২০২০ নাগাদ দারিদ্র্যের হার ১৯ শতাংশে নেমে আসবে

বর্তমানে দেশে দারিদ্র্যের হার ২৪ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০২০ সালের মধ্যে তা ১৮ দশমিক ৬ শতাংশে নামিয়ে আনতে চায় সরকার। এ সময়ের মধ্যে অতিদারিদ্র্যের হার নামিয়ে আনা হবে ৮ দশমিক ৯ শতাংশে; বর্তমানে যা ১২ দশমিক ৯ শতাংশ।

সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার এ লক্ষ্যের কথা গতকাল গোলটেবিল বৈঠকে তুলে ধরে পরিকল্পনা কমিশন। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ‘চরম ও মধ্যম মাত্রার দারিদ্র্য, সামাজিক সুরক্ষা এবং পশ্চাৎপদ অঞ্চলসমূহ: সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার লক্ষ্য ও কৌশলসমূহ’ শীর্ষক ওই গোলটেবিল বৈঠক যৌথভাবে আয়োজন করে বণিক বার্তা ও এক্সট্রিম পভার্টি রিসার্চ গ্রুপ (ইপিআরজি)। সহযোগিতায় ছিল ইউকেএইড, সিঁড়ি ও ডিএফআইডি।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। বিশেষ অতিথি ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। আলোচনায় অংশ নেন ইপিআরজির সদস্য সচিব ও সিঁড়ির হেড অব রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি ড. এসএম জুলফিকার আলী, ব্র্যাকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক ড. মাহবুব হোসেন, বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন, সাবেক খাদ্য সচিব আব্দুল লতিফ মণ্ডলসহ অনেকে। বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (জ্যেষ্ঠ সচিব) ড. শামসুল আলম।

মূল প্রবন্ধে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন ড. শামসুল আলম। পরিকল্পনার মূল প্রতিপাদ্য প্রস্তাব করা হয়েছে ‘প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিতকরণ, প্রত্যেক নাগরিকের ক্ষমতায়ন’। ড. শামসুল আলম বলেন, সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার লক্ষ্য অর্জনের একটি কৌশল হলো অধিক হারে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগে গতিশীলতা আনয়ন। এছাড়া কর্মসংস্থাননির্ভর প্রবৃদ্ধির ওপর জোর দেয়া হয়েছে, যা একই সঙ্গে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দারিদ্র্য হ্রাসে সহায়ক।

জনসংখ্যা বোনাসকে (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড) সর্বোচ্চ ব্যবহারের পাশাপাশি নতুন ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসারের মাধ্যমে মূলধন ও শ্রমের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে পরিকল্পনায়। বিশেষ জোর দেয়া হয়েছে সামষ্টিক অর্থনীতির ধারাবাহিক স্থিতিশীলতার ভিত্তিতে সেবা ও রফতানিমুখী উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধিতে গতি আনার ওপর।

দারিদ্র্যকে অভিশাপ উল্লেখ করে তা থেকে মানুষকে বের করে আনার ওপর জোর দেন পরিকল্পনামন্ত্রী। মন্ত্রী বলেন, শ্রমশক্তির সুবিধা পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগাতে হবে। দেশের স্বল্প সম্পদকে সঠিকভাবে বিনিয়োগ করতে হবে, যাতে অর্থনীতি গতিশীল হয় ও দারিদ্র্য কমে আসে।

দারিদ্র্য আরো কমা উচিত ছিল মন্তব্য করে তিনি বলেন, রেমিট্যান্সের মাধ্যমে আমাদের বৈদেশিক আয় বাড়াতে হবে। আমরা হয়তো দুর্নীতি শতভাগ দূর করতে পারব না, তবে কমাতে পারব। এজন্য ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিতে হবে। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে মূল ধারায় আনার কাজ চলছে। অর্থবহ গণতন্ত্র আনতেও সচেষ্ট রয়েছে সরকার।

সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বিশেষ অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে দারিদ্র্য দূরীকরণে সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলকে। এজন্য জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলপত্রও (এনএসএসএস) গ্রহণ করেছে সরকার। এ কৌশলপত্র বাস্তবায়নের মাধ্যমে চরম দারিদ্র্য দূরীকরণসহ আয়বৈষম্য কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে ধারণা দেয়া হয়েছে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়।

অগ্রাধিকার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে নীতিনির্ধারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, অগ্রাধিকার কর্মসূচিগুলো বাছাই করার ক্ষেত্রে দক্ষতা দেখাতে না পারায় আমরা পিছিয়ে পড়েছি। অগ্রাধিকার বিষয়গুলোর মধ্যে দারিদ্র্য বিমোচন অন্যতম। অতিদারিদ্র্যের প্রতি চরম অবিচার ও বৈষম্য রয়েছে। আমরা তা দূর করতে বদ্ধপরিকর। দারিদ্র্য দূরীকরণে বেসরকারি খাতকে সঠিক উপায়ে পূর্ণ মাত্রায় বিকশিত করতে হবে।

দেশে অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর ভিন্ন ভিন্ন গোত্র রয়েছে উল্লেখ করে ড. এসএম জুলফিকার আলী বলেন, ফুটপাতে ঘুমানো জনগোষ্ঠী, রেললাইনের ধারে ও পাহাড়ের ঢালে বসবাসরত মানুষ, চরাঞ্চল ও উপকূলীয় জনগোষ্ঠী— সবাই অতিদরিদ্র হলেও তাদের দরিদ্রতায় ভিন্নতা আছে। ভিন্ন ভিন্ন দরিদ্র গোষ্ঠীর জন্য তাই আলাদা কৌশল নিতে হবে।

উৎপাদন ও সেবা খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়। ২০২০ সালের মধ্যে ১ কোটি ৮৭ লাখ কর্মসংস্থান প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। যদিও এ সময়ে নতুনভাবে শ্রমশক্তিতে যুক্ত হবে ১ কোটি ২৫ লাখ মানুষ। এছাড়া ২০২০ সালে জিডিপির প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৮ শতাংশ।

লক্ষ্য অর্জনে তথ্য ব্যবস্থাপনায় আরো জোর দেয়ার পরামর্শ দেন ড. জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, অতিদারিদ্র্য কমাতে কম উৎপাদনশীল খাত থেকে বেশি উৎপাদনশীল খাতে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে স্থানান্তর করতে হবে। এছাড়া প্রবৃদ্ধির সুবিধাকে কৃষি ও গ্রামীণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।

সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় সবুজ প্রবৃদ্ধি অর্জনের কৌশলের কথা বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে একটি টেকসই, সমৃদ্ধ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জলবায়ুসহিষ্ণু ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গড়ার পথ সুগম হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, দারিদ্র্য কমানোর শেষ দিকে নতুন নতুন ধারণা ও বাধা আসে। দুর্বল ভূমি অধিকার, নগর দারিদ্র্য, জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগের ঝুঁকি আছে। এসব ঝুঁকি কীভাবে মোকাবেলা করা যায়, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও কার্যকর পদক্ষেপ থাকা জরুরি।

তিন বছর ধরেই শস্য উপখাতে প্রবৃদ্ধি ১-২ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করছে। ২০২০ সালে সার্বিক কৃষি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। এটি যাতে আরো বাড়ানো হয়, সে পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শ দেন বক্তারা।

কৃষি খাত নিয়ে আলোচনা করেন সাবেক খাদ্য সচিব আব্দুল লতিফ মণ্ডল। তিনি বলেন, খাদ্যশস্যের উৎপাদন নিয়ে ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। উৎপাদনের তথ্য নিয়ে রাজনীতি করা ঠিক নয়। সরকার একদিকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার কথা বলছে, অন্যদিকে গত অর্থবছর ৫৩ লাখ টন খাদ্যশস্য আমদানি হয়েছে। কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি এখনো হতাশাজনক। তার পরও এ খাতে প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হচ্ছে না। দারিদ্র্য বিমোচনে অবশ্যই কৃষি খাতকে গুরুত্ব দিতে হবে।

কর্মসংস্থান ও প্রকৃত পারিশ্রমিকই মধ্যম ও চরম দারিদ্র্য হ্রাসের সবচেয়ে উত্তম ও টেকসই উপায়। এ বিবেচনা থেকে উৎপাদন ও সেবা খাতে কর্মসংস্থান তৈরির ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়।

ড. মাহবুব হোসেন বলেন, দারিদ্র্য বিমোচনে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি কার্যকরভাবে বেশকিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রবৃদ্ধি উৎপাদনশীল খাতে হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দারিদ্র্য কমবে। ক্ষুদ্র ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে টেকসই কৃষির উন্নয়নে বেশি জোর দিতে হবে। কৃষি খাতকে শুধু খাদ্যনিরাপত্তার উপায় হিসেবে না দেখে বরং উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে দেখা উচিত। শস্যনির্ভর কৃষি থেকে বের হয়ে ঋণ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে মত্স্য ও পশুপালন খাতকে বিকশিত করতে হবে। কৃষি খাত থেকে আবার শিল্প ও সেবা খাতে রূপান্তর ঘটাতে হবে। সর্বোপরি কৃষকদের ফসলের নায্যমূল্য দিতে হবে। পরিবর্তন আনতে হবে সার্বিক শিক্ষা ব্যবস্থায়ও।

দারিদ্র্য নির্মূলে একই ধরনের পদ্ধতি ও নিয়ম সব অঞ্চলে সমভাবে কার্যকর নয় বলে জানান কনসার্ন ওয়ার্ল্ডওয়াইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর একেএম মূসা। এজন্য দারিদ্র্য বিমোচনে পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনার ওপর জোর দেন তিনি।

নতুন ঝুঁকির বিষয় উপস্থাপন করেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. শাহ কামাল। তিনি বলেন, আমরা প্রতিনিয়ত দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য বিনিয়োগ করছি। কিন্তু ঝুঁকি কমানোর কোনো পরিকল্পনা নিচ্ছি না। ঝুঁকি কমানোর পরিকল্পনার পাশাপাশি কার্যক্রমে সমন্বয় আনতে হবে।

ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্য দূরীকরণে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে বিশেষ জোর দেয়ার কথা বলা হয়েছে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়। আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইএফপিআরআই) চিফ অব পার্টি ড. আখতার আহমেদ বলেন, পুষ্টিনিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করা ছাড়া মানবসম্পদ উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই স্বাস্থ্যনীতির সঙ্গে সমন্বয় না করে আলাদা পুষ্টিনীতি প্রণয়ন করতে হবে।