বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল বিআরটি হচ্ছে বাংলাদেশে!

যানজট নিরসনে বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত এক ব্যবস্থা। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে এটি গড়ে তুলতে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হয় ১০ থেকে ৩০ লাখ ডলার। কিন্তু বাংলাদেশ এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। বিমানবন্দর সড়ক থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত প্রস্তাবিত বিআরটির জন্য কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় ধরা হয়েছে ৯০ লাখ ডলার। স্থানীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ ৭০ কোটি টাকা। এ হিসাবে ২০ কিলোমিটার এ ব্যবস্থায় ব্যয় হবে ১৮ কোটি ডলার বা ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। সেক্ষেত্রে এটাই হবে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল বিআরটি। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিআরটি বাবদ ব্যয়ের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনটিতে। এতে বলা হয়েছে, বিশ্বে প্রথম বিআরটি চালু হয় ব্রাজিলের কুরিতিবা শহরে ১৯৭৪ সালে। ৫৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্যবস্থাটি চালু করতে সে সময় ব্যয় হয় ৮ কোটি ৭০ লাখ ডলার। অর্থাৎ প্রতি কিলোমিটারে ব্যয়ের পরিমাণ ১৫ লাখ ডলার। ২০১১ সালে একই শহরে নতুন আরেকটি বিআরটি চালু করা হয়। এতে ব্যয় হয় কিলোমিটারপ্রতি ২৫ লাখ ডলার।

কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোটায় বিআরটি ব্যবস্থা চালু হয় ২০০০ সালে। ৪১ কিলোমিটার দীর্ঘ এ প্রকল্পে ব্যয় হয় ২১ কোটি ৮০ লাখ ডলার বা কিলোমিটারপ্রতি ৫৩ লাখ ডলার। যুক্তরাষ্ট্রের লাস ভেগাসে ২০০৪ সালে চালু করা সর্বাধুনিক প্রযুক্তির বিআরটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১১ কিলোমিটার। এতে ব্যয় হয় প্রায় ১ কোটি ৮৭ লাখ ডলার, কিলোমিটারপ্রতি যার পরিমাণ দাঁড়ায় ১৭ লাখ ডলার। ব্রাজিলের আরেক শহর সাওপাওলোয় ২০০৫ সালে ১১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ বিআরটি নির্মাণে ব্যয় হয় ৩৪ কোটি ২০ লাখ ডলার; কিলোমিটার হিসাবে যার পরিমাণ দাঁড়ায় ৩০ লাখ ডলার।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিআরটি ব্যবস্থা চালুতে খুব বেশি কাজের প্রয়োজন হয় না। বিদ্যমান সড়কের দুই পাশে ডিভাইডার (সড়ক বিভাজক) দিয়ে বাসের জন্য পৃথক লেন করলেই চলে। আর বাসে ওঠানামার জন্য কিছু স্টপেজ তৈরি করতে হয়। এক্ষেত্রে ভূমি থেকে দু-তিন ফুট উঁচুতে ছাউনির ব্যবস্থা করতে হয়। বাস স্টপেজের সামনে থামার পর সোজা হেঁটে তাতে উঠে যায় যাত্রীরা। আর চলাচলের রুটের মধ্যে কোনো জংশন (মোড়) থাকলে সেখানে বিআরটির বাসকে প্রাধান্য দেয়া হয়। এক্ষেত্রে প্রতিটি মোড়ে স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল ব্যবস্থা স্থাপনের প্রয়োজন পড়ে। মোড়ের কাছাকাছি বাস আসার পর সিগন্যাল বাতি জ্বলে। এতে মোড়ে অন্যান্য যানবাহন বন্ধ করে বিআরটির বাসকে আগে যাওয়ার সুযোগ দেয়া হয়।

জানতে চাইলে বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. সামছুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থায় বিআরটি সবচেয়ে কম ব্যয়সম্পন্ন পদ্ধতি। খুব বেশি জটিলতা না থাকায় দ্রুতই এটি চালু করা যায়। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হয় ১০ থেকে ৩০ লাখ ডলার। তবে বাংলাদেশে এটা অনেক বেশি হচ্ছে। মূলত অপরিকল্পিত সড়ক ব্যবস্থায় বিআরটি চালু করার কারণেই ব্যয় বেশি পড়ছে।

বুয়েটের প্রতিবেদনে আরো কিছু শহরের বিআরটির তুলনামূলক ব্যয়ের চিত্রও উঠে এসেছে। প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০০৮ সালে ইকুয়েডরের কুইটো শহরে ৩৭ কিলোমিটার বিআরটি নির্মাণে ব্যয় হয় ২ কোটি ২২ লাখ ডলার; কিলোমিটারপ্রতি যার পরিমাণ দাঁড়ায় ৬ লাখ ডলার। এছাড়া ২০১০ সালে তাইওয়ানের তাইপে শহরে বিআরটি চালু হয়। ৫৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এ ব্যবস্থা নির্মাণে ব্যয় হয় ২ কোটি ৮৫ লাখ ডলার বা কিলোমিটারপ্রতি ৫ লাখ ডলার।

এদিকে নরেন্দ্র মোদি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে ২০১২ সালে আহমেদাবাদে ৭৫ কিলোমিটার দীর্ঘ বিআরটি চালু করেন। এতে ব্যয় হয় ১৪ কোটি ৪৮ লাখ ডলার। অর্থাৎ প্রতিবেশী দেশটিতেও এ ব্যবস্থা চালু করতে প্রতি কিলোমিটারে খরচ হয়েছে ১৯ লাখ ৩১ হাজার ডলার। আর ফুটবল বিশ্বকাপ উপলক্ষে ব্রাজিলের পোর্তো অ্যালেগ্রে শহরে ৩৭ দশমিক ৪ কিলোমিটার বিআরটি চালু হয় গত ১৪ মার্চ। এটি নির্মাণে ব্যয় হয় ৩ কোটি ৭৪ লাখ ডলার; কিলোমিটারপ্রতি যার পরিমাণ ১০ লাখ ডলার।

জানা গেছে, বিআরটি চালু করার জন্য গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর সড়ক পর্যন্ত চার লেনবিশিষ্ট ২০ কিলোমিটার বাসের পৃথক লেন, ৩১টি স্টপেজ ও গাজীপুরে একটি বাস টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি কিছু সড়ক প্রশস্ত, সার্ভিস সড়ক ও গাজীপুরে তিন কিলোমিটার ড্রেনেজ ব্যবস্থা নির্মাণ করা হবে। শুধু এজন্যই ব্যয় হবে ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। পাশাপাশি প্রকল্পটির আওতায় আট লেনবিশিষ্ট টঙ্গী সেতু ও সতিটি মোড়ে ফ্লাইওভার নির্মাণেরও কথা রয়েছে। এতে ব্যয় হবে আরো ৬৪০ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে প্রকল্পে ব্যয় হবে মোট ২ হাজার ৪০ কোটি টাকা বা ২৬ কোটি ১৫ লাখ ডলার। সেক্ষেত্রে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় দাঁড়াবে ১ কোটি ৩১ লাখ ডলার।

গাজীপুর-বিমানবন্দর বিআরটি প্রকল্পের পরিচালক মো. আফিল উদ্দিন এ প্রসঙ্গে বলেন, প্রকল্পটির আওতায় বিআরটির পাশাপাশি কিছু সড়ক প্রশস্ত করা হবে। এছাড়া টঙ্গী সেতুটি নতুন করে নির্মাণ করা হবে। এতে ব্যয় কিছুটা বেশি হবে। তবে এগুলো বাদ দিলে বাংলাদেশেও বিআরটি নির্মাণ ব্যয় অনেক কমে যাবে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, গাজীপুর-বিমানবন্দর সড়ক বিআরটির নির্মাণকাল নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আন্তর্জাতিকভাবে বিআরটি নির্মাণে ২৪-৩০ মাস সময় লাগে। আর গাজীপুর-বিমানবন্দর সড়ক বিআরটি নির্মাণ প্রকল্পের মেয়াদকাল ধরা হয়েছে ৪৮ মাস। তবে এটি বাস্তবায়নে অন্তত ৬০ মাস লাগতে পারে। কারণ ফ্লাইওভার ও সেতু নির্মাণ দীর্ঘ প্রক্রিয়া। এছাড়া প্রকল্পটি অনুমোদনের পর প্রায় ২০ মাস অতিবাহিত হলেও এখনো নকশা প্রণয়ন সম্পন্ন হয়নি। এর পর দরপত্র আহ্বান করা হবে। নির্মাণকাজ শুরু হতে আরো কয়েক মাস লাগবে।

প্রসঙ্গত. প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে সড়ক ও জনপথ অধিদফতর (সওজ), সেতু বিভাগ ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিআরডি)। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পটি শেষ করার লক্ষ্য ধরা হয়েছে।