কর্মসংস্থানের আওতায় আসছে কর্মক্ষম বেকার

মানবসম্পদকে গুরুত্ব দিয়ে চলতি ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেট দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। সে লক্ষ্যকে সামনে রেখেই কাজ করছে সরকার। আগামী ৫ বছরের মধ্যে কর্মক্ষম বেকারদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবে সরকার। চলতি অর্থবছরের বাজেটে কর্মসংস্থান বাড়াতে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ‘রূপকল্প-২১’ সামনে রেখে এখন কর্মসংস্থানে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। প্রথম ধাপে ১ কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা রয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বাজেট বক্তৃতায় ঘোষণা করেন, ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর গড়ে দেশের অভ্যন্তরে ১০ লাখ ৩০ হাজার এবং দেশের বাইরে ৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে। শুধু তাই নয়, কর্মসংস্থান বৃদ্ধির পাশাপাশি ওই সময়ে প্রকৃত মজুরি বেড়েছে অনেক, যা দারিদ্র্য ও অসমতা হ্রাসে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়। তিনি বলেন, রূপকল্পের স্বপ্ন হচ্ছে উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে জনগণের জীবনমান উন্নয়ন। এজন্য মোটা দাগে সরকারের কৌশল হচ্ছেÑ অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর উন্নয়ন, গণদ্রব্য ও সেবার জোগান বৃদ্ধি, বিশ্ববাজারের সঙ্গে একীভূত হওয়া, উৎপাদন বিশেষায়ণ ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষা করা।
জানা গেছে, দেশে সর্বশেষ শ্রম জরিপ হয়েছে ২০১০ সালে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এ জরিপ করে। এরপর বেকারত্বের হার বা সংখ্যা নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান নেই। সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ-২০১০ এর প্রাথমিক প্রাক্কলিন অনুযায়ী দেশে ১৫ বছর বয়সের ঊর্ধ্বে জনসংখ্যা ৯ কোটি ৪৫ লাখ। এর মধ্যে অর্থনৈতিকভাবে কর্মক্ষম জনশক্তি ৫ কোটি ৬২ লাখ। কর্মক্ষম জনশক্তির মধ্যে বর্তমানে কর্মে নিয়োজিত ৫ কোটি ৩৭ লাখ। এরপর বর্তমান দেশে বেকার মানুষের সংখ্যা ২৬ লাখ। অবশ্য সরকারি সংস্থা বিবিএসের এ তথ্য মানতে অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের আপত্তি রয়েছে। তবে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে বেকারত্বের হার ১৪ দশমিক ২ শতাংশ। এর ওপর এখন প্রতিবছর নতুন করে ১৩ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে যোগ হচ্ছে। সুতরাং নতুন কর্মসংস্থান তৈরির চাপ রয়েছে অর্থনীতির ওপর। সংস্থাটির মতে, বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের হার ২ শতাংশ বাড়ানো গেলে প্রবৃদ্ধির হার ৮ শতাংশে উন্নীত হবে। তাহলেই ২০২১ সালের মধ্যে আয়ের দেশ হওয়া সম্ভব।
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির ২০১২ সালের এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর ২২ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করে। কিন্তু কাজ পায় ৭ লাখ। এর মধ্যে উচ্চশিক্ষিত অর্থাৎ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে যারা শিক্ষাজীবন শেষ করেন, তারাও আছেন। সামগ্রিকভাবে পরিসংখ্যানগুলো বলছে, তাদের মধ্যে কেউ-কেউ নিজ উদ্যোগে কিছু করার চেষ্টা করেন। অনেকে নিজের যোগ্যতার চেয়ে কম মানের কাজ করতে বাধ্য হন।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয় গত ছয় বছরে কৃষি ও গ্রামীণ খাতে উচ্চমাত্রার ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছে। দারিদ্র্য বিমোচনে হতদরিদ্র্য জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থানের লক্ষ্যভিত্তিক কার্যক্রম গ্রহণ করে গ্রামীণ জনপদে মৌসুমি বেকারত্ব বিদায় করতে সরকার সক্ষম হয়েছে। বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে অর্থবছরে ৬ কোটি ১২ লাখ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে সরকার, যা গত অর্থবছরের চেয়ে বেশি।
জানা গেছে, মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থা ঢেলে সাজানো, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্প খাত উৎসাহিত, প্রশিক্ষিত যুবক, যুব মহিলাদের সহজ শর্তে ঋণ দিয়ে আত্মকর্মসংস্থানের ব্যবস্থা, কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে প্রচলিত ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচিকে সব জেলায় সম্প্রসারণ, বিদেশে জনশক্তি রপ্তানি বৃদ্ধি এবং কৃষি ও সেবা খাতে কর্মসংস্থানের বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা আরও সম্প্রসারিত করবে সরকার।
মধ্য আয়ের দেশের স্বীকৃতি অর্জনেও যে কোনো দেশের মানবসম্পদের অবস্থানের সূচকটি জাতিসংঘ সর্বোচ্চ বিবেচনায় নিয়ে থাকে। তাই এ মুহূর্তে কর্মসংস্থানের সুযোগ ও ক্ষেত্র তৈরিতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপে দারিদ্র্য হ্রাসে সাফল্য এলেও নতুন কর্মসংস্থান সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিনই কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বাড়ছে কিন্তু চাকরির বাজারে প্রবেশ করতে পারছে না। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার হচ্ছে, ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্য আয়ের দেশে নিয়ে যাওয়া। এ অঙ্গীকার পূরণ করতে হলে প্রথমেই বেকারত্ব দূর করে দেশে কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।