রপ্তানি লক্ষ্য ৩৩৫০ কোটি ডলার

চলতি অর্থবছরের জন্য দেশের পণ্য রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৩ হাজার ৩৫০ কোটি মার্কিন ডলার নির্ধারণ করেছে সরকার। এ ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ৩৮ শতাংশ। তবে গত অর্থবছর রপ্তানির প্রবৃদ্ধি ছিল সাড়ে ৩ শতাংশের কম।
অবশ্য রপ্তানি আয়ের এবারের লক্ষ্যকে বাস্তবসম্মত ও অর্জনযোগ্য বলছেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ভাইস চেয়ারম্যান শুভাশীষ বসু। ব্যবসায়ীরা এ মতের সঙ্গে একমত হলেও নতুন সংযোগসহ নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ, বিদেশে থাকা বাংলাদেশের হাইকমিশনকে কার্যকর ও উদ্যোগী করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ইপিবির কার্যালয়ে গতকাল রোববার বিকেলে এক অনুষ্ঠানে চলতি ২০১৫-১৬ অর্থবছরের জন্য রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করা হয়। শুভাশীষ বসুর সভাপতিত্বে এতে প্রধান অতিথি ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্যসচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন, এফবিসিসিআইয়ের সহসভাপতি মাহবুব আলম, বিজিএমইএর সহসভাপতি শহিদউল্লাহ আজিম প্রমুখ।
গত ২০১৪-১৫ অর্থবছরের জন্য ৩ হাজার ৩২০ কোটি ডলারের রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল সরকার। শেষ পর্যন্ত আয় হয় ৩ হাজার ১২০ কোটি ডলার, যা তার অর্থবছরের চেয়ে ৩ দশমিক ৩৫ শতাংশ বেশি। তবে এই আয় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৬ শতাংশ কম ছিল।
রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি কমার বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়ে তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘২০১৩-১৪ অর্থবছরে ১০০ কোটি ইউনিট তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে। গত অর্থবছর সেটি বেড়ে ১৫৭ কোটি ইউনিট হয়। তার মানে প্রবৃদ্ধি ৫৭ শতাংশ। তবে পণ্যের মূল্যের দিক থেকে আমরা পিছিয়ে পড়েছি। এ জন্য তিনি ডলারের বিপরীতে ইউরো-রুবলের দরপতন ও টাকার শক্তিশালী হওয়া এবং বছরের শুরুর দিকে বিএনপির ৯২ দিনের হরতাল-অবরোধকে দায়ী করেন।’ তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করছি এবার লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারব।’
গত অর্থবছরের চেয়ে এবারের লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৩০ কোটি ডলার বেশি ধরে ৩ হাজার ৩৫০ কোটি ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে। এ বিষয়ে শুভাশীষ বসু বলেন, ‘গত অর্থবছর প্রবৃদ্ধিতে কোনো ধারাবাহিকতা ছিল না। তবে এবার আমরা প্র্যাকটিক্যাল প্রবৃদ্ধি নির্বাচন করেছি।’
রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে ১৪টি বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে বলে জানান ইপিবির এই ভাইস চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, গত বছরের মাসওয়ারি রপ্তানিপ্রবণতা, চিলি ও থাইল্যান্ডের শুল্ক ও কোটাসুবিধা, লাতিন আমেরিকার নতুন বাজার, মন্দা কাটিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিশ্ববাজারে ভোগ্যপণ্যের মূল্য হ্রাস, ইউরো ও রুবলের দরপতন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থনৈতিক মন্দা ধীরে কাটিয়ে ওঠা, ডলারের বিপরীতে টাকা শক্তিশালী, হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তর ইত্যাদি বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
তৈরি পোশাক খাত থেকে গত অর্থবছর রপ্তানি আয়ের ৮১ শতাংশ এসেছে। রপ্তানি হয়েছে ২ হাজার ৫৪৯ কোটি ডলার, প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশ। এবার খাতটির রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ হাজার ৭৩৭ কোটি ডলার। আর প্রবৃদ্ধি হবে ৭ দশমিক ৩৬ শতাংশ। এ ছাড়া পাট ও পাটজাত পণ্যে ৯৪ কোটি, হোম টেক্সটাইলে ৮৫, পাদুকায় ৭৫, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য ৬৬, কৃষিজাত পণ্য ৫৯, হিমায়িত খাদ্য ৫৭, প্রকৌশল পণ্যে ৩৮ কোটি ডলারের রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

ভিন্নমত
চলতি ২০১৫-১৬ অর্থবছরের জন্য ৭ দশমিক ৩৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে ৩ হাজার ৩৫০ কোটি ডলারের রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে মধ্যমেয়াদি বাজেটকাঠামো অনুযায়ী চলতি অর্থবছর মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ অর্জন করতে হলে রপ্তানি আয়ে ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি লাগবে। তাই প্রশ্ন থেকে যায়, রপ্তানিতে নিম্নমাত্রার এই প্রবৃদ্ধি দিয়ে ৭ শতাংশ জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব কি না।
রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রাটি কতটা বাস্তবসম্মত হয়েছে জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরের জন্য পোশাক রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ৩৬ শতাংশ। তবে গত ডিসেম্বরে বিজিএমইএ ২০২১ সালের মধ্যে পোশাক রপ্তানি পাঁচ হাজার কোটি ডলারে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। সেটি অর্জন করতে হলে প্রতিবছর গড়ে ১১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দরকার। তবে গত অর্থবছর এ খাতের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য অনুযায়ী না হওয়ায় এখন সেটি বেড়ে ১৬ শতাংশে চলে গেছে।
সিপিডির এই গবেষক বলেন, ‘চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রপ্তানি আয় অবশ্যই অর্জন করা উচিত। এ জন্য বড় রকমের পরিবর্তন দরকার নেই। বরং আমাদের সক্ষমতা পুরোপুরি ব্যবহৃত হচ্ছে না। তৈরি পোশাকশিল্পে সংস্কার কার্যক্রম অনেকখানি হলেও ক্রেতাদের আত্মবিশ্বাস কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ফিরছে না। এ বিষয়ে কাজ করা দরকার।’