বিনিয়োগ বনাম ব্যাংক ঋণ

কয়েকদিন আগে আমাদের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার (২০১৫-২০২০) ওপর কিছু তথ্য দিয়েছেন এবং সাথে সাথে কিছু মন্তব্য। আগে পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার লক্ষ্যগুলো সম্পর্কে একটা ধারণা নেয়া যাক। কাগজে প্রকাশিত তার বক্তব্য থেকে দেখা যাচ্ছে, সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার শেষ বছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার হবে ৮ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি ধরে রাখা হবে সাড়ে ৫ শতাংশের মধ্যে। বর্তমানে আমাদের মোট জিডিপি’র পরিমাণ ১৫ দশমিক ১৩ ট্রিলিয়ন টাকা (এক ট্রিলিয়ন সমান এক হাজার বিলিয়ন)। দেখা যাচ্ছে, সরকার ‘গ্রস ডমেস্টিক ইনভেস্টমেন্ট’ বাড়িয়ে করতে চায় ৩৪ দশমিক চার শতাংশ। এর মধ্যে বেসরকারি বিনিয়োগের হার ধরা হয়েছে ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ। আর সরকারি বিনিয়োগের হার ধরা হয়েছে ৭.৮ শতাংশ। এদিকে জাতীয় সঞ্চয়ের হার বৃদ্ধি করা হবে ৩২ দশমিক ১ শতাংশে। এই হচ্ছে মোটামুটিভাবে সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার লক্ষ্যমাত্রা। এসব লক্ষ্যমাত্রার কথা বলতে গিয়ে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, এই পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাকালে দেশে এক কোটি ৮৭ লক্ষ লোকের চাকরির সংস্থান হবে, অথচ এই সময়ে নতুনভাবে শ্রমবাজারে ঢুকবে এক কোটি ২৫ লক্ষ যুবক। অর্থমন্ত্রী মনে করেন বাংলাদেশ বৈষম্য দূরীকরণে ভালো করছে, বিশেষ করে সর্বনিম্ন স্তরে। কিন্তু উপরের স্তরে বৈষম্য প্রবল। তিনি এও বলেছেন, আগামি বছরগুলোতে এই বৈষম্যও হ্রাস করা হবে। তিনি প্রাথমিক শিক্ষার অবস্থা ‘ভালো’ বলে উল্লেখ করেছেন। তবে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার গুণ ও মান উন্নত করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। সরকার শহরমুখী মানুষকে পল্লীমুখী করার চেষ্টা করবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এটা করা হবে ‘পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশীপ’ (পিপিপি) দ্বারা। তিনি আরেকটি তথ্য দিয়েছেন, যাকে ‘মিডিয়া’ খবরের শিরোনাম করেছে। তথ্যটি দুর্নীতি সম্পর্কিত। তার মতে দুর্নীতি ‘জিডিপি’র দুই থেকে তিন শতাংশ খেয়ে ফেলছে, আর রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্যও ‘জিডিপি’র ক্ষতি হচ্ছে এক শতাংশ। তার মতে তথ্যপ্রযুক্তির দ্বারা দুর্নীতি হ্রাস করা সম্ভব। অর্থমন্ত্রীর সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে সবিশেষ আলোচনার কিছু নেই। তিনি নিজেই নিজেকে বলেন উচ্চাভিলাসী। এমতাবস্থায় লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কথা না বলাই ভালো। শুধু একটা কথা তাকে স্মরণ করিয়ে দিলেই যথেষ্ট। যে প্রবৃদ্ধির হার অর্জন করার কথা এখন বলা হচ্ছে তা কিন্তু অর্জন করার কথা ছিল বিগত পাঁচ বছরে। সেটা পারলে আমরা কিন্তু এদ্দিনে মধ্যম আয়ের দেশ হয়ে যেতাম। এখন আছি ‘নিম্নমধ্যম’ আয়ের দেশ হিসাবে। এই অর্জনও কম নয়। তবে এ কথা ঠিক, আমরা যদি লক্ষ্যমাত্রা মাফিক এগোতে পারি এবং তা অর্জন নিশ্চিত করতে পারি তাহলে কর্মসংস্থানের যে জরুরি বিষয়টা আছে তার ব্যবস্থা করা যাবে। অবশ্য সবই নির্ভর করবে বিনিয়োগের উপর, বিশেষ করে বেসরকারি বিনিয়োগের উপর। এর অবস্থা সন্তোষজনক নয়। কীভাবে তা সম্ভব করা হবে এর উপর নির্ভর করবে সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার ভবিষ্যত্।

অর্থমন্ত্রী মহোদয় বলুন বা না বলুন একথা অনস্বীকার্য, বেসরকারি বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান বাহন হচ্ছে ব্যাংক-ঋণ। শুধু আমাদের দেশে নয় ভারত ও চীনেও উন্নয়নের কাজ চলে ব্যাংক-ঋণে, ব্যাংকের টাকায়। এমনকী গত বছরের আগ পর্যন্ত সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রমরমাও ছিল ‘ইজিমানি’ পলিসির কারণে। আজকের দিনের অবস্থায় আমাদের উন্নয়নের কথা আমরা ভাবতেই পারি না ব্যাংক-ঋণ ছাড়া। ব্যাংক-ঋণের সরবরাহের কথা যখন আসে তখন তার দুটো দিক আমাদের সামনে আসে। প্রথমত পরিমাণগত এবং দ্বিতীয়ত গুণগত। দুঃখজনক হলেও সত্যি, আমাদের এখানে ঋণের পরিমাণগত সমস্যার কথা সবাই বলেন। ব্যবসায়ী শিল্পপতিরা যেমন বলেন, তেমনি বলেন অন্যরাও। পরিমাণগত সমস্যা নেই এ কথা বলা যাবে না। যে ব্যবসায়ীর ‘ওয়ার্কিং ক্যাপিটেল’ দরকার এক কোটি টাকা, তাকে দেয়া হল পঞ্চাশ লক্ষ টাকা। এটা কোন সুবিচার নয়। এই অর্থাভাবে নিশ্চিতভাবে ব্যবসা ও ব্যবসায়ীর ক্ষতি হবে। এই সমস্যার সমাধান দরকার। দ্বিতীয় সমস্যাটির কথা বলি তাহলে সমাধান সূত্র বের হতে পারে। আমাদের অন্য একটা বড় সমস্যা অতিরিক্ত ঋণ মঞ্জুরি। লাগবে এক কোটি, দেয়া হবে দুই কোটি। এটি বিশেষ করে ঘটে শিল্পঋণের ক্ষেত্রে। আবার এক ব্যবসার কথা বলে অন্য ব্যবসায় টাকা খাটানোও হয়। এসব শুধু অতিরিক্ত মঞ্জুরিপ্রসূত সমস্যা নয়, এখানে ঋণের ‘ডাইভারশন’ সমস্যাও প্রকট। অর্থাত্ ঋণের ব্যবহার নিশ্চিতিকরণের সমস্যা। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি ঋণের পরিমাণগত প্রবাহ বৃদ্ধির চেয়ে আমাদের বড় সমস্যা ঋণের টাকার সদ্ব্যবহার। এটি কোনভাবেই নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এই যে বড় বড় ঋণ পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন ইত্যাদি নামীয় সমস্যা এর সঙ্গে বহু ক্ষেত্রে জড়িয়ে আছে টাকা সদ্ব্যবহার সমস্যা। কেউ হয়ত ঋণ নিয়েছেন, নিয়ে ব্যবসায় না খাটিয়ে নতুন ব্যাংকের মূলধন জোগান দিয়েছেন। কেউ ঋণ নিয়েছেন, তিনি জমিতে তা বিনিয়োগ করেছেন। কেউ ঋণ নিয়েছেন, টাকা খাটিয়েছেন শেয়ার বাজারে। এমনি বহু ঘটনা আছে। আছে পুঁজি পাচারের ঘটনা। বলা বাহুল্য এগুলো কিছুসংখ্যক ব্যবসায়ীর জন্য কোনো ‘গুণাহ’র কাজ নয়, কিন্তু ব্যাংকারদের জন্য তা গর্হিত অপরাধ। কোন পেশাদার ব্যাংকার প্রয়োজনের অতিরিক্ত ঋণ দিতে পারে না, কোনো পেশাদার ব্যাংকার ঋণের টাকা সদ্ব্যবহার নিশ্চিত না করে ঋণ দিতে পারেন না। কিন্তু এগুলো হয়। ব্যবসায়ী এবং ব্যাংকারদের যোগসাজশে তা হয়। বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তারা এতে জড়িত থাকে। থাকে মালিকপক্ষের লোকও। এদের হাত অনেক লম্বা। বিভিন্ন জায়গায় এদের হাত প্রসারিত। মন্ত্রণালয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান এদের করতলগত। সাদা চোখে এসব অনিয়ম, ঘোরতর অনিয়ম,জালিয়াতি, দুর্নীতি ইত্যাদি। নানাভাবে এসব ব্যাংকে সংঘটিত হয়। অর্থমন্ত্রী তার বক্তৃতায় যে দুর্নীতির কথা বলেছেন, যে দুর্নীতি ২-৩ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে ব্যাংকের এসব ঘোরতর অনিয়ম, জালিয়াতি, দুর্নীতি ঐ শ্রেণিতে পড়ে।প্রশ্ন, এসব বন্ধ করার ব্যবস্থা কী? অনেক ব্যবস্থা আছে। প্রশাসনিক ব্যবস্থার আগে এসব অনিয়ম ধরার পদক্ষেপ দরকার। প্রায় সকল ব্যাংকেই দেখা যায়, এক শ্রেণির ক্রেডিট কর্মকর্তা যুগযুগ ধরে একই স্থানে থেকে কাজ করছেন। পদোন্নতির পর পদোন্নতি। ব্যাংকে সবাই মনে করেন ‘ক্রেডিট’ ও ‘ফরেন একচেঞ্জ’ই একমাত্র বিভাগ- যার মূল্য আছে। এসব জায়গায় চিরস্থায়ী একটা ব্যবস্থা সর্বত্র গড়ে উঠেছে। আমি মনে করি এই ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ বন্ধ করতে পারলে ব্যাংকের দুর্নীতি ও ঘোরতর অনিয়ম বহুলাংশে হ্রাস করা সম্ভব।

ক্রেডিট ও ফরেন একচেঞ্জ বিভাগসহ কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে যে ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ গড়ে উঠেছে তার বিরুদ্ধে একটা ব্যবস্থা ব্যাংকাররা গড়ে তুলেছিল। কিন্তু ব্যাংকে ব্যাংকে এই ব্যবস্থাকে প্রায় অচল করে দেয়া হয়েছে। ব্যবস্থাটার নাম ‘জব রোটেশন’। এটা প্রত্যেক ব্যাংকের আদি দায়িত্ব। অফিসারদেরকে জেনারেল ব্যাংকিং-এর ভিত্তিজ্ঞান দেয়ার পর, ক্রেডিট শেখানো, ফরেন একচেঞ্জ শেখানো। সাথে সাথে অন্যান্য কাজ। এক সময় প্রশিক্ষণার্থী ব্যাংকাররা ‘ডেসপ্যাচ’-এ কাজ শুরু করত। এখন এসব উঠে গেছে। কিছু সংখ্যক ভাগ্যবান ব্যাংকারের জন্ম ক্রেডিটে ও ফরেন একচেঞ্জে এবং অবসরও সেখান থেকে। ‘জব রোটেশন’ প্রায় উঠেই গেছে। প্রত্যেক ব্যাংকের সিংহভাগ ব্যবসা- আমানত, ঋণ, বৈদেশিক বাণিজ্য ও মুনাফা—সীমিত হয়ে পড়েছে ব্যাংক বিশেষে ৫-৭-১০-১৫টি শাখায়। যত অনিয়ম, ঘোরতর অনিয়ম, দুর্নীতিপ্রবণ ঘটনা সব এসব ব্রাঞ্চে সংঘটিত হয়। এবং এসব ব্রাঞ্চে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার নামে মুষ্টিমেয় কিছু সংখ্যক কর্মকর্তাই বার বার পদায়ন পায়। এসব পদায়নের সাথে আবার শুধু বড় বড় কর্মকর্তারা জড়িত নয়, জড়িত বড় বড় গ্রাহকরা। যেখানে সিবিএ আছে সেখানে ‘সিবিএ’ নেতারা। ব্যাংকে দুর্নীতির খবর ঘনঘন ছাপা হয়। অর্থমন্ত্রীও দুর্নীতির কথা বলেন, বিচারের কথা বলেন, মামলার কথা বলেন। দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের নাম বলেন। বোর্ডকে দায়ী করেন। কিন্তু দুর্নীতিগ্রস্ত অফিসারকে বদলী করলে যে মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ ঘটে, সে কথা বলেন। পরিচালকরা ব্যাংকের গাড়ি ব্যবহার করলে মন্ত্রীরা আপত্তি করেন, কিন্তু মন্ত্রণালয়ের পাতি অফিসারদের জন্যও যে বড় বড় গাড়ি বরাদ্দ রাখতে হয় তার কথা মিডিয়াও লেখে না, মন্ত্রীরাও বলে না। এসবের সাথে জড়িত জব রোটেশন চায় না যারা সেই শ্রেণির ব্যাংক কর্মকর্তা। তারা ধ্বনি তুলে দক্ষ অফিসারকে সরিয়ে নতুন কাউকে দিলে ব্যাংক-এ ধস নামবে। অথচ ‘প্রশাসন’ চালিয়ে ব্যাংকের ‘এমডি’ হন, কেন্দ্রিয় ব্যাংকের ‘ইডি’ এবং ডেপুটি গভর্নর যারা বাণিজ্যিক ব্যাংকের ‘র’ও জানেন না তারা বাণিজ্যিক ব্যাংকের এমডি হন। এরাই ‘জব রোটেশন’ চায় না। মনে রাখা দরকার ব্যাংকের যেকোনো কাজ যেকোনো ডেস্কে এক-দুই মাস দেখলেই শেখা যায়। অথচ এই জব রোটেশনই হচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশ আছে তিন বছরের বেশি কেউ এক শাখায় বা একই কাজে নিয়োজিত থাকতে পারবে না। কিন্তু কেউ তা মানে না। আরো আছে, নিয়ম ছিল অডিট চলাকালীন সময়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ছুটিতে থাকবে যাতে তার হস্তক্ষেপ ছাড়াই ব্রাঞ্চে ‘অডিট’ করা যায়। বিদেশের ব্যাংকে তা অক্ষরে অক্ষরে পালিত হয়। আমাদের দেশে তা হয় না। নিয়ম করা ছিল বছরে কিছুদিন ‘ফোর্সড লিভ’ পাবে কর্মকর্তারা যাতে তার অনিয়ম নতুন লোক ধরতে পারে। এসব নিয়ম-নীতি ব্যাংকগুলোতে এখন প্রায় উঠেই গেছে—কী প্রাইভেট ব্যাংক, কী সরকারি ব্যাংকে। সর্বত্র এখন ‘তাবেদারদের’ রাজত্ব। প্রধান প্রধান নির্বাহীরা তাদের ‘বশংবদ’ কর্মকর্তা দিয়ে ব্যাংক চালাচ্ছেন, কর্মকর্তা বাইরে থেকে নিয়ে আসছেন। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এসব কারণই অন্যতম প্রধান কারণ ব্যাংক দুর্নীতির। সবাই দুর্নীতির কথা বলে, কিন্তু এই মৌলিক প্রশ্নটির কথা কেউ তুলে না। গভর্নরকে বলব, এদিকে নজর দিতে। জব রোটেশন, তিন বছরের পদায়ন, অডিটকালীন ছুটি, বছরের নির্দিষ্ট সময়ে ফোর্সড লিভ-এ বিষয়গুলো চোখ বুজে কার্যকর করতে। এগুলো ভারতের ‘রিজার্ভ ব্যাংক’ নির্দয়ভাবে পুনঃ চালু করেছে ব্যাংকে দুর্নীতি বন্ধ করতে। আমাদেরও উচিত অবিলম্বে এসব নিয়ম নির্দয়ভাবে চালু করা। আপত্তি উঠবে। হলফ করে বলতে পারি ব্যাংকে ধস নামবে না। এক সপ্তাহে সব ঠিক হয়ে যাবে। সবটা না পারা যায় প্রত্যেক ব্যাংকের ৮০ শতাংশ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে এমন ব্রাঞ্চে ‘মার্শাল ল’ প্রবর্তন করা হয় এই ক্ষেত্রে। আরো পদক্ষেপের কথা ভবিষ্যতে লিখব যা গৃহীত হলে ব্যাংকে দুর্নীতি বহুলাংশে হ্রাস পেতে পারে।