সৌরবিদ্যুতে ঝলমল গ্রাম

বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেখানে এখনো পল্লীবিদ্যুৎ পৌঁছায়নি, সেখানে সৌরবিদ্যুৎ ‘আলোর বিপ্লব’ ঘটিয়ে চলেছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রামে সৌরবিদ্যুতের আলোয় কাটছে রাতের অাঁধার। এসব জনপদে লেখাপড়া, চাষ, টিভি দেখা, দৈনন্দিন বিভিন্ন কাজে এসেছে স্বস্তি। যেখানে বিদ্যুৎ আছে সেখানে লোডশেডিং থেকে মুক্তি দিচ্ছে সৌরবিদ্যুৎ। তবে সৌরবিদ্যুতের আলোয় যেমন আলোকিত হচ্ছে গ্রামাঞ্চল, সেখানে শহরে ঠিক এর উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরগুলোয় মানুষ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে তেমন আগ্রহী হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিজ্ঞতার অভাব ও সরকারি ঋণের জটিলতার জন্য শহরে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার কম।

ঢাকার বাইরে অনেক এলাকায় এখনো বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি। এ ছাড়া জেলা শহরগুলোয় মাত্রাতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের কারণে এখন অনেকেই বিকল্প জ্বালানি হিসেবে সৌরবিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। যেসব গ্রামে আগে কুপি, হারিকেন ও হ্যাজাক বাতির ব্যবহার হতো, এখন সেখানে ব্যবহার হচ্ছে সৌরবিদ্যুৎ। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন গ্রামে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বেশি। বিশেষ করে নাটোর জেলার সিংড়া উপজেলার মালকুড়, হাপুনিয়া, চৌপুকুরিয়াসহ বিভিন্ন গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহৃত হচ্ছে। ব্যবহারকারীরা তাদের সাধ্যানুযায়ী বিভিন্ন ওয়াটের সৌরবিদ্যুতের প্যানেল ব্যবহার করছেন। এসব গ্রামে গ্রামীণ শক্তি, ব্র্যাকসহ বিভিন্ন এনজিওর সহযোগিতায় মানুষ সৌরবিদ্যুতের সুবিধা ভোগ করছে। এ বিদ্যুতের সাহায্যে সাধারণত বাল্ব, টেলিভিশন, ফ্যান ইত্যাদি চালাচ্ছে তারা। এ ছাড়া দেশের উপকূলীয় এলাকায়ও সৌরবিদ্যুতের চাহিদা বেশি। এসব এলাকায় সেচ ও সড়কবাতি জ্বালানোর কাজে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্টরা জানান, সোলার প্যানেলসহ যাবতীয় যন্ত্রাংশের খরচ নিম্নবিত্তদের নাগালে এলে এর ব্যবহার আরও বৃদ্ধি পাবে। অন্যদিকে নগরীতে সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়াতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবে এর অগ্রগতি নেই। সৌরবিদ্যুৎ খাত-সংশ্লিষ্টরা জানান, শহরের কিছু বাড়িতে সোলার প্যানেল দেখা গেলেও তা বিদ্যুতের মিটার ব্যবহারের অনুমতি পাওয়ার জন্য স্থাপন করা হয়েছে। এগুলোর ব্যবহার একদমই হচ্ছে না। মিরপুরের পল্লবী আবাসিক এলাকার নতুন ভবনগুলোর ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপন করা হলেও বাস্তবে এর ব্যবহার চোখে পড়ে না। এ এলাকার এক ভবনমালিক আসাদুজ্জামান জানান, বাধ্যতামূলক হওয়ায় তিনি ভবন তৈরির সময় সোলার প্যানেল লাগিয়েছেন। কিন্তু বাড়ি তৈরির তিন বছরেও এর ব্যবহার করেননি। পল্লবীর মতো ঢাকার অন্য এলাকার চিত্র একই। এমনকি সরকারি ঘোষণার পরও অফিস-আদালতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার খুব একটা বাড়ছে না। অথচ নিজের একটি সোলার প্যানেল থাকলে বিদ্যুতের জন্য কারও কাছে যেতে হয় না। নেই বিদ্যুৎ বিলের ঝামেলা। ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, সচিবালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, পরিসংখ্যান ব্যুরোসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহৃত হচ্ছে। ঢাকার প্রধান রাস্তাগুলোর বহু বাতিও এখন জ্বলছে সৌরবিদ্যুতের আলোয়। সোলার বাংলাদেশের পরিচালক খন্দকার মামুনুর রহমান জানান, ঢাকায় ভবনমালিকদের ক্ষেত্রে সোলার প্যানেল বিষয়ে নেতিবাচক মনোভাব কাজ করে। কারণ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অনেকটা জোর করেই তাদের তা স্থাপন করাচ্ছে। কেবল বিদ্যুতের বিল বাড়লেই ভবনমালিকরা সোলার সিস্টেম ব্যবহারে আগ্রহী হন। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড নতুন ভবনে সোলার প্যানেল স্থাপনে যে নিয়ম করেছিল, তা বলতে গেলে কেউই মানে না। বাড়িভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের কার্যক্রম সরকারিভাবে শুরু হয় ২০০৩ সালে। সে সময় পাঁচ বছরের ৫০ হাজার বাড়িতে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের লক্ষ্যমাত্রা তিন বছরেই অর্জিত হয়। গ্রামের মানুষের সৌরবিদ্যুতের প্রতি আগ্রহের কারণেই এটি সম্ভব হয়েছিল। এরই মধ্যে বাংলাদেশে নয়টি সৌরবিদ্যুতের প্যানেল তৈরির কারখানা স্থাপিত হয়েছে। এর মাধ্যমে চালানো হচ্ছে শতাধিকের ওপর নলকূপ। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রতি মাসে প্রায় ৬৫ হাজার বাড়িতে নতুন করে সৌরবিদ্যুতের প্যানেল স্থাপিত হচ্ছে। সরকার ২০১৭ সালের মধ্যে ৬০ লাখ বাড়ি সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনার লক্ষ্যে কাজ করছে। আর এ সময়ের মধ্যে এর মাধ্যমে ২২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। বর্তমানে দেশে সৌরবিদ্যুতের সুবিধা ভোগ করছে প্রায় দুই কোটি মানুষ। আর সহজ ব্যবহার ও সাশ্রয়ী দামের কারণে এর ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। সরকারি ইনফ্রাসট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল) কর্তৃপক্ষ জানায়, এরই মধ্যে সৌরবিদ্যুতের প্যানেলসংখ্যা ৩৫ লাখে উন্নীত হয়েছে। দেশের ৪৭টি এনজিও ‘অংশীদার সংগঠন’ হিসেবে ইডকলের সার্বিক তত্ত্বাবধান ও অর্থায়নে বাড়িভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ কর্মসূচি পরিচালনা করছে।