বিনিয়োগ মন্দায়ও মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি বাড়ছে

বিনিয়োগ স্থবিরতার মধ্যেও দুই অর্থবছর ধরে শিল্প-কারখানার মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি বাড়ছে। এর মধ্যে বিদায়ী ২০১৪-১৫ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত দেশে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি ঋণপত্র (এলসি) খোলায় ১৫.১৯ শতাংশ এবং নিষ্পত্তিতে ২০.৭৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এর আগের অর্থবছরে (২০১৩-১৪) মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে এলসি খোলায় প্রবৃদ্ধি ছিল ৩৫.৮৮ শতাংশ, নিষ্পত্তিতে ছিল ১৮.৯৫ শতাংশ।

এরও আগের অর্থবছরে (২০১২-১৩) মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির ঋণপত্র খোলায় প্রবৃদ্ধি ছিল ৩০.৩৯ শতাংশ। কিন্তু ঋণপত্র নিষ্পত্তিতে ছিল ১৫.৮৫ শতাংশ ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি। অর্থাৎ ২০১২-১৩ অর্থবছরে আগের অর্থবছরের চেয়ে ১৫.৮৫ শতাংশ ঋণপত্র কম নিষ্পত্তি হয়েছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ করা পরিসংখ্যান থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, সদ্য বিদায়ী অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই থেকে মে পর্যন্ত) দেশের ব্যাংকগুলোতে শিল্প-কারখানার মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির উদ্দেশ্যে ৩৮৭ কোটি ২০ লাখ ডলারের ঋণপত্র খোলা হয়েছে। নিষ্পত্তি হয়েছে ২৭৬ কোটি ৪২ লাখ ডলারের ঋণপত্র। এর আগের (২০১৩-১৪) অর্থবছরের একই সময়ে ঋণপত্র খোলা হয়েছিল ৩৩৬ কোটি ১৫ লাখ ডলারের এবং নিষ্পত্তি হয়েছিল ২২৮ কোটি ৮৯ লাখ ডলারের ঋণপত্র।

দেশে দেড়-দুই বছর ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতাসহ নানা কারণে বিনিয়োগে স্থবিরতা দেখা দিয়েছিল। উদ্যোক্তারা ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া কমিয়ে দিয়েছিলেন। ব্যাংকগুলোর কাছে বিপুল পরিমাণ অর্থ অলস পড়েছিল। এমন পরিস্থিতির মধ্যেও দুই অর্থবছর ধরে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি বেড়েছে। মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি প্রবৃদ্ধিতে অর্থপাচার হয়ে যাচ্ছে কি না, সন্দেহ দেখা দিয়েছে।

তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে ৩৮৭ কোটি ৮১ লাখ ডলারের ঋণপত্র খোলা হয়েছিল। নিষ্পত্তি হয়েছিল ২৫১ কোটি ৩৮ লাখ ডলারের। আর ২০১২-১৩ অর্থবছরে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে ২৮৫ কোটি ৪২ লাখ ডলারের ঋণপত্র খোলা হয়। নিষ্পত্তি হয় ২১১ কোটি ৭১ লাখ ডলারের ঋণপত্র। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ী অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ১০.৬৮ শতাংশ। ২০১৩-১৪ অর্থবছরের পুরো সময় বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১২.২৭ শতাংশ। ঋণ প্রবৃদ্ধির এই হার বিনিয়োগের স্থবিরতা রয়েছে এমনটা বোঝায়।

সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, এটা একটু ভালো করে খতিয়ে দেখা দরকার। কেননা মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির তুলনায় উৎপাদন বাড়েনি। অনেক সময় ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে টাকা সরিয়ে নিয়ে যায়। আবার অনেক সময় পুরনো মেশিন কিনে আনে। এসবের মাধ্যমে টাকা পাচার হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার। বাংলাদেশ ব্যাংক একা এটা পারবে না। এর জন্য কাস্টমস ও রাজস্ব বোর্ডের সহযোগিতা নিতে হবে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমও বিষয়টি খতিয়ে দেখার দরকার বলে মনে করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা সিপিডি থেকে পর্যালোচনা করে দেখেছি মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির কোন কোন ক্ষেত্রে অনেক বেশি প্রবৃদ্ধি। এখানে বেশি মূল্য দেখানো হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার। এ ধরনের অর্থপাচারের প্রবণতা নেই তা বলা যাবে না।’

অর্থনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি বাড়ার ফলে বাণিজ্য ঘাটতিও বেড়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ করা লেনদেন ভারসাম্য সারণি থেকে দেখা যায়, বিদায়ী অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে আমদানির পেছনে ব্যয় হয়েছে তিন হাজার ৭২২ কোটি ৭০ লাখ ডলার। অন্যদিকে রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে দুই হাজার ৭৭৬ কোটি ৩০ লাখ ডলার। আমদানির তুলনায় রপ্তানি কম হওয়ায় পণ্য বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়ায় ৯৪৬ কোটি ৪০ লাখ ডলার।

জুনে স্থানীয় বিনিয়োগের নিবন্ধন প্রস্তাবও তুলনামূলক কমেছে। জুনে স্থানীয় বিনিয়োগের নিবন্ধন প্রস্তাব এসেছে সাত হাজার ৫১০ কোটি ৭৩ লাখ ৯১ হাজার টাকা, যা এপ্রিল মাসের চেয়ে আট হাজার ২১৮ কোটি ৪৫ লাখ ৫২ হাজার টাকা কম। আর মে মাসের চেয়ে তা ৯৮০ কোটি ৬৬ লাখ ৮০ হাজার টাকা কম।