প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশঃ অনৈতিক মাছ চাষের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা

নদী, খাল ও অন্যান্য প্রাকৃতিক জলাশয়ের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করে যারা মৎস্য চাষ করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘কিছু ব্যক্তি সুন্দরবনসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নদী, খাল ও অন্যান্য প্রাকৃতিক জলাশয়ে অনৈতিকভাবে মাছ চাষ করছে। এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। কোন প্রভাবশালী ব্যক্তিরা আমাদের নদী ও জলাশয়গুলো ধ্বংস করছে, এটা আপনাদের দেখতে হবে। তারা যে-ই হোক না কেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।’ গতকাল বুধবার রাজধানীর ফার্মগেটে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন অডিটরিয়ামে মৎস্য সপ্তাহের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভাষণকালে প্রধানমন্ত্রী এ নির্দেশ দেন। মৎস্য খাতের ব্যাপক সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে অর্থনীতিকে আরো শক্তিশালী করতে ‘সাগর নদী সকল জলে, মাছ চাষে সোনা ফলে’-এই প্রতিপাদ্য নিয়ে এ বছরের ২০১৫ মৎস্য সপ্তাহ গতকাল থেকে শুরু হয়েছে।

শেখ হাসিনা মাছ রপ্তানির সঙ্গে জড়িতদের রপ্তানীকৃত মাছের মান নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দিয়ে অনৈতিক পন্থা অবলম্বনকারীদের সতর্ক করে দেন। তিনি বলেন, ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার আগে চিংড়ি রপ্তানি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কিছু অসাধু ব্যক্তির লোহা মেশানোর কারণে এটা হয়েছিল। চিংড়ির সঙ্গে লোহা মেশালে বিদেশিরা তা খাবে না এবং এতে দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ জন্য এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে এবং অসৎ পন্থা অবলম্বনকারীদের মনে রাখতে হবে যে এ ধরনের কর্মকাণ্ড শাস্তিযোগ্য।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর সরকার চিংড়ি, মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানির জন্য বিভিন্ন বাস্তবমুখী ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে ঢাকার কাছে সাভারে একটি এবং চট্টগ্রাম ও খুলনায় দুটি আধুনিক মান নিয়ন্ত্রণাগার স্থাপনের কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, কক্সবাজারে আরো একটি আধুনিক মান নিয়ন্ত্রণাগার স্থাপনের কাজ এগিয়ে চলছে।

প্রধানমন্ত্রী মাছের যথাযথ বাজারজাত ও প্রক্রিয়াকরণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে বলেন, ৮০ থেকে ৯০ লাখ বাংলাদেশি বর্তমানে বিভিন্ন দেশে কাজ করছে। তিনি বলেন, ‘রপ্তানি বৃদ্ধির পাশাপাশি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় মাছের অভ্যন্তরীণ বাজারও সম্প্রসারিত হচ্ছে। ফলে শুধু মাছের উৎপাদনই যথেষ্ট নয়। আমরা মাছের বাজারজাত ও প্রক্রিয়াকরণেরও উদ্যোগ নিয়েছি।’

শেখ হাসিনা ‘মাছে ভাতে বাঙালি’ চিরাচরিত এই প্রবাদবাক্য সমুন্নত রাখতে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও দেশপ্রেম নিয়ে কাজ করতে মৎস্য সেক্টরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, দেশের প্রায় দেড় কোটি মানুষ মৎস্য সম্পদের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে সম্পৃক্ত। ১৩ লাখের বেশি মানুষ সার্বক্ষণিক মৎস্য পেশায় জড়িত রয়েছে। তিনি বলেন, দেশের মৎস্য সম্পদ জিডিপিতে ৪ শতাংশ অবদান রাখছে এবং কৃষি জিডিপিতে ২২.৬০ শতাংশ অবদান রাখছে। দেশের মৎস্য খাত মোট প্রোটিনের চাহিদার ৬০ শতাংশ পূরণ করছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর সরকার ১৯৯৬-২০০১ সালের মেয়াদকালে প্রথম জাতীয় নীতি-১৯৯৮ প্রণয়ন করে। এই নীতির আলোকে দেশের অভ্যন্তরীণ উন্মুক্ত জলাশয়ে মৎস্য পোনা অবমুক্ত করা হয়। তিনি বলেন, দেশে মৎস্য চাষ সম্প্রসারণের জন্য বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে জাতিসংঘ খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) ১৯৯৭ সালে মৎস্য বিভাগকে ‘অ্যাডয়ার্ড সাওমা অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর সরকার জলমহল নীতি, মৎস্য হ্যাচারি আইন ও নীতি, মৎস্য ফিড আইন ও নীতি এবং জাতীয় চিংড়ি নীতি ২০১৪ প্রণয়ন করেছে। তাঁর সরকারের এসব পদক্ষেপের ফলে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে ৩৫.৪৮ লাখ টন হয়েছে।

শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ উন্মুক্ত জলাশয়ে মৎস্য উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে। তাঁর সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে বাংলাদেশ গত ৬ বছরে চিংড়ি, মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানি করে ২৫ হাজার ১৩৫ কোটি টাকার বেশি আয় করেছে।

তিনি মৎস্যজীবীদের খাদ্য সহায়তা দিয়ে মা ইলিশ এবং জাটকা মাছ ধরা বন্ধে তাঁর সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের কথা উল্লেখ করে বলেন, এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে দেশে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে। তিনি বলেন, দেশে ইলিশের উৎপাদন গত ছয় বছরে ৩.৮৫ মেট্রিক টন থেকে বেড়ে ৮৬ হাজার মেট্রিক টনে উন্নীত হয়েছে।

শেখ হাসিনা ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্র সীমানা জয় সম্পর্কে বলেন, বাংলাদেশ এর মাধ্যমে গভীর সমুদ্রে এক লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকার মালিকানা পেয়েছে। তিনি বলেন, ‘এই বিপুল পরিমাণ জল সীমানা মৎস্য আহরণ, বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং বিপুলসংখ্যক লোকের জীবনমান উন্নয়নের মাধ্যমে আমাদের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’ প্রধানমন্ত্রী সমুদ্র সম্পদ আহরণে আরো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা আমাদের সম্পদ হিসেবে গভীর সমুদ্র থেকে মৎস্য আহরণে আরো কার্যকর পদক্ষেপ নেব। তিনি বলেন, ‘এখন আমাদের ভাবতে হবে, আমাদের আর্থসামাজিক উন্নয়নে এই সম্পদ আমরা কিভাবে ব্যবহার করতে পারি।’

প্রধানমন্ত্রী এর আগে জাতীয় পর্যায়ে মৎস্য খাতে উন্নয়নে বিশেষ অবদান রাখার স্বীকৃতি হিসেবে ২০ জন ও সংগঠনকে অ্যাওয়ার্ড প্রদান করেন। পরে তিনি শেরে বাংলানগরে গণভবন পুকুরে মাছের পোনা অবমুক্ত করে জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ-২০১৫-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেন।

মৎস্য অধিদপ্তর আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ সায়েদুল হক। এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন একই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ। এ ছাড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব সেলিনা আফরোজ ও মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সৈয়দ আরিফ আজাদ অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন।