নার্সিং পেশার মান উন্নয়ন ও নার্সিং বিশ্ববিদ্যালয়

রোগীর রোগ নির্ণয় করে প্রেসক্রিপশন লিখে দেয়া ডাক্তারের কাজ। কিন্তু রোগীর সেবা করা নয়, সময়মতো ইনজেকশন পুশ করা, ওষুধ খাওয়ানো, রোগীর সব ধরনের খোঁজখবর নেয়া, রোগীর চলাফেরায় সাহায্য করা_ এসব ডাক্তাররা করেন না। সপ্তাহে দুই-চারদিন রোগীর কাছে এসে রোগীর অবস্থা দেখে প্রেসক্রিপশন লিখে দেয়াই তাদের কাজ। অথচ রোগীকে রাত-দিন সেবা শুশ্রূষা দিয়ে যারা সুস্থ করে তোলে তারাই হলো নার্স বা সেবিকা। যাদের অনবরত সেবা, শ্রম ও ভালোবাসায় প্রতিদিন হাজার হাজার রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরে। যাদের সেবায় মানসিক রোগীর মতো জটিল রোগীকেও সারিয়ে তোলে, আমাদের দেশে তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থান সন্তোষজনক নয় বরং হতাশাজনক। কর্মক্ষেত্রে কাজ করতে গিয়ে তাদের পড়তে হয় নানা সমস্যায়। কর্মক্ষেত্রে হরহামেশায় শারীরিক নির্যাতনেরও শিকার হতে হয়। অথচ দেশের হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোয় নার্সের সংকট তীব্র। ৬৩০০ লোকপ্রতি মাত্র একজন নার্স।ডাক্তারের পরই চিকিৎসার দ্বিতীয় কাতারে অতন্দ্র কর্মী হিসেবে কাজ করার কথা এ নার্সদের। সঠিকভাবে করতে পারেন একজন প্রশিক্ষিত নার্স। যার মন ও মানসিকতা সর্বদা মানবসেবার জন্য নিবেদিত। ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল যুদ্ধাহতদের সেবা করার মহান কাজটি শুরু করেছিলেন। তারপর থেকেই নার্সিং পেশার ক্ষেত্র বিস্তৃত হতে থাকে। নার্সরা এখন আর শুধু যুদ্ধে আহতদের সেবাই করে না, প্রতিটি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে রোগীর সেবা-যত্ন করে যাচ্ছে তারা। দিনে দিনে এ পেশা স্বীকৃতি পেয়েছে এক মহান পেশায়। অনেকের ধারণা, নার্সিং মেয়েদের পেশা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে এ ধারণা পরিবর্তন হয়েছে। নার্সিংয়ে আজ শুধু মেয়েরা নয় ছেলেরাও রয়েছে।বিশ্বে এমন অনেক পেশা আছে যা এক সময় খুব ছোট করে দেখা হতো। এখন সময় পাল্টেছে ছোট করে দেখা সে পেশাগুলোর অনেক পেশারই চাহিদা এবং সম্মান রয়েছে। নার্সিং সেরকমই একটি পেশা। বর্তমান বিশ্বে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন নার্সদের চাহিদা প্রচুর। আগামী ৫ বছরে শিল্পোন্নত কানাডা, ইউএসও, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া দেশগুলোতে কমপক্ষে ২ লাখ নতুন নার্সের প্রয়োজন। নার্সিং পেশা সর্বব্যাপী। একজন আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ট্রেড নার্স বিশ্বের যে কোন দেশে ভালো বেতনে চাকরির সুযোগ পেয়ে থাকেন।আধুনিক নার্সেস প্রশিক্ষণে রয়েছে ২ শত বছরের অতীত ঐতিহ্য ও প্রাচীন ইতিহাস। লিন্ডা রিচার্ডস আমেরিকার প্রথম ও পেশাদার ও প্রশিক্ষিত নার্স হিসেবে ১৮৭৩ সালে বোস্টনের নিউইংল্যান্ড হসপিটাল ফর উইম্যান অ্যান্ড চিন্ড্রেন থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে নিউজিল্যান্ডে জাতীয় পর্যায়ে নার্সদের নিবন্ধিত করা হয়। ১২ সেপ্টেম্বর, ১৯০১ সালে নার্সেস রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট প্রণীত হয়। এলেন ডাফার্টি ছিলেন নিউজিল্যান্ডের প্রথম নিবন্ধিত নার্স। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম অঙ্গরাজ্য হিসেবে নর্থ ক্যারোলিনায় নার্সিং লাইসেন্স ল ১৯০৩ সালে গৃহীত হয়।১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের আগে তদানীন্তন পূর্ব বাংলায় তিনটি জুনিয়র নার্সিং স্কুলে এদেশে নার্সিং প্রশিক্ষণ দেয়া হতো। পরবর্তীতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রথম সিনিয়র নার্সিং স্কুল চালু হয়। এদেশে নার্সিং শিক্ষার উন্নতির জন্য ১৯৪৯ সালে কয়েকজন নার্সকে সরকারিভাবে ইংল্যান্ডে পাঠানো হয়। ১৯৬০ সালে জুনিয়র নার্সিং স্কুলের বিলুপ্তি ঘটিয়ে পর্যায়ক্রমে ১৯৬২ থেকে ১৯৭০ সালের মধ্যে দেশের সরকারি ৮টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সিনিয়র নার্সিং স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে ১৯৭১ সালের মধ্যে দেশের ১২টি জেলা সদর হাসপাতালে আরও ১২টি সিনিয়র নার্সিং স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে নার্সিং প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে সরকারি ৩৮টি ও বেসরকারি ৫টি নার্সিং ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ৩ বছরমেয়াদি জেনারেল ডিপ্লোমা নার্সিং ও ১ বছরমেয়াদি মিডউইফারি ও অর্থোপিডিক নার্সিং ডিপ্লোমা প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। প্রতিবছর প্রায় ১৫০০ শিক্ষার্থী নার্সিং প্রশিক্ষণ গ্রহণ করার জন্য এসব ইনস্টিটিউটে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়। নার্সিং ইনস্টিটিউটগুলো Bangladesh Nursing Council (BNC) দ্বারা পরিচালিত হয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে BNC প্রতিষ্ঠিত হয়। এর আগে ১৮৫২ সাল হতে এদেশে নার্সিং কার্যক্রম নিয়ন্ত্রিত হত তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান নার্সিং কাউন্সিলের মাধ্যমে।১৯৭০ সালে ঢাকায় নার্সিং মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। নার্সিং মহাবিদ্যালয়টি ১৯৭৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক স্বীকৃতি লাভ করে। বর্তমানে এই কলেজে ২ বছরমেয়াদি পোস্ট বেসিক B.Sc নার্সিং ওB.Sc Public Health Nursing ডিগ্রি কোর্স চালু আছে।২০০৮ সাল থেকে পুরাতন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সংলগ্ন ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুর, ময়মনসিংহ, সিলেট, বরিশাল ৭টি নার্সিং ইনস্টিটিউটকে নার্সিং কলেজ রূপান্তরিত করা হয়। ৪ বছরমেয়াদি বিএসসি ইন নার্সিং কোর্সে, এসএসসি ও এইচএসসি বিজ্ঞান বিভাগ। প্রতিবছর ১০০ জন ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি করা হয়। কোর্স পরিচালনা করে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। প্রথমদিকে আসন খালি থাকলেও বর্তমানে মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস কোর্সের মতো তীব্র প্রতিযোগিতা হয়। বেসরকারিভাবে আরও ১১টি নার্সিং কলেজ সীমিত আকারে নার্সিং শিক্ষা চালু করা হয়।দেশে সরকারিভাবে পেশাভিত্তিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়, টেঙ্টাইল বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বিশেষায়িত আরও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। অথচ নার্সিং পেশার মত জনগুরুত্বপূর্ণ পেশায় সরকারি-বেসরকারিভাবে কোন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। জনগণের সুচিকিৎসা স্বাস্থ্য রক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবার বিষয়টি সরকারের কাছে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাচ্ছে। স্বাস্থ্য খাতে প্রতিবছর হাসপাতাল বাড়ছে, বাড়ছে শয্যা সংখ্যা ও ডাক্তার।পাশাপাশি প্রশিক্ষিত নার্সদের সংকট ও কদর দুইই বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে চালুকৃত নার্সিং কলেজ থেকে উচ্চ শিক্ষিত পর্যাপ্তসংখ্যক প্রশিক্ষিত নার্স তৈরি করে চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। আলোকিত নার্স তৈরির কারিগর, ভালো প্রশিক্ষক, সুষ্ঠু ও যুগোপযোগী বাস্তবসম্মত সিলেবাস এবং অনুশীলনের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নেই। নার্সিং শিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলো তত্ত্বাবধান করার জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষ নেই।এ কারণে নার্স শিক্ষক, নার্স প্রশাসক এবং নার্স ব্যবস্থাপকের সংকট তীব্র হচ্ছে। পাবলিক হেলথ নার্সিং, নার্সিংয়ে অনার্স, মাস্টার্স ডিগ্রি, পিএইচডি এবং এমফিল চালু করে দক্ষতা ও উচ্চতর শিক্ষার পথ প্রশস্থ করা সময়ের দাবি। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশসমূহে তাই করছে।সেবিকাদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ উচ্চতর অবস্থান নার্সিংকরণে দেশে আন্তর্জাতিকমানের একটি নার্সিং বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।