জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে যুক্ত হচ্ছে বাংলাদেশ

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন সমৃদ্ধশালী। এর বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশ। এর পেছনে যেটি ভূমিকা রেখেছে সেটি হচ্ছে পোশাক শিল্প যা বিশ্ব বাজারে অত্যন্ত সুপরিচিত। সম্ভবত, বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে এর উদীয়মান তথ্য প্রযুক্তি খাত যা দেশকে নিবিড় শ্রম সহায়ক অর্থনীতি থেকে জ্ঞান ভিত্তিক অর্থনীতিতে যুক্ত করছে।

গত জুন মাসে বাংলাদেশ সরকার দেশে একটি বৃহত্তর প্রযুক্তি পার্ক এবং একটি কমপ্লেক্স গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছেন। এ জন্য ভারতের তথ্য প্রযুক্তি খাতের সবচেয়ে বড় কোম্পানি ইনফোসিসের সঙ্গে অংশীদারিত্ব গড়ে তুলবে সরকার। এই পার্কে তথ্য প্রযুক্তি খাতে কাজ করতে ইচ্ছুক বা তথ্য প্রযুক্তি খাতে দক্ষ ৬০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। রাজধানী ঢাকা থেকে ২৫ মাইল উত্তরে পার্কটি গড়ে উঠবে। এই পার্কটি যেমন আকৃষ্ট করবে বাংলাদেশিদের, তেমনি আকৃষ্ট করবে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের। কারণ এর মাধ্যমে তারা দেশের যুবকদের এবং ডিজিটাল জগতের কর্মক্ষম শক্তিকে ধরতে সক্ষম হবেন। বাংলাদেশের লক্ষ্য : গ্রাফিক ডিজাইন, ওয়েব এবং মোবাইল অ্যাপের উন্নয়নে বিশ্বে নেতৃত্ব দেয়া। নাগরিকদের কর্মসংস্থান, বিদেশিদের আকৃষ্ট করা এবং বাংলাদেশকে একটি আইটি পাওয়ার হাউস (শক্তিঘর) হিসেবে গড়ে তুলতে ব্যয়বহুল এই বিশাল তথ্য প্রযুক্তি পার্কের উদাহরণটা হলো সাম্প্রতিক কাজের মধ্যে অন্যতম। এটা সম্ভব হচ্ছে সরকারের পলিসি লেভেলের (উচ্চ পর্যায়ের নীতি প্রণয়নকারিগণ) সামনের দিকে এগুনোর নীতির ফল এবং নিচের দিকে রাজধানী ঢাকায় তথ্য প্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট সংস্কৃতি তৈরি হওয়ার মাধ্যমে। এখানে অনুকূল পরিবেশ বিরাজ করছে যা তথ্য প্রযুক্তির জন্য কর্মসহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করছে বলা যায়। তাছাড়া উদ্যোক্তা সম্মেলনে তো প্রতিদিনই প্রসারিত হচ্ছে।

প্রতি বছর বিশ্বে স্টার্টআপ উইকেন্ড (তথ্য প্রযুক্তি সংক্রান্ত সাপ্তাহিক উদ্যোক্তা সম্মেলন) অনুষ্ঠিত হয় যেখানে উদ্যোক্তাদের ৫৪ ঘণ্টার মধ্যে তথ্য প্রযুক্তি সংক্রান্ত একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়া হয়। ২০১৩ সালে বাংলাদেশে স্টার্টআপ উইকেন্ড অনুষ্ঠিত হয়। লন্ডন স্কুল অব ইকোনোমিকসের বাংলাদেশি একজন গ্রাজুয়েট ‘ডুগডুগি’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন যা দেশে গানের জগতে চলা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একমাত্র বৈধ সেবা দানকারী প্রতিষ্ঠান।

নিজ দেশে সর্বব্যাপী জ্ঞানের স্বল্পতা এবং তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেয়ার পদ্ধতির অভাব দেখে ঢাকার চার তরুণ ব্যবসায়ী চাকরি ছেড়ে দিয়ে নিজেরাই ব্যবসায়ী উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। তারা ব্যাংক ও তথ্য প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন খাতে চাকরি করতেন। পরে ২০১৩ সালে তারা ‘লাইটক্যাসেল পার্টনার’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। প্রতিষ্ঠানটির কাজ বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য সম্পর্কে বিশ্লেষণভিত্তিক সমাধান সরবরাহ করা। দ্রুত বেড়ে চলা বাংলাদেশের তথ্য প্রযুক্তির খাত বিশ্বের নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালি ভিত্তিক মূলধনী উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান ফাইভ হান্ড্রেড স্টার্টআপস ‘চালডাল ডটকম’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করেছে। এটি একটি অনলাইন ভিত্তিক মুদি দোকান। প্রতিষ্ঠানটি ক্রেতাদের বাসায় অর্ডার দেয়া পণ্য পৌঁছে দেয়। এর প্রতিষ্ঠাতা ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার হোয়ারটন স্কুল থেকে স্নাতক ডিগ্রিধারী এক বাংলাদেশি।

১৬ কোটি ৫ লাখ মানুষের বাংলাদেশে ১০ কোটি মোবাইল গ্রাহক আছে। প্রতিদিনই এই তালিকায় ৫০ হাজার নতুন গ্রাহক যুক্ত হচ্ছেন। মোবাইল গ্রাহকদের মধ্যে ২ কোটি ৯০ লাখের বেশি ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। ইন্টারনেট ব্যবহার করে গ্রাহকরা তাদের প্রাত্যহিক জীবনে পরিবর্তন আনতে সক্ষম হচ্ছেন। আর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রতি বছরই ই-বাণিজ্য ৫০ শতাংশ হারে বাড়ছে।

২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের নির্বাচনী প্রচারের মূল লক্ষ্য ছিল সরকারি কাজকে ডিজিটালাইজ তথা তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে সম্পন্ন করা এবং তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক অর্থনীতিকে প্রসারিত করা। একই লক্ষ্য ছিল গত বছরের নির্বাচনেও। ২০১৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণার সময় প্রধানমন্ত্রী ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ ভিশন-২০২১’ নামের একটি পরিকল্পনার উদ্বোধন করেন।

অর্থাত্ ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে সম্পূর্ণরূপে ডিজিটালাইজ করার পরিকল্পনা। সম্প্রতি ‘বাংলাগভনেট’ নামে একটি প্রকল্প চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, পরিদপ্তরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে একটা নিরাপদ অনলাইন সংযোগ গড়ে উঠবে। ফাইবার অপটিক ক্যাবলের মাধ্যমে কাজটি করা হচ্ছে। ফলে এটা অত্যন্ত দ্রুতগতির ইন্টারনেট হবে। এই নেটওয়ার্কের ফলে সরকারি সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছবে, সরকারি কাজের স্বচ্ছতা এবং দক্ষতা বাড়বে যা দুর্নীতি কমিয়ে আনতে সহায়তা করবে।

গ্রামাঞ্চলে দরিদ্র মানুষকে সরকারি সেবা কিংবা সামান্য তথ্য পাওয়ার জন্য বহু দূরে যেতে হয়। ফলে শ্রম এবং সময় দুটোই নষ্ট হয়। নাগরিকদের এই দুর্ভোগের অবসান ঘটাতে সরকার ‘অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন’ নামের একটি অনলাইন কর্মসূচি চালু করেছে। এর মাধ্যমে নাগরিকরা সহজেই ঘরে বসে সরকারি বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত পাচ্ছেন। তারা সরকারি বিভিন্ন ওয়েবসাইটে প্রবেশ করছেন, পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলও জানতে পারছেন অনলাইনের মাধ্যমে। এছাড়া অনলাইনে বসে বইও পড়তে পারছেন নাগরিকরা। সরকার জাতিসংঘ ভিত্তিক কর্মসূচি ‘বেটার দ্যান ক্যাশ অ্যালায়েন্স’র সঙ্গে অংশীদারিত্ব গড়ে তুলেছে। এর সঙ্গে জড়িত আছে যুক্তরাষ্ট্র এবং ভিসার মতো নামী দামী সব কোম্পানি। ‘দ্য বেটার দ্যান ক্যাশ অ্যালায়েন্স’র মাধ্যমে মানুষ নগদ অর্থ আদান-প্রদান করতে পারছেন অনলাইনের মাধ্যমে। এই উদ্যোগের ফলে সরকার তার সামাজিক কল্যাণমূলক কর্মসূচির আওতায় থাকা নাগরিকদের অর্থ এবং সেবা দিতে পারবেন ডিজিটাল ফর্মে। বাংলাদেশে ডিজিটাল ফর্মের এই উত্থান ইতোমধ্যেই নাগরিকদের জীবনমানের উন্নতি করতে সক্ষম হয়েছে। গত জুনে বিশ্ব ব্যাংক জানায়, বাংলাদেশ নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্ন মধ্যবিত্ত আয়ের দেশের তালিকায় উন্নীত হয়েছে। এটা সম্ভব হয়েছে দেশের সরকারের চাকরির বাজার সৃষ্টি এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে। বাস্তবে বাংলাদেশের মূলধনী বাজারে বিদেশি বিনিয়োগ ২০১৩ সালের চেয়ে ২০১৪ সালে দ্বিগুণ হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ৬০ শতাংশ বিনিয়োগকারীই মার্কিন নাগরিক। ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যের সাবেক প্রযুক্তি বিষয়ক প্রধান এবং অলাভজনক প্রতিষ্ঠান টিআইই গ্লোবালের প্রধান নির্বাহী বলেছেন, ‘পরবর্তী অর্থনৈতিক পরাশক্তি হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ’ এবং বাংলাদেশ সেই ধরনের একটি ডিজিটাল সরকার আছে।’

(জাপান ভিত্তিক আন্তর্জাতিক ম্যাগাজিন দ্য ডিপ্লোম্যাটে প্রকাশিত নিবন্ধটির ভাষান্তর করেছেন শিফারুল শেখ)

লেখক : বাংলাদেশ সরকারের তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পুত্র