মানব পাচার প্রতিরোধে তিনটি বিধিমালা হচ্ছে

মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিচার হবে ট্রাইব্যুনালে

রোজিনা ইসলাম: মানব পাচার প্রতিরোধে তিনটি বিধিমালা করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ ছাড়া মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য সাত বিভাগে ট্রাইব্যুনাল গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই ট্রাইব্যুনাল না হওয়া পর্যন্ত এ-সংক্রান্ত মামলার বিচার হবে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে।

আইন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলেছে, বর্তমানে মানব পাচার আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে। বিশেষ করে সাগরপথে। মানব পাচার আইনে অপরাধ হলেও অনেক ক্ষেত্রে পাচারকারীদের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে পাসপোর্ট আইনে। মানব পাচারের বিরুদ্ধে কঠোর আইন থাকলেও তা কার্যকর হচ্ছে না। এ কারণে তিনটি বিধিমালা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২-এর ৪৩ ও ৪৬ ধারার ক্ষমতাবলে এসব বিধিমালা করা হবে। এগুলো হলো: জাতীয় মানব পাচার দমন সংস্থা বিধিমালা ২০১৫, মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন বিধিমালা ২০১৫ এবং মানব পাচার প্রতিরোধ ও তহবিল বিধিমালা ২০১৫। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ তিনটি বিধিমালার খসড়া ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে।

আইন মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলেছে, মানব পাচার-সংক্রান্ত মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিভাগীয় শহরগুলোতে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ছাড়া কক্সবাজার, যশোর ও নড়াইলের মানব পাচারের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ট্রাইব্যুনাল গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে মানব পাচার-সংক্রান্ত জাতীয় কর্মপরিকল্পনাবিষয়ক বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ও সুপারিশ করা হয়।

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক প্রথম আলোকে বলেন, মানব পাচার বন্ধে তাঁরা নানা ধরনের উদ্যোগ নিয়েছেন। এর মধ্যে এ ধরনের অপরাধ দমনে একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে জনপ্রশাসন এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠিয়েছে আইন মন্ত্রণালয়। বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন হওয়ার আগ পর্যন্ত আপাতত এ-সংক্রান্ত সব মামলা বিচার হচ্ছে জেলা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে। তিনি বলেন, বিভাগীয় পর্যায়ে মানব পাচারের মামলাগুলোর বিচার হলে ঘটনার শিকার লোকজনের বিচার পাওয়া সহজ হবে।

আইন মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলেছে, মানব পাচার-সংক্রান্ত ৫৫৭টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ২৫৭টি মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। ১২টি মামলার রায় হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে অপরাধ হলেও অনেক ক্ষেত্রে পাচারকারীদের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে পাসপোর্ট আইনে। মানব পাচার আইনে সংঘবদ্ধভাবে মানব পাচারের অপরাধে সর্বনিম্ন সাত বছর কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। মানব পাচার মামলার বিচারের বিষয়ে এ আইনে দায়রা জজ বা অতিরিক্ত দায়রা জজ পদমর্যাদার বিচারককে নিয়ে যেকোনো জেলায় ট্রাইব্যুনাল গঠনের কথাও বলা আছে।

সূত্র বলেছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত মানব পাচার-সংক্রান্ত কর্মপরিকল্পনাবিষয়ক বৈঠকে বলা হয়, বাংলাদেশ মূলত মানব পাচারের উৎস দেশ হিসেবে পরিচিত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ট্রানজিট ও গন্তব্য দেশ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। বৈঠকে মানব পাচার প্রতিরোধে কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী, বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। এ ছাড়া উপকূল ও সমুদ্রে চলাচলকারী নৌযান ট্রলার এবং এসব যানে কর্মরত ব্যক্তির রেজিস্ট্রেশন দ্রুত করতে হবে। মালয়েশিয়ায় বৈধভাবে আরও অধিক হারে লোক পাঠানোর বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতি সুপারিশ করা হয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেন, টেকনাফসহ সীমান্তবর্তী এলাকার হঠাৎ করে ধনী হওয়া ব্যক্তিদের বিষয়ে তদন্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেন, কক্সবাজার, টেকনাফ ও উখিয়াতে চেয়ারম্যান, মেম্বারসহ স্থানীয় প্রশাসনের বিভিন্ন ব্যক্তি মানব পাচারের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। তদন্তের মাধ্যমে এসব ব্যক্তিকে শনাক্ত করে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ছাড়া টেকনাফসহ সীমান্তবর্তী এলাকায় কিছু অসাধু কর্মকর্তা দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকেন। এঁরা যাতে একই কর্মস্থলে বেশি দিন না থাকতে পারেন এবং বদলি হয়ে আবার একই স্থানে না আসতে পারেন সে বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে। জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে গঠিত মানব পাচার প্রতিরোধ কমিটির তদারক কার্যক্রমও জোরদার করতে হবে।

কর্মকর্তারা আরও বলেন, মানব পাচার বন্ধে জাল পাসপোর্ট-সংক্রান্ত বিষয়ে তদন্তাধীন মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে। মিয়ানমারের নাগরিকসহ বিদেশি কোনো নাগরিক যেন জরুরি ফি দিয়ে বিনা ভেরিফিকেশনে পাসপোর্ট নিতে না পারেন সে জন্য বিনা ভেরিফিকেশনে পাসপোর্ট দেওয়া নিরুৎসাহিত করতে হবে।
স্বরাষ্ট্রসচিব মোজাম্মেল হক খান প্রথম আলোকে বলেন, বিধিমালা হলে মানব পাচারের মামলার বিচার সহজ হবে। তিনি বলেন, অশিক্ষা ও অজ্ঞতার কারণে লোকজন দালালদের ফাঁদে পড়ে অবৈধভাবে সমুদ্রপথে বিদেশে যাচ্ছে। এটি বন্ধে এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মানব পাচার প্রতিরোধের জন্য সরকারি, বেসরকারি সংস্থা, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সমন্বিতভাবে কাজ করবে।