কেন্দ্রীয় ব্যাংক রূপ নিয়েছে মানবিক ব্যাংকে

দেশের আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সহায়ক মুদ্রানীতি প্রণয়ন এবং সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখা- কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রাথমিক দায়িত্ব এগুলোই। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দ্রব্যমূল্য মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার জন্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখাও জরুরি। বাংলাদেশ ব্যাংক এসব বিধিবদ্ধ কাজের বাইরেও তার কলেবর বাড়িয়েছে। কম সুদে ফসলি ঋণ, কৃষকের জন্য ১০ টাকার ব্যাংক হিসাব, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের জন্য ঋণ সহজীকরণের মতো উদ্যোগগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকাণ্ডকে মানবিক রূপ দিয়েছে। এ ছাড়া ব্যাংকগুলোর নিয়মিত সিএসআর (সামাজিক দায়বদ্ধতা কর্মসূচি) কর্মকাণ্ডের পরিধি বাড়িয়ে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে পরিচালিত করার উদ্যোগও নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
একই সময়ে শিল্পের নতুন ও বর্ধনশীল নানা খাতেও অর্থায়ন উৎসাহিত করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্ব তহবিল গঠন করেছে। দেশের অর্থনীতিকে ওপরে টেনে তোলার পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষায়ও মনোযোগী হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পাহাড়ে তামাক চাষ নিরুৎসাহ করে মসলা চাষের ঋণ বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে।
আগে থেকে শুরু হলেও এসব কর্মকাণ্ডের বিকাশ ঘটেছে গত ছয় বছরে। আর তা ঘটেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমানের হাত ধরে। শুধু আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংককে একটি মানবিক ব্যাংকে রূপান্তরিত করতে মূল ভূমিকা রেখেছেন তিনি। বাণিজ্যিক ব্যাংকের মতো কেন্দ্রীয় ব্যাংকেও চালু করেছেন সিএসআর। পরিবেশবান্ধব ব্যাংকিং নীতিমালা করে ব্যাংকগুলোকে এ খাতে অর্থায়ন করতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। কৃষি খাতে বিদেশি ব্যাংকগুলোকে ঋণ দিতে বাধ্য করেছেন। তাঁরই উদ্যমী তৎপরতায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে ১০০ কোটি ডলারের ঋণ আনা সম্ভব হয়েছে। ছোটদেরও ব্যাংকিং শেখাতে চালু করা হয়েছে স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রম। মোবাইল ব্যাংকিং এনে দিয়েছে বিদেশি পদক।
২০০৯ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ব্যাংক খাতে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কার্যক্রমে হাত দেন ড. আতিউর রহমান। এর ফলে দেশের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে কৃষক, অতিদরিদ্র, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, পথশিশুরাও ব্যাংকে গিয়ে লেনদেন করার সুযোগ পেয়েছে। প্রথম দিকে এ কর্মসূচিকে আলাদা করে দেখা হলেও বর্তমানে এটি মূলধারার ব্যাংকিংয়ে পরিণত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন গভর্নর। শুধু তাই নয়, বিষয়টি এখন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও আলোচিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
গত বৃহস্পতিবার মুদ্রানীতি ঘোষণাকালে গভর্নর ড. আতিউর রহমান বলেন, ‘আর্থিক অন্তর্ভুক্তির যে কাজগুলো করছি তা এখন মূলধারার কার্যক্রমে পরিণত হয়েছে। এটা এমন না যে আংশিক বিষয়। এটা মূলধারার যে অর্থনীতি বা মুদ্রানীতি পরিচালনা করছি তার অংশ হয়ে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে এটা আমাদের অংশ হয়ে যাবে। ফলে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা আসছে। অর্থায়নের এই যে নতুন ধারা, এই ধারার কারণে আমাদের আর্থিক খাতেও স্থিতিশীলতা আসছে।’
এই কারণে বিষয়টি বিদেশিদের এতটা দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে বলেও জানান গভর্নর। তিনি বলেন, ‘জাতিসংঘের নেতৃত্বে একটি কমিশন হয়েছে। এই কমিশনের বাংলাদেশের পক্ষে আমি সদস্য। কমিশনের প্রতিবেদনের খসড়া তৈরি হয়েছে। সেখানেও বাংলাদেশ সম্পর্কে বিরাট অংশ আলোচনায় এসেছে। সেখান থেকে বোঝা যাচ্ছে এটি মূল ধারার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। এর প্রভাব শুধু দেশের ভেতর না, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আমাদের এই কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।’
সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও আর্থিক সেবার বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীকে ব্যাংক খাতের সঙ্গে যুক্ত করতে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কার্যক্রম হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই কার্যক্রমের অংশ হিসেবে কৃষকদের ১০ টাকায় ব্যাংক হিসাব খোলার উদ্যোগ নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এরই মধ্যে প্রায় ৯৭ লাখ ২৬ হাজার ৬৪৫টি ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে।
এ ছাড়া অতিদরিদ্র, মুক্তিযোদ্ধা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ভাতাভোগী, ক্ষুদ্র জীবনবীমা পলিসি গ্রহীতা, অতিদরিদ্র নারী, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দুস্থ পুনর্বাসনের অনুদানপ্রাপ্ত ব্যক্তি, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা শ্রমিকসহ সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য ১০ থেকে ১০০ টাকায় ব্যাংক হিসাব খোলার সুযোগ করে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ২০১৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কার্যক্রমের আওতায় খোলা ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক কোটি ৪৯ লাখ ৬০ হাজার ৯৩৮টি। এসব হিসাবের লেনদেনের বিপরীতে কোনো সার্ভিস চার্জও নেওয়া হয় না।
শুধু ব্যাংক হিসাব খোলা নয়, হিসাবগুলো সচল রাখতে কৃষকদের জন্য ২০০ কোটি টাকার একটি পুনরর্থায়ন তহবিলও গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরই মধ্যে এই তহবিল থেকে ঋণও দেওয়া শুরু হয়েছে। মাত্র সাড়ে ৯ শতাংশ সুদে তহবিল থেকে ঋণ পাচ্ছে কৃষকরা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কলেবরও বাড়ছে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কার্যক্রমকে ঘিরে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কৃষিঋণ ও আর্থিক সেবাভুক্তি বিভাগ থেকে আর্থিক সেবাভুক্তি কার্যক্রমকে সরিয়ে ফিন্যানশিয়াল ইনক্লুশন বিভাগ নামে আলাদা বিভাগ গঠন করা হয়েছে। একই সঙ্গে কৃষিঋণ ও আর্থিক সেবাভুক্তি বিভাগের নাম পরিবর্তন করে কৃষিঋণ বিভাগ করা হয়েছে।
ছয় বছর আগে ২০০৯ সালের ২ মে গভর্নর হিসেবে ড. আতিউর রহমান যখন বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রথম বসেন, তখন দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৭ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলার। এরপর বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের উলট-পালট হয়েছে, যার হাওয়া লেগেছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও। তা সত্ত্বেও ছয় বছর পর বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের আকার হয়েছে ২৪ বিলিয়ন ডলার। এ সময়ে প্রবাসে বাংলাদেশিদের সংখ্যা বেড়েছে, তাদের আয়ও বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে বৈধ উপায়ে দেশে টাকা পাঠানোর হার, যার বেশির ভাগ কৃতিত্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারির।
এই উচ্চ রিজার্ভের ওপর ভর করেই নিজস্ব অর্থায়নে দেশের বৃহত্তম অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্প পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের কাজ শুরু করার শক্তি পেয়েছে বাংলাদেশ। ওই রিজার্ভের ওপর ভর করেই বড় বড় প্রকল্প নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন করতেই ‘সভরেন ওয়েলথ ফান্ড’ গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই তহবিল গঠনের সম্ভাব্যতা যাচাই, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী এর উত্তম ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আইন, নীতি ও কারিগরি দিক পর্যালোচনা করে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন তৈরিতে কাজ করছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরীর নেতৃত্বে ১০ সদস্যের কমিটি।
গভর্নর হিসেবে আতিউর রহমানের যোগদানের পর থেকে গত ছয় বছরে ব্যাংকিং খাতের অর্জন অনেক। ২০০৯ সালে দেশে ব্যাংকগুলোর মোট শাখার সংখ্যা ছিল সাত হাজার ১৮৭টি, এখন তা বেড়ে হয়েছে ৯ হাজার ৪০টি। বর্তমানে প্রতি এক লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকের শাখা রয়েছে ৮.১৯টি, ২০০৯ সালে এ হার ছিল ৭.১৯। আর বর্তমানে দেশের প্রতি এক লাখ পূর্ণবয়স্ক মানুষের জন্য এটিএম বুথ রয়েছে ৬.৩৩টি। ছয় বছর আগে প্রতি লাখ মানুষের জন্য শাখা ছিল ১.২৫টি। অবশ্য এই সময়ে ব্যাংকের সংখ্যাও ৪৮ থেকে বেড়ে ৫৬টি হয়েছে।
কেবল ব্যাংকগুলোর শাখা বিস্তার নয়, অর্থনীতির আকার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংকগুলোর মূলধন, আমানত এবং ঋণ ও অগ্রিমের আকারও বেড়েছে। ছয় বছরের ব্যবধানে ব্যাংকগুলোর মোট মূলধনের আকার ২৭ হাজার ২৭০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৭১ হাজার ৭৫৪ কোটি টাকা। ২০০৯ সালে ব্যাংকগুলোতে মোট আমানতের পরিমাণ ছিল তিন লাখ তিন হাজার ৭৫৮ কোটি টাকা, যা এখন সাত লাখ ১৩ হাজার ৮৩০ কোটি টাকা। আমানতের মতোই বেড়েছে ঋণ ও অগ্রিমের আকারও। ২০০৯ সালে ব্যাংকিং খাতের মোট ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ ছিল দুই লাখ ৪৯ হাজার ৩১৭ কোটি টাকা। এখন এর আকার পাঁচ লাখ ২৭ হাজার ৬৪১ কোটি টাকা।
সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের মধ্যে সবচেয়ে নন্দিত কর্মসূচি হলো ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যাংকিং কার্যক্রম’ পরিচালনা। এরই অংশ হিসেবে সমাজের পশ্চাৎপদ, নিম্ন আয়ের মানুষ, কৃষক ও শিক্ষার্থীদের নামমাত্র টাকায় হিসাব খোলার সুবিধা করে দেওয়া এবং মোবাইল ব্যাংকিং কার্যক্রমের আওতায় অর্থ স্থানান্তর সহজতর করা হয়েছে। দেশের সমগ্র ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সামাজিক দায়বোধসম্পন্ন অর্থায়নে উদ্বুদ্ধ করে কৃষক, খুদে ও নারী উদ্যোক্তাসহ সমাজের সর্বস্তরের জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থিক সেবার আওতায় আনা হয়েছে। এ পর্যন্ত ১০ টাকা দিয়ে ৯৭ লাখ ব্যাংক হিসাব খুলেছে সাধারণ মানুষ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্যতম আরেকটি বড় সাফল্যের মধ্যে রয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি ও পেমেন্ট সিস্টেম অবকাঠামোর আমূল আধুনিকায়ন। এর অংশ হিসেবে মোবাইল ফোন ও স্মার্ট কার্ডভিত্তিক আর্থিক সেবা, ই-কমার্স ও ব্যয় সাশ্রয়ী আর্থিক সেবা চালু করা হয়েছে। এ কারণেই মোবাইল ব্যাংকিংয়ের আওতায় হিসাব রয়েছে দুই কোটি ৫৯ লাখ।
লন্ডনভিত্তিক ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস গ্রুপের ব্যাংকার্স পত্রিকা সম্প্রতি গভর্নর ড. আতিউর রহমানকে পুরস্কৃত করেছে। জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জনে সমর্থন জোগানো এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়নের প্রশংসা করেছে। আফ্রিকার দেশগুলোও এ ধরনের কিছু উদ্যোগ নিয়েছে উল্লেখ করে ড. আতিউর রহমান বলেন, ওই সব দেশে শুধু টেলিকম কম্পানির মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবা বিস্তৃত করা হয়েছে। বাংলাদেশে মোবাইল ও টেলি ব্যাংকিংয়ের পাশাপাশি ১০ টাকায় হিসাব খোলার সুযোগ দিয়ে কৃষক, গার্মেন্ট শ্রমিকসহ নিম্ন আয়ের মানুষকে ব্যাংকিংয়ের আওতায় আনা হয়েছে। এখন কৃষকরা নিজের হিসাবে ভর্তুকির অর্থ পাচ্ছে, গার্মেন্ট শ্রমিকরা নির্বিঘ্নে মা-বাবার কাছে টাকা পাঠাতে পারছে।