আবহাওয়াভিত্তিক শস্য বীমার আওতায় আসছে কৃষক

দেশে এই প্রথম জলবায়ু পরিবর্তনে খরা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় দুর্যোগের ক্ষতি থেকে দেশের কৃষককে বাঁচাতে আবহাওয়া সূচকভিত্তিক শস্য বীমার প্রাইলট প্রকল্প চালু করেছে সরকার। ২১ কোটি ৩৪ লাখ ২১ হাজার টাকা ব্যয়ে এ প্রকল্পের প্রধান লক্ষ্য সব কৃষককে বীমা সুবিধার আওতায় নিয়ে আসা। এ জন্য রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ এবং নোয়াখালী জেলাকে চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথম ধাপে এ প্রকল্পের মাধ্যমে তিন জেলার মোট ৬ হাজার কৃষককে জলবায়ু পরিবর্তনে খরা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় দুর্যোগের বিষয়ে সচেতন করা এবং ১২ হাজার কৃষককে শস্য বীমা সুবিধার আওতায় আনা হবে বলে সাধারণ বীমা কর্পোরেশন সূত্রে জানা গেছে।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ২০৫০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রকৃতিক দুর্যোগের কারণে ৩ দশমিক ১ শতাংশ হারে ফসল উৎপাদন কমবে। ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হবে দরিদ্র কৃষকশ্রেণী। আর এ কারণেই ক্ষুদ্র কৃষকদের বাঁচাতে কৃষি বীমা জরুরি। এমন প্রেক্ষাপটে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) বাংলাদেশে শস্য বীমার উদ্যোগ নিয়েছে। বাস্তবায়নের জন্য তিন জেলায় ২০টি আবহাওয়া স্টেশন স্থাপনের পাশাপাশি কৃষকদের সচেতন করাসহ সরকারি ও বেসরকারি প্রায় ৪শ’ কর্মকর্তাকে শস্য বীমা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। ফলে কৃষকরা নতুন করে কৃষি কাজ করতে উৎসাহিত হবে বলে বীমা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। তিন বছর মেয়াদি এ প্রকল্পটির টিপিপি অনুমোদন করা হয়েছে ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ সালে এবং গ্রান্ট এগ্রিমেন্ট স্বাক্ষর হয়েছে একই বছরের ২৫ মার্চ। প্রকল্পের অর্থায়ন করেছে এডিবি ও বাংলাদেশ সরকার। এ বিষয়ে উদ্যোগ নিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। বাস্তবায়ন করছে সাধারণ বীমা কর্পোরেশন ও বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতর।
এ বিষয়ে সাধারণ বীমার এক কর্মকর্তা মানবকণ্ঠকে জানান, বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। প্রতি বছর খরা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় দুর্যোগের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই কৃষকের ক্ষতি কমিয়ে আনতে সবাইকে আবহাওয়া সূচকভিত্তিক শস্য বীমার আওতায় আনা হচ্ছে। প্রথম ধাপে ১২ হাজার কৃষককে এ বীমা সুবিধা দেয়া হবে। পর্যায়ক্রমে সবাইকে এ সুবিধার আওতায় আনা হবে।
জানা গেছে, জুলাই ২০১৩ সাল থেকে জুন ২০১৬ সাল পর্যন্ত তিন বছর মেয়াদি এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে স্টিয়ারিং কমিটি এবং প্রজেস্ট ইমপ্লিমেন্টেশন কমিটি (পিআইসি) গঠন করা হয়। কমিটিগুলো কাজ করে চলছে। প্রকল্পের জন্য বরাদ্দকৃত এসবিসি টাওয়ারে প্রায় ১ হাজার বর্গফুট বিশিষ্ট অফিস রয়েছে। এ ছাড়াও ডব্লিওআইবিসিআই প্রকল্পে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের জন্য সাধারণ বীমা থেকে একজন প্রকল্প পরিচালক এবং একজন প্রকল্প ব্যবস্থাপক পদায়ন করা হয়েছে। এ ছাড়াও বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতর থেকে এক কর্মকর্তাকে প্রকল্পে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকে ইম্প্রেস্ট অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনের জন্য সাধারণ বীমা কর্পোরেশন ও বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতরের নামে জনতা ব্যাংকের দিলকুশায় আলাদা সাব অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৩৭ লাখ টাকা ছাড় করা হয়েছে। এডিবির পরামর্শক নিয়োগ পদ্ধতিতে প্রকল্পে পরামর্শক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এ ছাড়াও এডিবি কর্তৃক ফাস্ট র‌্যাঙ্ককৃত বৈদেশিক ফার্ম কনসালট্যান্টদের সঙ্গে ২১ মে চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতর ও বৈদেশিক ফার্ম কনসালট্যান্টদের মতামতের ভিক্তিতে চূড়ান্তভাবে খরা ঝুঁকির জন্য রাজশাহী জেলা, বন্যা ঝুঁকির জন্য সিরাজগঞ্জ জেলা এবং ঘূর্ণিঝড় ঝুঁকির জন্য নোয়াখালী জেলাকে নির্বাচন করা হয়েছে। অপরদিকে ২০টি আবহাওয়া কেন্দ্র স্থাপনের লক্ষ্যে দরপত্র আহ্বানের বিষয়টি এডিবির সদর দফতর চূড়ান্তভাবে অনুমোদন প্রদান করেছে। এ বিষয়ে খুব শিগগিরই জাতীয় পত্রিকায় টেন্ডার আহ্বান করা হবে বলে জানা গেছে।
উল্লেখ্য, বর্তমানে বাংলাদেশের পাশের দেশ ভারত, শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড ইন্দোনেশিয়া, মঙ্গোলিয়া ও জার্মানিতে সফলভাবে ওয়েদার ইনডেক্স-বেইজড ক্রপ ইন্স্যুরেন্স তথা আবহাওয়া সূচকভিত্তিক শস্য বীমা চালু রয়েছে। দেশগুলোতে সব কৃষকদের বীমার আওতায় আনা হয়েছে। দেশগুলোতে কৃষি খাতে সবচেয়ে বেশি ভর্তুকি দেয়া হয়।