বিশ্বমানের হচ্ছে কক্সবাজার বিমানবন্দর

কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উন্নীত করার প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছে। এই বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে সমৃদ্ধ করার জন্য সক্রিয় হয়ে উঠেছে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ। চলতি বছরের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থছাড়সহ যাবতীয় দাফতরিক কাজ শেষ হয়েছে। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ে চলছে প্রস্তুতিমূলক কাজ। গত সোমবার (৩ আগস্ট) আনুষঙ্গিক সরঞ্জামাদি নিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্তরা বিমানবন্দরে পৌঁছেছেন।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (ক্যাব) সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দরে উন্নীত করতে মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। দুটি ধাপে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। এর মধ্যে প্রায় ৫৪৯ কোটি ৬৪ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রথম ধাপের কাজ করা হবে। সরকারি অনুদান এবং ক্যাবের যৌথ অর্থায়নে প্রথম পর্বের কাজ সম্পন্ন করা হবে। টেন্ডার প্রক্রিয়ায় দায়িত্ব পেয়ে কোরীয় কোম্পানি ‘হাল্লাহ করপোরেশন’ এবং বাংলাদেশি কোম্পানি ‘মীর আকতারু এই প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ করছে। এ বিষয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সবেমাত্র গত মাসে প্রকল্পের উদ্বোধন করা হয়েছে। প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও লোকজন সেখানে গেছে। প্রাথমিক কাজও কিছুটা শুরু হয়েছে। তবে বর্ষাকাল এবং ওই অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে আরও দ্রুতগতিতে কাজ করা সম্ভব হতো। দ্বিতীয় পর্বের কাজ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রাথমিক আলোচনা চলছে। প্রথম পর্বের কাজ শেষ হওয়ার অপেক্ষা না করেই দ্বিতীয় পর্বের কাজ দ্রুত শুরু করা হবে বলেও জানান তিনি। মন্ত্রী বলেন, প্রকল্পের কাজ শেষ হলে শুধু কক্সবাজার নয় দেশের অভ্যন্তরীণ ও দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক অর্থনীতিতে এটি অবদান রাখবে। আমাদের সমুদ্রসম্পদ রক্ষায়ও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। কাজের অগ্রগতি নিয়ে গতকাল আমাদের কক্সবাজার প্রতিনিধি জানান, মূল কাজ তেমন কিছুই শুরু হয়নি। তবে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান আনুষঙ্গিক সরঞ্জামাদি নিয়ে কক্সবাজার পৌঁছেছে বলে জানিয়েছেন বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপক সাধন কুমার মহন্ত। এদিকে ক্যাবের চিফ ইঞ্জিনিয়ার সুধেন্দু বিকাশ গোস্বামী জানিয়েছেন, প্রাথমিক প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরু হয়েছে। ক্যাব সূত্র আরও বলছে, ইতিমধ্যে বিমানবন্দরের সীমানা প্রাচীরের ভাঙা অংশে নতুন দেয়াল নির্মাণ করা হয়েছে। মেরামত করা হয়েছে ভাঙাচোরা পুরনো দেয়াল। আনুষঙ্গিক কাজগুলো সম্পন্ন করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় বিমানবন্দরের রানওয়ে বর্ধিতকরণ এবং প্রশ্বস্তকরণের কাজ করা হবে। এর পাশাপাশি পিসিএন (পেভমেন্ট কাউন্টিং নাম্বার) বা রানওয়ের শক্তি বাড়ানো হবে। স্থাপন করা হবে নতুন ভিওআর, ডিএমই ও আইএসএল, এয়ার ফিল্ড গ্রাইন্ড ও লাইটিং সিস্টেমসহ যোগাযোগ স্থাপনের যাবতীয় যন্ত্রপাতি। ক্রয় করা হবে ফায়ার ফাইটিং ভেহিক্যাল (আগুন নির্বাপক গাড়ি)। আড়াই বছর মেয়াদি প্রকল্পের আওতায় প্রথম পর্বের কাজ সম্পন্ন হবে। আর প্রথম পর্বের কাজ শেষ হলেই আন্তর্জাতিক মানের বিমানগুলো কক্সবাজার বিমানবন্দরে ওঠা-নামা করতে পারবে। তবে বিমানবন্দরকে পুরোপুরি আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে দ্বিতীয় ধাপে আন্তর্জাতিক মানের টার্মিনালসহ গুরুত্বপূর্ণ কিছু অবকাঠামো নির্মাণের কাজ করা হবে। জানা গেছে, দ্বিতীয় ধাপের কাজ নিয়েও প্রাথমিক পর্যায়ের আলোচনা চলছে।

ক্যাবের অর্থ বিভাগ জানিয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রথম পর্বে চলতি বছরের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ৩০ কোটি এবং ক্যাবের তহবিল থেকে ৩০ কোটি করে মোট ৬০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। এর পরের বছর আরও ২০০ কোটি করে মোট ৪০০ কোটি টাকা দেওয়া হবে। এদিকে বিমানবন্দর সম্প্রসারণের কারণে যেসব পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তাদের জন্য কক্সবাজার সদর উপজেলার কুরুশকুলে বিশাল এলাকার ওপর চারতলা ভবন তৈরি করা হচ্ছে। প্রায় সাড়ে চার হাজার পরিবারকে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা দিয়ে সেখানে পুনর্বাসনের প্রক্রিয়া চলছে। ক্যাবের ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুসারে, কাজ শেষ হলে কক্সবাজার বিমানবন্দরের রানওয়ের দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ৯ হাজার ফুট। বর্তমানে ওই রানওয়ের দৈর্ঘ্য আছে ৬ হাজার ৭৭৫ ফুট। আর রানওয়ের প্রস্থ ১৫০ ফুট থেকে বাড়িয়ে ২০০ ফুট করা হবে। পিসিএন বাড়ানো হবে ১৯ থেকে ৮৫। এতে বর্তমানে সেখানে ‘ড্যাস-৮’ ধরনের মাঝারি আকৃতির বিমান চলাচল করলেও প্রকল্পেও কাজ শেষ হলে বি-৭৭৭-৩০০ ইআরসহ ভারী বড় আকৃতির বিমান ওঠা-নামা করতে পারবে।

পাল্টে যাবে সামগ্রিক চিত্র : সৈকতের রানী কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর হলে পাল্টে যাবে পুরো চিত্র। শুধু কক্সবাজার নয় এর প্রভাব পড়বে গোটা দেশের অর্থনীতিতেই। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই বিমানবন্দরের মাধ্যমে পশ্চিমা মহাদেশ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ স্থাপন হবে। পর্যটন শহর কক্সবাজারের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপিত হবে পুরো বিশ্বের। এতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে দেশের পর্যটন খাতে। আর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যমে লাভবান হবে সরকার। সম্পূর্ণ কাজ শেষ হলে পর্যটক ছাড়াও বিভিন্ন বাণিজ্যিক বড় বড় বিমান সহজে এ বন্দরে অবতরণ করতে পারবে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে কক্সবাজারের বাণিজ্যিক সুবিধা আরও বৃদ্ধি পাবে। গত ২ জুলাই গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার কাজ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ফলক উন্মোচন করেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন এবং গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। এর আগে ২০০৯ সালে কক্সবাজার বিমানবন্দর উন্নয়নে পদক্ষেপ নিলেও কয়েক দফা জটিলতায় তা ২০১৩ সালে এসে ভেস্তে যায়।