রি-পাওয়ারিং নতুন রূপ পাচ্ছে সরকারি পুরনো বিদ্যুৎকেন্দ্র

২৫ বছরের বেশি পুরনো হয়ে গেছে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অধিকাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্র। কমে যাচ্ছে উৎপাদন সক্ষমতা, গ্যাস ব্যবহারে দক্ষতাও কমছে। এ অবস্থায় পুরনো বিদ্যুৎকেন্দ্র রি-পাওয়ারিং তথা পুনঃক্ষমতায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার, যা নতুন রূপ দেবে পুরনো বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে। এর মাধ্যমে দেরিতে হলেও শুরু হচ্ছে সরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর কার্যক্রম।

প্রাথমিকভাবে ঘোড়াশাল বিদ্যুৎকেন্দ্র রি-পাওয়ারিং করা হচ্ছে। যদিও আশির দশকে নির্মিত এ বিদ্যুৎকেন্দ্র এখন অবসরে যাওয়ার কথা। এরই মধ্যে ঘোড়াশাল তৃতীয় ইউনিট রি-পাওয়ারিং প্রকল্প অনুমোদন করেছে সরকার। এবার চতুর্থ ইউনিটটিও রি-পাওয়ারিংয়ের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

রি-পাওয়ারিংয়ের ক্ষেত্রে সাধারণত বিদ্যমান বিদ্যুৎকেন্দ্রে বড় ধরনের সংস্কার করা হয়। পুরনো যন্ত্রপাতি পরিবর্তন ছাড়াও প্রযুক্তির আধুনিকায়ন করা হয়। ফলে একই পরিমাণ গ্যাস দিয়ে প্রায় দ্বিগুণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। যদিও এ ধরনের প্রকল্পে কিছু পরিবেশগত ঝুঁকি থাকে।

ঘোড়াশালের চতুর্থ ইউনিট রি-পাওয়ারিংয়ের ক্ষেত্রে পুরনো বাষ্পীয় প্রযুক্তির পরিবর্তে কম্বাইন্ড সাইকেল প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। পাশাপাশি বয়লার, টারবাইন, কুলিং সিস্টেমসহ পুরনো বিভিন্ন যন্ত্রপাতি প্রতিস্থাপন করা হবে। তবে এর সুফল পেতে বিদ্যুৎ খাতে সরকারের গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ৪১ শতাংশই বেসরকারি খাতের। ৫ শতাংশের মতো আসে ভারত থেকে। বাকি ৪৪ শতাংশ সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে আসে। এ অবস্থায় রেন্টাল-কুইক রেন্টাল থেকে বেরিয়ে আসতে বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে এগুলো বেশ সময় ও ব্যয়সাপেক্ষ। এজন্য বিদ্যমান বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে রি-পাওয়ারিং প্রকল্প নেয়া হচ্ছে।

জানা গেছে, ঘোড়াশাল বিদ্যুৎকেন্দ্রটির উৎপাদনক্ষমতা ৯৫০ মেগাওয়াট। সেখানে ছয়টি ইউনিট রয়েছে, যার মধ্যে দুটি ৫৫ মেগাওয়াটের ও চারটি ২১০ মেগাওয়াটের। এগুলোয় গ্যাসভিত্তিক প্রচলিত বাষ্পীয় টারবাইন প্রযুক্তি রয়েছে। বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির গ্যাস ব্যবহারে গড় দক্ষতা ৩১ শতাংশ, যেখানে আধুনিক কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্রের গড় দক্ষতা ৫৫ শতাংশ। এজন্য কম্বাইন্ড সাইকেলে রূপান্তর করা হবে কেন্দ্রের চতুর্থ ইউনিট।

ঘোড়াশালের এ ইউনিট ২১০ মেগাওয়াটের হলেও পুরনো হওয়ায় উৎপাদনক্ষমতা ১৮০ মেগাওয়াটে নেমে এসেছে। এ অবস্থায় বিদ্যমান গ্যাস টারবাইনটি সংস্কারের পাশাপাশি নতুন আরেকটি স্থাপন ও বিদ্যমান বয়লার বদলে হিট রিকভারি স্টিম জেনারেটর প্রতিস্থাপন করা হবে। পাশাপাশি বাষ্পীয় টারবাইনের পরিবর্তে কম্বাইন্ড সাইকেল প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। এতে উৎপাদন বেড়ে দাঁড়াবে ৪০৩ দশমিক ৫ ইউনিটে। একই পরিমাণ জ্বালানিতে অতিরিক্ত ১৬৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে।

এদিকে গত মার্চে অনুমোদন করা হয় ঘোড়াশাল তৃতীয় ইউনিট রি-পাওয়ারিং প্রকল্প। আশির দশকে ঘোড়াশালে ২১০ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতাসম্পন্ন ইউনিটটি স্থাপন করা হয়, বর্তমানে এটি থেকে ১৫৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যায়। রি-পাওয়ারিংয়ের আওতায় পুরনো ইউনিট সংস্কার করা হবে। এর সঙ্গে নতুন দুটি গ্যাস টারবাইন যুক্ত হবে। আর তা থেকে আসবে ২৬০ মেগাওয়াট অতিরিক্ত বিদ্যুৎ। রি-পাওয়ারিং শেষে এ কেন্দ্র থেকে পাওয়া যাবে মোট ৪১৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ।

এ প্রসঙ্গে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ম. তামিম বণিক বার্তাকে বলেন, রি-পাওয়ারিং বিদ্যুৎ খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। দেশের সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদনক্ষমতা বাড়াতে এটি আরো আগেই নেয়া দরকার ছিল। এতে জ্বালানি ব্যবহার না বাড়িয়েও বিদ্যুৎ উৎপাদন অনেক বাড়ানো সম্ভব। রেন্টাল-কুইক রেন্টাল থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসতে ও বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে রি-পাওয়ারিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তিনি বলেন, আশুগঞ্জ কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎ প্রকল্পটিও মূলত রি-পাওয়ারিং। তবে রি-পাওয়ারিংয়ের সুফল পেতে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোয় ন্যূনতম ১৫ বছর গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

জানা গেছে, আশুগঞ্জ ৪৫০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল পাওয়ার প্লান্ট প্রকল্পটি নেয়া হয় ২০১১ সালে। এরই মধ্যে একটি প্লান্ট চালু হয়েছে। এতে ২২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। দ্বিতীয় প্লান্টটি চালু হলে বাকি ২২৫ মেগাওয়াট জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। এতে ব্যয় হচ্ছে ৩ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।

ঘোড়াশাল তৃতীয় ইউনিট রি-পাওয়ারিং প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৫০৮ কোটি টাকা। আর চতুর্থ ইউনিট রি-পাওয়ারিং প্রকল্পের ব্যয় এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এক্ষেত্রেও প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে এ ব্যয় অতিরিক্ত বলে মনে করছেন বিদ্যুৎ খাতের নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বিডি রহমতউল্লাহ। তিনি বলেন, আড়াই হাজার কোটি টাকায় ৪০০ মেগাওয়াটের নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা সম্ভব। এর মধ্যে জমি অধিগ্রহণ ও ভূমি উন্নয়ন, সঞ্চালন লাইন নির্মাণও থাকে। আর রি-পাওয়ারিং হলো সংস্কার। এক্ষেত্রে জমি বা সঞ্চালন লাইন-সংক্রান্ত কোনো ব্যয়ই নেই। শুধু যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি আধুনিকায়ন করা হবে। এ হিসাবে ঘোড়াশাল রি-পাওয়ারিং প্রকল্পে অন্তত ৭০০-৮০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে।

রি-পাওয়ারিং প্রকল্পের বেশকিছু পরিবেশগত ঝুঁকিও রয়েছে। কারণ পুরনো বয়লার প্রতিস্থাপন মানবস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য বেশ ক্ষতিকর। অন্যান্য যন্ত্রপাতিও বেশ পুরনো হওয়ায় পরিবেশের জন্য ঝুঁকি বহন করে। প্রতিস্থাপনের সময় এগুলো থেকে বাতাসে ছড়িয়ে পড়া দূষিত পদার্থ পরিবেশ ও ফসলের জমির জন্য বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে।

ঘোড়াশাল চতুর্থ ইউনিট রি-পাওয়ারিং প্রকল্পের পরিবেশগত ঝুঁকি মোকাবেলায় প্রায় ২০৯ কোটি টাকা দরকার হবে। সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেম সার্ভিস (সিইজিআইএস) পরিচালিত এক সমীক্ষায় এ তথ্য উঠে এসেছে।

এ প্রসঙ্গে বিপিডিবির চেয়ারম্যান খন্দকার মাকসুদুল হাসান বলেন, রি-পাওয়ারিংয়ের ক্ষেত্রে পরিবেশগত কিছু ঝুঁকি রয়েছে। এজন্য পরিবেশগত সমীক্ষা করা হয়েছে। এর ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে, যাতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ফলে পরিবেশের ক্ষতি ন্যূনতম পর্যায়ে রাখা যায়। আর প্রকল্প ব্যয় এখনো চূড়ান্ত না হওয়ায় এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা সম্ভব নয়।

Views: 22