বিনিয়োগ সম্ভাবনায় বাংলাদেশ

বাংলাদেশ বর্তমানে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। এ দেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনাও অপার। চিন, জাপান ও কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশ বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছে। অন্যদিকে কম খরচে উৎপাদন, সাশ্রয়ী মূল্যে শ্রমশক্তি, অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা, সরকারি প্রণোদনাসহ বিভিন্ন সুযোগ কাজে লাগাতে বিদেশি উদ্যোক্তরা দেশকে বেছে নেবেন বলে মনে করে সরকার ও ব্যবসায়ী নেতারা।
সম্প্রতি ‘ডুয়িং বিজনেস ইন বাংলাদেশ : বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড এক্সপোর্ট’ শীর্ষক সরকারি এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যুক্তরাজ্য। সেখানে বলা হয়, বাংলাদেশে বিনিয়োগের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে দুর্নীতিকে বড় বাধা হিসেবে দেখানো হয়। প্রতিবেদনটি বাংলাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ সম্পর্কে ব্রিটিশ বিনিয়োগকারীদের ধারণা ও পরামর্শ দিতে তৈরি করা হয় বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
ঈদের আগে ‘বাংলাদেশ ২০৩০ : নেক্সট বিলিয়ন ডলার অপরচুনিটিজ’ শীর্ষক এ মতবিনিময় সভায় স্থানীয় ব্যবসায়ীরা সম্ভাবনাময় সাতটি খাতের গুরুত্ব তুলে ধরে ঢাকায় অবস্থানরত বিভিন্ন দূতাবাসের কূটনীতিকদের সামনে দেশের বিনিয়োগবান্ধব পরিস্থিতি এবং সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচি ও উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন। সভায় স্থানীয় ব্যবসায়ীরা সম্ভাবনাময় সাতটি খাতের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তারা বিনিয়োগের এসব সুযোগের বিষয় তাদের দেশের উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছে দিতে কূটনীতিকদের প্রতি আহ্বান জানান। সম্ভাবনাময় খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পোশাক, ওষুধ, জাহাজ নির্মাণ, হালকা প্রকৌশল অটোমোবাইল ও অবকাঠামো।
বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, বাংলাদেশ বিনিয়োগের অপার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এ কারণে চিন, জাপান ও কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছে। এখনো কিছুটা সমস্যা থাকলেও জ্বালানির চাহিদা মেটাতে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনসহ নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
‘ডুয়িং বিজনেস ইন বাংলাদেশ : বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড এক্সপোর্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে ব্রিটিশ বিনিয়োগকারীদের জন্য ‘স্পিড মানি’কে (অনানুষ্ঠানিক অর্থ প্রদান বা ঘুষ) বড় ধরনের বাধা বলে উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, বাংলাদেশে দুর্নীতি নিত্যদিনের সমস্যা। দেশটির রাজনীতিবিদ, আমলা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রায়ই ক্ষমতার অপব্যবহার করে। এ ছাড়া স্বচ্ছতার অভাব এবং আমলাতন্ত্রের বাড়াবাড়ি রয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশের বাজারকে মূল্য সংবেদনশীল উল্লেখ করে একে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের তালিকায় রাখা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, চিন ও ভারত থেকে আসা স্বল্পদামের পণ্য অনেক সময় বাংলাদেশের বাজারে প্রভাব বিস্তার করে।
এতে পণ্যের গুণগত মান, স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়, প্রশিক্ষণ এবং বিক্রয়োত্তর সেবার মতো বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে ব্রিটিশ কোম্পানিগুলোকে ব্যবসার পরামর্শ দেওয়া হয়। পাশাপাশি বাংলাদেশে ব্যবসার ক্ষেত্রে মাত্র ১১ দিনে ব্যবসা শুরু করার সুযোগ এবং ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার পরিকল্পনাকে বিনিয়োগের জন্য ইতিবাচক হিসেবে তুলে ধরা হয়।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআইরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর আমাদের সময়কে বলেন, অবশ্যই ঘুষ কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে। সবাকেই ঘুষ দিতে হচ্ছে। যে কোনো কাজ করার ক্ষেত্রে সকল ফি দেওয়ার পর অতিরিক্ত টাকা দিতে হচ্ছে। এটি বন্ধ করতে হবে। তিনি বলেন, সরকারি বেতন এখন অনেক; তাই সরকারকে এ বিষয়ে কঠোর হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী আমাদের সময়কে বলেন, দীর্ঘমেয়াদি নীতি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং শিল্প প্রতিষ্ঠানর সরঞ্জামাদির সহজলভ্যর পাশাপাশি স্থানীয় উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের ফলেই বিদেশিরা আমাদের দেশে বিনিয়োগ করে। তিনি বলেন, বিনিয়োগ বাড়াতে হলে গ্যাস-বিদ্যুতের সংযোগ থাকতে হবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ব্যবসায়ী বলেন, ঘুষ লেনদেন আমাদের একটি কালচারে পরিণত হয়েছে। আমরা এখনো ঘুষ ছাড়া কাজ করতে পারি না। এ কালচার থেকে বের হয়ে আসতে হবে। তা না হলে বিদেশিরা বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন না।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের শিক্ষক শেখ মাশরিক হাসান মেহেদী বলেন, বিনিয়োগকারীরা কম খরচে উৎপাদনের জন্য যেসব গন্তব্যে যাচ্ছে তার চেয়ে বাংলাদেশে কম খরচে উৎপাদন হচ্ছে। এদিক থেকে অবকাঠামো উন্নয়ন হলে এ দেশে বিনিয়োগের অনেক সম্ভাবনা আছে। দেশে দক্ষ শ্রম শক্তি পাশাপাশি স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে সহজে পণ্য বিক্রির সুযোগ আছে। এ কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এগিয়ে আসতে পারে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এ দেশকে প্রাধান্য দিচ্ছে পার্শ্ববর্তী দেশের তুলনায় জ্বালানি খরচ কম। তাছাড়া বিনিয়োগকারীদের জন্য রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল ও অর্থনৈতিক জোন রয়েছে। বিনিয়োগে আকর্ষণীয় প্রণোদনা প্যাকেজ আছে। এশিয়ার অন্য দেশের তুলনায় উৎপাদন ব্যয় অনেক কম। টেকসই ও কমপ্লায়েন্স শিল্প কারখানা গড়ে উঠছে। শিল্পের উন্নয়নে নতুন নীতিতে ১৩টি খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এসব সুযোগে বিনিয়োগ বাড়বে।