বিদেশি বিনিয়োগে আশার আলো

রাজনৈতিক অস্থিরতা না থাকায় বিদেশিরা বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছেন। এতে বাড়ছে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই)। চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধের মুদ্রানীতির ঘোষণাপত্রে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বিদেশি বিনিয়োগ ১৭০ কোটি ডলার দাঁড়াবে বলে জানানো হয়েছে। শুধু তাই নয়, চলতি অর্থবছরে তা ১৯০ কোটি ডলারে উন্নীত হবে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতির প্রক্ষেপণে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরের ১১ মাসেই আগের অর্থবছরের পুরো সময়ের চেয়ে বেশি বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে বাংলাদেশে। এ সময়ে দেশে বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ১৫৮ কোটি ডলার, যা ২০১৩-১৪ অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে সাড়ে ২০ শতাংশ বেশি। তবে পুরো অর্থবছরের সঙ্গে তুলনা করলে এ বৃদ্ধির হার ৫ শতাংশ। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে এখনও অনেক পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অভাব, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো সমস্যা, জমি স্বল্পতা ও আমলান্ত্রিক জটিলতা দায়ী। এসব সমস্যা দ্রুত সমাধান করা গেলে বিনিয়োগে কাঙ্ক্ষিত গতি ফিরে আসবে।

এ বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, বর্তমানে দেশে রাজনৈতিক পরিবেশ স্থিতিশীল থাকায় বিদেশি বিনিয়োগ কিছুটা বাড়তে পারে। তবে তা কাঙ্ক্ষিত হারের চেয়ে অনেক কম। তাছাড়া দেশে যে পরিমাণ বিদেশি বিনিয়োগ আসছে তার মধ্যে নতুন বিনিয়োগের অংশ খুবই কম। এখানে পুনঃবিনিয়োগ ও ইন্ট্রা-কোম্পানির ঋণই বেশি। তিনি বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা থাকতে হবে। কিন্তু আমরা সেটি দিতে পারছি না। পাশাপাশি গ্যাস, বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো সমস্যা এবং জমির স্বল্পতা রয়েছে। এসব সমস্যা দ্রুত সমাধান না হলে কাঙ্ক্ষিত হারে বিদেশি বিনিয়োগ আসবে না। তাছাড়া আমাদের আরেকটি লক্ষ্যণীয় দিক হলো এখানে স্থানীয় বিনিয়োগও তেমন হচ্ছে না। অনেকটা স্থবির হয়ে আসে। অথচ বিশ্ব বিনিয়োগ পর্যালোচনায় দেখা গেছে, যে দেশে স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগে আগ্রহী হন না, সে দেশে বিদেশিরাও কম আগ্রহ দেখান। কাজেই স্থানীয় বিনিয়োগে গতি এলে বিদেশি বিনিয়োগও বাড়বে।

রাজনৈতিক অস্থিরতাসহ নানা কারণে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে দেশে বিদেশি বিনিয়োগ কমে যায়। ওই অর্থবছরে দেশে বিদেশি বিনিয়োগ এসেছিল ১৫০ কোটি ৪০ লাখ ডলার, যা তার আগের ২০১২-১৩ অর্থবছরের চেয়ে ২২ শতাংশ কম। তবে ২০১২-১৩ অর্থবছরে দেশে রেকর্ড বিদেশি বিনিয়োগ আসে। এর পরিমাণ ১৭২ কোটি ৬০ লাখ ডলার, যা এক অর্থবছরে এ যাবতকালের সর্বোচ্চ।

গেল অর্থবছরের বিদেশি বিনিয়োগে নতুন রেকর্ড হওয়ার আশা জাগছিল। কিন্তু চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ সময়ে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতায় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন অনিশ্চয়তা দেখা যায়। তবে গেল তিন মাসে এ অনিশ্চয়তা অনেকটাই কেটে গেছে। ফলে এখন স্থানীয়দের পাশাপাশি বিদেশিরাও বিনিয়োগে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। ফলে গেল অর্থবছরের শেষ সময়ে বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির তথ্য মিলেছে। তবে বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে গেল অর্থবছরের পুরো চিত্র এখনও পাওয়া যায়নি।

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক লেনদেন সারণিতে গেল অর্থবছরের ১১ মাসের বৈদেশিক বিনিয়োগের হালনাগাদ যে তথ্য পাওয়া যায় সেখানে ১১ মাসের হিসাবে বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ১৫৮ কোটি ১০ লাখ ডলার, যা ২০১৩-১৪ অর্থবছরের পুরো সময়ের চেয়ে ৫ শতাংশ বেশি।

এদিকে, বৃহস্পতিবার প্রকাশিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চলতি অর্থবছরের মুদ্রানীতির ঘোষণাপত্রে গেল অর্থবছরে বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ ১৭০ কোটি ডলার দাঁড়াবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। যদি তাই হয়, তবে তা হবে এ যাবতকালের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এছাড়া চলতি অর্থবছরে ১৯০ কোটি ডলারের মতো বিদেশি বিনিয়োগ আসতে পারে বলে চলতি মুদ্রানীতিতে আগাম পূর্বাভাস দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

অন্যদিকে, বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে জুনে জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন বিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাডের যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তাতে ২০১৪ সালে বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে প্রায় সাড়ে ৪ শতাংশের মতো। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৪ সালে দেশে এফডিআই এসেছে ১৫২ কোটি ৬৭ লাখ ডলার। ২০১৩ সালে যা ছিল ১৫৯ কোটি ৯১ লাখ ডলার। এ হিসাবে গেল বছর দেশে বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে ৭ কোটি ২৪ লাখ ডলার।