নতুন মুদ্রানীতি : উত্পাদনশীল খাতকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে

এবারের মুদ্রানীতিতে অনুত্পাদনশীল খাতে ঋণের লাগাম টেনে ধরে উত্পাদনশীল খাতে বিনিয়োগের দিকে নজর দেয়ার কথা বলা হয়েছে। ঢালাওভাবে ঋণ বিতরণের পরিবর্তে মানসম্পন্ন ঋণ দেয়ার জন্য ব্যাংকগুলোকে নিতে হবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। আর ব্যাংকগুলোকে নিজস্ব দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি খেলাপি ঋণও যথেষ্ট পরিমাণে কমাতে হবে। সেটা করা হলে ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমে যাবে স্বাভাবিকভাবে। ঘোষিত নতুন মুদ্রানীতিতে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। রপ্তানিকারকদের উত্সাহিত করতে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণও কমে আসার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া রপ্তানি নির্ভর শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাত, নারী উদ্যোক্তাসহ নির্দিষ্ট কিছু খাতে ব্যাপক অর্থ জোগানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সব মিলিয়ে এবারের মুদ্রানীতিতে আর্থিক খাতে গতি ফেরাতে বেশ কিছু বিষয়ে সংস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। এসব ইঙ্গিতগুলো বাস্তবায়িত হয়ে গেলে মূল্যস্ফীতিকে সংযত রেখে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জন সহজ হবে। এর মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি একটি টেকসই ভিত্তির উপর দাঁড়াতে সক্ষম হবে বলে আশা করা যায়।

এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার ব্যাপারে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর দক্ষতা বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে। এ দুটি বিষয় অর্থনীতির সমৃদ্ধির জন্য নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এর ফলে ঋণের সুদের হার কমে যেতে বাধ্য। নতুন মুদ্রানীতির লক্ষ্য যাতে অর্জিত হয় সে জন্য ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে যত্নবান হতে হবে। পাশাপাশি বেরিয়ে আসতে হবে রক্ষণশীলতার খোলস থেকে। মুদ্রানীতি প্রণীত হয়েছে ৭ শতাংশ হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধির জাতীয় লক্ষ্য পূরণে সর্বোচ্চ সহায়তার বিষয়টির পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে। গত কয়েক বছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৭ শতাংশের ওপরে ধরা হলেও একবারও তা অর্জন করা যায়নি। এখন ব্যাংকগুলোর হাতে ছোট মাঝারি এমনকি অতিকায় শিল্প-বাণিজ্যের উদ্যোগ গ্রহণের মতো অর্থ রয়েছে। অপাত্রে এ অর্থ তুলে দেয়া হোক সেটা কেউ চায় না। বাংলাদেশের ধনবান শ্রেণির একটি অংশ বিভিন্ন সময়ে ঋণ নিয়ে তা আদৌ পরিশোধ করেনি কিংবা নানা অজুহাতে ব্যাংকের পাওনা প্রদান বিলম্বিত করেছে। ব্যাংকগুলোকে খেলাপি ঋণের ধারা থেকে অবশ্যই বের হয়ে আসতে হবে। তবে পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও বিবেচনায় রাখতে হবে। গত কয়েকবছর ধরে রাজনৈতিক অঙ্গনে যে অস্থিরতা বাসা বেঁধেছে তার নেতিবাচক প্রভাব দেশের অর্থনীতিতে পড়েছে। যদিও এখন দৃশ্যপট পাল্টেছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংক কিছুটা সমপ্রসারণমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করার বিষয়টি বিবেচনা করতেই পারে। এখন মূল্যস্ফীতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলা যায়। সরকারের বিশেষ মনোযোগ রয়েছে কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য শিল্প ব্যবসা বাণিজ্যের নানা উদ্যোগ বাস্তবায়নের দিকে। এজন্য মূলত নির্ভর করতে হবে বেসরকারি বিনিয়োগের ওপর। তাদের হাতেই উচ্চতর প্রবৃদ্ধির চাবিকাঠি রয়েছে। তবে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ও শৃঙ্খলা বজায় থাকলে এ শঙ্কা অনেকটাই দূর হয়ে যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত এ বিষয়টির দিকে বিশেষভাবে মনোযোগ দেয়া। এজন্য প্রয়োজন সরকারি ও বেসরকারি সব ধরনের ব্যাংকের কর্মকাণ্ড যথাযথভাবে মনিটরিং নিশ্চিত করা। সবাইকে এটা উপলব্ধি করতে হবে, ব্যাপক কর্মসংস্থানের জন্য বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। আর বিনিয়োগের জন্য দরকার সুদের হার কমানো। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে অনেক গতি আনতে হলে কিছুটা মূল্যস্ফীতি তেমন উদ্বেগের বিষয় নয়। দেশে মূল্যস্ফীতি বর্তমানে পরিমিত মাত্রায় রয়েছে। বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশের কিছুটা বেশি।

বেসরকারি বিনিয়োগ চাঙ্গা করার উপযুক্ত সময় এখন। দেশের বেশির ভাগ সম্পদের মালিক ৪০ লাখ মানুষ অথচ কর দেয় ১০ লাখ মানুষ। এই ব্যবধান ঘুচাতে হবে। বর্তমান সরকার বিনিয়োগবান্ধব সন্দেহ নেই। বিনিয়োগ বাড়াতে নানামুখী উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। তবে বিনিয়োগ বাড়াতে অর্থনৈতিক নীতিগুলোর (শিল্প, বাণিজ্য, রাজস্ব ও মুদ্রানীতি) মধ্যে অধিকতর সমন্বয় সাধন জরুরি। এ জন্য সরকারের সব প্রতিষ্ঠানকে একত্রে কাজ করতে হবে। আর্থিক নীতিগুলোর ধারাবাহিকতা বজায় রাখারও প্রয়োজন রয়েছে। মুদ্রানীতির কিছু অংশে প্রয়োজনে পরিবর্তন আনা যেতে পারে অর্থনীতির স্বার্থে। তবে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সব সেক্টরে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে সবার আগে।