আমের উত্পাদন ও রপ্তানি সম্ভাবনা

আমের রপ্তানি বিষয়টি এদেশের আম ব্যবসায়ী এবং আম চাষিদের নিকট একেরারেই নতুন। আমের রপ্তানি শুরু হওয়ার পর অনেক আমচাষি চেষ্টা করেছেন তার বাগানের আম রপ্তানির জন্য। তাদের ধারণা প্রচলিত পদ্ধতিতে উত্পাদিত আম রপ্তানি করা যাবে। প্রকৃতপক্ষে রপ্তানিযোগ্য আম উত্পাদনের জন্য ব্যবস্থা নিতে হবে আম সংগ্রহ করার পর থেকেই। এদেশে জন্মানো সকল জাত রপ্তানিযোগ্য নয়। প্রথমেই আমাদের জানা দরকার কোন জাতগুলো রপ্তানি করা যাবে। হিমসাগর, খিরসাপাত, বারি আম-২ বা লক্ষণভোগ, ল্যাংড়া, ফজলি, বারি আম-৩ বা আম্রপালি, বারি আম-৭ ও আশ্বিনা জাতের আম সহজেই রপ্তানি করা যাবে। তবে হাড়িভাঙ্গা আমটিকে বিবেচনায় রাখা যেতে পারে। অন্য জাতগুলো বিভিন্ন কারণে রপ্তানি করা আপাতত সম্ভব নয়। তবে স্থানীয় কিছু ভাল জাতের আম থাকলে গবেষকদের সাথে আলাপ করে ব্যবস্থা নিতে হবে।

তবে যে জাতই হোক না কেন আমগাছ হতে আম সংগ্রহের পর হতে আমের বৃদ্ধির পর্যায়ে বিভিন্ন পরিচর্যার প্রয়োজন হয়। যেমন প্রুনিং, ট্রেনিং, সার ব্যবস্থাপনা, সেচ ব্যবস্থাপনা ও রোগ এবং পোকামাকড় দমন পদ্ধতি। আমগাছ হতে আম সংগ্রহ করার পর রোগাক্রান্ত বা মরা ডালপালা একটু ভাল অংশসহ কেটে ফেলতে হবে। ডালপালা এমনভাবে ছাঁটাই করতে হবে যেন গাছের ভিতরের অংশে পর্যাপ্ত পরিমাণ সূর্যালোক পৌঁছাতে পারে। গাছের ভিতরমুখী ডালে সাধারণত ফুল-ফল হয় না, তাই এ ধরনের ডাল কেটে ফেলতে হবে। ফলে বর্ষাকালে কর্তিত অংশগুলো হতে নতুন কুশি জন্মাবে এবং পরের বছরে এই নতুন কুশিগুলোতে ফুল আসবে। একটি কথা মনে রাখতে হবে ডগার বয়স ৫-৬ মাস না হলে ঐ ডগায় সাধারণত ফুল আসে না। আগামী বছরে একটি গাছে কি পরিমাণ ফলন হতে পারে তা আগস্ট মাসেই ধারণা পাওয়া যায়। এ সময়ের মধ্যে গাছে যতবেশি নতুন ডগা বের করা যায় ততই উত্তম।

এরপর যে বিষয়টির উপর গুরুত্ব দিতে হবে তা হলো আমবাগানে সার প্রয়োগ। আমবাগান হতে প্রতি বছর ভাল ফলন পাওয়ার জন্য সময়মত সুষম মাত্রায় সার প্রয়োগ করতে হবে। প্রতিটি গাছে প্রতি বছর কি পরিমাণ সার দিতে হবে তা নির্ভর করে মাটিতে বিদ্যমান সহজলভ্য পুষ্টি উপাদানের উপর। সব ধরনের মাটিতে সারের চাহিদা সমান নয়। সুতরাং মাটির অবস্থাভেদে সারের চাহিদা কম-বেশি হতে পারে। গাছের বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে সারের চাহিদাও বাড়তে থাকে।

সার প্রয়োগের পর যে বিষয়টির উপর গুরুত্ব দিতে হবে তা হলো আমবাগানে নিয়মিত সেচ দিতে হবে। খরা মৌসুমে ঘন ঘন সেচ দিতে হবে। তবে মাটিতে পর্যাপ্ত রস থাকলে সেচের প্রয়োজন পড়ে না। গবেষণা করে দেখা গেছে আম গাছে পরিবর্তিত বেসিন পদ্ধতিতে অর্থাত্ গাছের গোড়ার চারিদিকে ১ মিটার জায়গা সামান্য উঁচু রেখে দুপুর বেলা যতটুকু জায়গায় গাছের ছায়া পড়ে ততটুকু জায়গায় একটি থালার মতো করে বেসিন তৈরি করে সেচ প্রয়োগ করলে সেচে পানির পরিমাণ কম লাগে এবং গাছ বেশির ভাগ পানি গ্রহণ করতে পারে। বেসিন পদ্ধতির আরেকটি সুবিধা হলো গাছের গোড়া পরিষ্কার থাকে ফলে আগাছা জন্মাতে পারে না। সেচ প্রয়োগকৃত জায়গা কচুরিপানা দ্বারা ঢেকে দিলে মাটিতে একমাস পর্যন্ত আর্দ্রতা ধরে রাখে। বিশেষ করে পাহাড়ি অঞ্চলে আম চাষাবাদের জন্য মালচিং প্রযুক্তিটি ব্যবহার করলে ভাল ফলাফল পাওয়া যেতে পারে। তবে আমগাছে ফুল আসার একমাস আগে সেচ না দেয়া উত্তম। কারণ কোন কোন সময় দেখা গেছে, এই সময় সেচ দিলে গাছে নতুন পাতা বের হয় ফলে মুকুলের সংখ্যা কমে যায় এবং ফলন কম হয়। আমবাগানে জৈব পদার্থের ঘাটতি থাকলে ধৈঞ্চার চাষ করা যেতে পারে ফলে বাগানে জৈব পদার্থসহ অন্যান্য সার যোগ হবে এবং মাটির উত্পাদন ক্ষমতাও বৃদ্ধি পাবে।