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া যায় সে বিষয়ে প্রস্তাবনা চাওয়া হয়েছে। এরইমধ্যে ২০১৬ সালকে পর্যটন বর্ষ হিসেবে উদ্যাপন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এজন্য প্রত্যেক জেলা প্রশাসক, সিটি করপোরেশন এবং স্টেকহোল্ডারদের মতামত পাঠানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে। পর্যটন শিল্পের প্রচার ও বিপণনের উদ্দেশ্যে প্রত্যেক জেলার একটি পৃথক ব্র্যান্ডিং বা পরিচিতি গড়ে তুলতে স্থানীয় চেম্বার, প্রেসক্লাব, স্কুল-কলেজের শিক্ষক, তরুণ সমাজসহ বিভিন্ন পেশাজীবী ও স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি নিয়ে আলোচনা করতে জেলা প্রশাসকদের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে। দেশের বিভিন্ন দ্বীপবিষয়ক ট্যুরিজম বিকাশের স্বার্থে জেলার আওতাধীন দ্বীপের পরিচিতি পাঠাতেও বলা হয় চিঠিতে। এ পর্যন্ত ৩০টি জেলার জেলা প্রশাসক থেকে প্রস্তাবও পেয়েছে মন্ত্রণালয়।
সূত্রমতে, পর্যটন খাত নিয়ে এরইমধ্যে কয়েক দফা বৈঠক করে মন্ত্রণালয়। স্বাস্থ্য পর্যটন বিকাশে বাস ও ট্রেনে বিভিন্ন প্যাকেজ চালু, ট্রেনে বিদেশি পর্যটকদের জন্য পৃথক কম্পার্টমেন্টের ব্যবস্থা, পর্যটন আকর্ষণীয় স্থানে প্যাকেজ ট্যুর চালু, দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দরে সাজসজ্জা উন্নয়ন ও পর্যটন বর্ষের প্রচারসংক্রান্ত কার্যক্রমের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয় সেসব বৈঠকে।
মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, পর্যটকসহ সব ধরনের যাত্রীচাহিদা পূরণে বিমানবহরে নতুন এয়ারক্রাফট সংযোজনের পাশাপাশি বিমান বাংলাদেশ এয়ার লাইন্স বহুল প্রত্যাশিত অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট চালু করেছে। মংলায় খানজাহান আলী বিমানবন্দর নির্মাণকাজ শুরু হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন আধুনিক বিমানবন্দর হিসেবে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া বেশ কয়েকটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন। এর মধ্যে এডিপিভুক্ত অনুমোদিত প্রকল্প হচ্ছে চট্টগ্রামের মোটেল সৈকতের জমিতে নতুন পর্যটন মোটেল নির্মাণ এবং কক্সবাজারের হোটেল শৈবালের পার্শ্বদিক সম্প্রসারণ। এছাড়াও হাতে নেওয়া অন্য প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে ১. পারকি ও পতেঙ্গায় পর্যটন সুবিধা প্রবর্তন, ২. ভোলার মনপুরায় বঙ্গবন্ধু চিন্তা নিবাস পর্যটন কেন্দ্র এবং চর কুকরি-মুকরিতে পর্যটন সুবিধা প্রবর্তন, ৩. সাতক্ষীরা জেলার মুন্সীগঞ্জে পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণ, ৪. বরিশাল শহরে ১টি পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণ এবং বরিশালের দুর্গাসাগরে পর্যটন সুবিধা সম্প্র্র্র্র্রসারণ। এছাড়াও রংপুর, সিলেট, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, খুলনার মুজগুন্নি ও মংলায় পর্যটন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণ করতে চায় সরকার। শুধু তাই নয়, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে (পিপিপি) কক্সবাজার ও কুয়াকাটায় পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণের প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। এরমধ্যে অন্যতম টেকনাফের সাবরাং এক্সক্লুসিভ ট্যুরিস্ট জোন।
বাংলাদেশে এ বছরের ২৭ অক্টোবর বুড্ডিস্ট সার্কিটের ওপর একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন হতে পারে। ওই সম্মেলনে বাংলাদেশসহ চিন, জাপান, কোরিয়া, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, ভুটান, নেপাল, লাওস ও ভারতের পর্যটনবিষয়ক মন্ত্রী ও প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে দুই দিনব্যাপী এ সম্মেলন হওয়ার কথা রয়েছে। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সম্মেলনের মাধ্যমে পর্যটন খাতে নতুন সম্ভাবনা উন্মোচন হবে মনে করছে পর্যটন মন্ত্রণালয়। এছাড়া সরকারি-বেসরকারি পর্যটনসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে পর্যটন খাতের সমৃদ্ধিতে কাজ করতে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
এদিকে টেকনাফ স্থলবন্দরের কাছে নাফ নদীর বুকে ভাসমান ২৭১ দশমিক ৯৩ একরের জালিয়ারদিয়া দ্বীপটি পর্যটনের জন্য আকর্ষণীয়। নেটং পাহাড়ের ওপর থেকে দ্বীপটি দেখতে মুরগির ডিমের মতো দেখায়। এই দ্বীপে গড়ে তোলা হবে অর্থনৈতিক অঞ্চল।
গত শুক্রবার নয় সচিবসহ ১৩ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের একটি সরকারি প্রতিনিধিদল টেকনাফ পরিদর্শন করেছে। প্রতিনিধিদলটি টেকনাফের নাফ নদীর ভাসমান দ্বীপ ‘জালিয়ারদিয়া’ পরিদর্শনকালে তিন কিলোমিটার সৈকত পেরিয়ে সাবরাং এলাকায় যায়। প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদ। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, কক্সবাজারকে পর্যটনসহ পরিকল্পিতভাবে অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে গড়ে তুলতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খুবই আন্তরিক।