দুই কোটি লোকের কর্মসংস্থান হবে

দেশে আগামী ২০২০ সালের মধ্যে দারিদ্র্যের হার কমে ১৮ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে আসবে। আর অতিদারিদ্র্যের হার কমে ৮ দশমিক ৯ শতাংশ হবে। এ জন্য নতুন করে ১ কোটি ৮৭ লাখ লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে।

সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার খসড়া দলিলে এ লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ঢাকায় শেরেবাংলা নগরের বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে গতকাল রোববার দলিলটির দারিদ্র্য অধ্যায় নিয়ে আলোচনার আয়োজন করে পরিকল্পনা কমিশন। এতে বক্তারা শিল্প ও সেবা খাতের উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি অর্জন ও কর্মসংস্থান তৈরির মাধ্যমে দারিদ্র্য কমানোর পরামর্শ দেন। এর পাশাপাশি অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য আলাদা কর্মসূচি নিয়ে দারিদ্র্য হ্রাসের উদ্যোগ নিতে বলেন তাঁরা।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য শামসুল আলম। এতে বলা হয়, চলতি ২০১৫ সালের শেষ নাগাদ দারিদ্র্যের হার ২৪ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে আসবে। প্রতিবছর একই প্রবণতায় দারিদ্র্য কমে ২০২০ সালে তা ১৮ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে আসবে। একই সময়ে অতিদারিদ্র্যের হার এক অঙ্কে নেমে ৮ দশমিক ৯ শতাংশ হবে।

দারিদ্র্য কমাতে আট ধরনের কৌশলের উল্লেখ রয়েছে পরিকল্পনার খসড়া দলিলে। কৌশলগুলোর অন্যতম হলো—কর্মসংস্থান সৃষ্টি; রেমিট্যান্স বা প্রবাসী-আয়ের প্রবাহ অব্যাহত রেখে অপেক্ষাকৃত কম জনশক্তি রপ্তানি হয় এমন অঞ্চলকে প্রাধান্য দেওয়া; ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণ; তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বাজারসুবিধা নিশ্চিত করা; খামারবহির্ভূত গ্রামীণ বাণিজ্য, অবকাঠামো, যাতায়াত ও সেবা খাতের উন্নয়ন এবং ধনী-গরিবের মধ্যকার বৈষম্য কমাতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি।

আলোচনা: অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, ‘আমরা কেউ দরিদ্র থাকতে চাই না। সম্পদকে উৎপাদনমুখী খাতে বিনিয়োগ করে অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনার মাধ্যমেই দারিদ্র্য কমাতে হবে।’

দুর্নীতি সম্পর্কে মুস্তফা কামাল বলেন, ‘কোনো মানুষ দুর্নীতিবাজ হয়ে জন্মায় না। সমাজে চলার পথে তাঁরা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। কিন্তু আমরা সময়মতো পরিকল্পনা নিই না, এটা দুর্নীতির চেয়ে বড় অপরাধ। আমি দীর্ঘদিন হিসাববিদ হিসেবে কাজ করেছি। আমি জানি কোথায় দুর্নীতি হয়? ’

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের উপদেষ্টা মাহবুব হোসেন মনে করেন, উৎপাদনশীল খাতে প্রবৃদ্ধি হলে তাতে কর্মসংস্থান তৈরি হয়ে দারিদ্র্য কমবে।

কৃষি খাতকে শুধু খাদ্যনিরাপত্তার উপায় হিসেবে না দেখে বরং উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে দেখার পরামর্শ দেন মাহবুব হোসেন। তাঁর মতে, মৎস্য ও পশুপালন খাতের বিকাশ ঘটিয়ে সেটাকে কৃষি থেকে শিল্প ও সেবাভিত্তিক খাতে রূপান্তর করতে হবে। এর উদাহরণ হলো নিউজিল্যান্ড ও ডেনমার্ক।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, দারিদ্র্য বিমোচনকে টেকসই করতে হলে প্রবৃদ্ধি কোথা থেকে আসছে, সেটা দেখতে হবে। এর মানে, প্রবৃদ্ধির উৎস যেন দরিদ্র মানুষ হয়। গ্রামাঞ্চলে বেশি উৎপাদনশীলতা থাকলে দারিদ্র্য বিমোচন সহজ হবে। গ্রামের কম উৎপাদনশীল খাত থেকে দরিদ্র মানুষকে বেশি উৎপাদনশীল খাতে সম্পৃক্ত করতে হবে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষক জুলফিকার আলী বলেন, ‘ফুটপাতে ঘুমানো জনগোষ্ঠী, রেললাইনের ধারে বসবাসরত মানুষ, পাহাড়ের ঢালে যারা বসবাস করছেন, তাঁরা সবাই অতিদরিদ্র হলেও তাঁদের দরিদ্রতার ধরনে ভিন্নতা আছে। তাই ভিন্ন ভিন্ন দরিদ্রগোষ্ঠীর জন্য ভিন্ন ভিন্ন কৌশল নিতে হবে।’

অনুষ্ঠানে বিশেষ আলোচক ছিলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান। দৈনিক বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদের সঞ্চালনায় পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নানসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বক্তব্য দেন।

অনুষ্ঠানটি আয়োজনে সহায়তা করেছে যুক্তরাজ্যের দাতা সংস্থা ইউকেএআইডি ও বণিক বার্তা।