দিনরাত চলছে পদ্মা সেতুর কাজ

অক্টোবরের শেষের দিকে মূল কাজ উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী

বহুপ্রত্যাশিত পদ্মা বহুমুখী সেতুর কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। দেশবাসীর স্বপ্নের এ সেতু নির্মাণ বর্তমান সরকারের এক নম্বর চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেখা যায়, বৈরী আবহাওয়া আর প্রমত্ত পদ্মার ভয়াল ভাঙনকে উপেক্ষা করে শিডিউল মাফিক পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নের দিকে দ্রুত ছুটে চলছে। সব ঠিকঠাক থাকলে সেতুর মুন্সীগঞ্জের মাওয়া প্রান্তে পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী অক্টোবরের শেষের দিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মূল পাইলিং কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন। পদ্মা সেতু প্রকল্প ব্যবস্থাপক ও নির্বাহী প্রকৌশলী দেওয়ান মো. আবদুল কাদের বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। দিনরাত ২৪ ঘণ্টা ৩ শিফটে কাজ চলছে। এরই মধ্যে মূল সেতুর ১১.০২ ভাগ কাজ শেষ। শিডিউল অনুযায়ী কাজ চলতে থাকায় বেঁধে দেওয়া সময়ের আগেই প্রায় প্রতিটি কাজ শেষ হচ্ছে। ১০টি পরীক্ষামূলক পাইলিংয়ের মধ্যে তিনটির এবং ১২টি ভায়া ডাক্টের মধ্যে চারটির কাজ শেষ হয়েছে। এসব পরিক্ষামূলক পাইলের ওপর তিন হাজার টন ওজন চাপিয়ে পরীক্ষা করা হচ্ছে। পদ্মার বালু অত্যধিক সরু হওয়ায় এ পরীক্ষায় কিছুটা টেকনিক্যাল সমস্যা হচ্ছে বটে, তবে কাজের কোনো ব্যাঘাত ঘটছে না। তিনি আরও জানান, নভেম্বরে মূল পাইলিং কাজ শুরুর কথা থাকলেও তার আগেই অক্টোবরের শেষের দিকে তা শুরু করার সম্ভাবনা রয়েছে। এরই মধ্যে পদ্মা সেতু সার্ভিস এরিয়ায় মাওয়া প্রান্তে ভিভিআইপি কটেজ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ১০ নম্বর কটেজটি প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে প্রস্তুত করা হচ্ছে বলে ওই প্রকৌশলী জানান। এ ছাড়া নাব্যতা সংকট কাটাতে সার্বক্ষণিক কাজ চালিয়ে যাচ্ছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজের নিজস্ব ড্রেজার। এতে করে সেতু প্রকল্পের কাজের কোনো ব্যাঘাত ঘটছে না। অনায়াসেই এর ক্রেনসহ ভারী যন্ত্রপাতিগুলো পারাপার করা সম্ভব হচ্ছে। প্রকল্পের কনস্ট্রাকশন এলাকায় সামান্য আকারে নদীর ভাঙন দেখা দিলেও তাতে সেতুর তেমন বিঘি্নত হয়নি ভাঙন ঠেকাতে ইতিমধ্যে ১ লাখ ৫৬ হাজার জিওব্যাগ ভর্তি বালু নদীতে ফেলা হয়েছে এবং আরও সাড়ে তিন লাখ বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলা হবে। বর্তমানে প্রকল্প এলাকায় কোনো ভাঙন নেই। তবে আগামী আরও দুই মাস পদ্মার ভাঙনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হবে। এ কারণে আরও এক লাখ বালুভর্তি জিও ব্যাগ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। আপৎকালে এই বালুভর্তি জিও ব্যাগ দিয়ে ভাঙন মোকাবিলা করা হবে। এ দিকে পদ্মা পাড়ে মানুষের ঢল নামতে শুরু করেছে। এখানে শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে এক খণ্ড জমি কিনতে বুক ভরা আশা নিয়ে ছুটছেন অনেকেই। স্বপ্নের এ সেতুকে ঘিরে উন্মোচিত হতে শুরু করেছে নানা সম্ভাবনার দুয়ার। এরই মধ্যে জানা গেছে সেতুর দুই প্রান্তে হংকংয়ের মতো আধুনিক নগরী গড়ে তুলতে সরকার মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এখানে বেশ কয়েকটি স্টেডিয়ামের সমন্বয়ে গড়ে তোলা হবে অলিম্পিক ভিলেজ। থাকবে ক্রিকেট স্টেডিয়াম, বিশ্বমানের আধুনিক স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ, মসজিদ, মাদ্রাসা। গড়ে তোলা হবে আধুনিক শিল্পনগরী ও বিশ্বমানের পর্যটন ও বিনোদন কেন্দ্র। এসব কেন্দ্রে থাকবে দৃষ্টিনন্দন লেক, পুকুর। আর এসব ঘিরে সৃষ্টি হবে বিপুল কর্মসংস্থানের। এ ছাড়াও সরকারের আন্তর্জাতিক মানের কনভেনশন সেন্টার তৈরির মাধ্যমে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলাও এ পদ্মা পাড়ের নগরীতে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। বসবাসের জন্য গড়ে তোলা হবে আধুনিক আবাসিক শহর। আবার শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য গড়ে তোলা হবে বেশকিছু আধুনিক বাণিজ্যিক অঞ্চল। ফলে শিল্প ও নগরায়ণ শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক থাকবে না। ভিন্ন ভিন্ন শহরে সব ধরনের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থাকবে। পদ্মা পাড়ের সেই শহর ও সেতু প্রান্তে দ্রুত যাতায়াতের জন্য সরকার রাজধানী ঢাকার শান্তিনগর ও গুলিস্তানের জিরো পয়েন্ট থেকে বাবুবাজার ব্রিজ হয়ে দক্ষিণ ঢাকার ঝিলমিল আবাসিক এলাকা হয়ে ঢাকা-মাওয়া মহাসড়ক পর্যন্ত উড়াল সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এটা বাস্তবায়িত হলে ঢাকাবাসী পদ্মাপাড়ের এ শহরে যাতায়াত করতে এবং দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষকে ঢাকায় যাতায়াত করতে কোনো বিড়াম্বনায় পড়তে হবে না। দেশের সবকটি জেলার সঙ্গে সারা দেশের সড়ক যোগাযোগের দিগন্ত উন্মোচিত হবে। দক্ষিণাঞ্চলেও হবে শিল্প কারখানা, যেখানে আজও এক শতক জমি মাত্র পাচশ-এক হাজার টাকায় কেনা-বেচা হয়। সেতু চালু হলে তা হবে লাখ টাকারও বেশি দামি। মানুষ আর কাজের জন্য শুধুই ঢাকার দিকে ছুটবে না। নিজ নিজ এলাকায় নিজ বাড়িতে থেকেই কাজের সন্ধান পাবে। আশা করা হচ্ছে ২০১৮ সালের যে কোনো দিন পদ্মা সেতুর দ্বার খুলে দেওয়া হবে আর সেই দিনটি ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।