দেশের আরও অগ্রগতি এবং করণীয়

ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ

বাংলাদেশ গত ৬ বছরে গড়ে ৬.২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। এ বিষয়ে অনেকেই বলছেন বাংলাদেশ ৬-এর চক্করে আটকে আছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এই অর্জন বেশ কয়েক বছর থেকে বিশ্ব মন্দা একদিকে এবং অপরদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থাকা সত্ত্বেও। এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নিচে নামাটা সহজ ছিল। অর্জনটা ধরে রাখা সহজ ছিল না। উন্নয়নশীল বিশ্বে অনেক দেশ প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে বিগত বছরগুলোতে পিছিয়ে গেছে। কাজেই আমি মনে করি বাংলাদেশ কঠিন কাজটি করতে সক্ষম হয়েছে এবং তা অবশ্যই প্রশংসনীয়।

বিশ্ব মন্দার কথা বাদ দিলেও এক হিসাবে দেখা যায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিভিন্ন ধরনের ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেশের উপর যে অভিঘাত ফেলেছে তার ফলে প্রবৃদ্ধিতে বিরূপ প্রভাব পড়েছে। এক হিসাবে দেখা যায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই অধিক অভিঘাত না ঘটলে প্রবৃদ্ধি আরও ১.৫ শতাংশ সংখ্যা বেশি হতে পারতো। উল্লেখ্য, সিডর, আইলার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটলে ত্রাণ ও পুনর্বাসনের প্রয়োজন হয় বিশাল এবং ব্যাপক। এই কাজের জন্য অর্থ সংগ্রহ করবার ক্ষেত্রে অনেক সময় উন্নয়ন বাজেট থেকে অর্থ স্থানান্তর করতে হয়। যে অর্থনৈতিক অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে হয় তা অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রক্রিয়াতেও এর বিরূপ প্রভাব পড়ে।

তবে প্রবৃদ্ধির এই অর্জনে আত্মতুষ্টির কোন সুযোগ নেই। অবশ্যই প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করবার লক্ষ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তার জন্য বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। এ ক্ষেত্রে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অভাব। এ ছাড়াও রয়েছে অবকাঠামোগত ঘাটতি। বিদ্যুতের উত্পাদন অনেক বাড়লেও চাহিদা দ্রুত বাড়ার ফলে অর্থনৈতিক উন্নতির বিকাশ বিদ্যুত্ ঘাটতির কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রেও একই মন্তব্য খাটে। এই দুই ক্ষেত্রেই আরও তত্পরতা বাড়াতে হবে। জ্বালানি খাতকে বর্তমান বাজেটে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে এবং সঙ্গত কারণেই তার যথাযথ বাস্তবায়ন ঘাটতি কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। গ্যাসের ক্ষেত্রে দীর্ঘ মেয়াদে প্রাপ্যতা বাড়ানোর লক্ষ্যে স্থলভাগ এবং সমুদ্রে অনুসন্ধান জোরদার করতে হবে। এটিও সরকারের নীতিকাঠামোয় উল্লেখযোগ্যভাবে বিদ্যমান। তবে প্রয়োজন বাস্তবায়নে আরও দৃঢ়তা এবং স্বচ্ছতা। সমুদ্রে অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সক্ষমতা স্বল্প কাজেই এক্ষেত্রে ন্যায়ানোগ চুক্তির ভিত্তিতে উপযুক্ত বিদেশি কোম্পানি নিয়োগ দেয়ার ক্ষেত্রে আরও দ্রুততার সঙ্গে কাজ করতে হবে। এছাড়া রাস্তাঘাট এবং বন্দরে বিদ্যমান সমস্যা সমাধানে সরকার সচেষ্ট থাকলেও অগ্রগতি আরও দ্রুততার সঙ্গে ঘটা প্রয়োজন।

বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দেশ থেকে বিদেশে অর্থ পাচার অবশ্যই একটি সমস্যা। বাংলাদেশে জাতীয় সঞ্চয়ের হার থেকে বিনিয়োগের হার বেশ খানিকটা কম। ধরে নেয়া যায় এই অর্থ দেশে নেই বিদেশে পাচার করা হয়ে গেছে। বিদেশে সম্পদ পাচার বন্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। অবশ্য অর্থ বিনিয়োগের দিকে ধাবিত করতে হলে উপরে উল্লেখিত ঘাটতিগুলো দূর করবার ক্ষেত্রে যথাযথ অগ্রগতি প্রয়োজন।

বিদেশ থেকে যে রেমিটেন্স আসছে তা বছরের হিসাবে ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ১ শত ১৭ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। তবে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী এর মাত্র ১০ শতাংশ উত্পাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করা হয়। যথাযথ পরিকল্পনা ও ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে রেমিটেন্স থেকে বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব। অবশ্য একথা বলতে হবে যে, রেমিটেন্স-এর কারণে দেশের বাজারে অনেক পণ্যের চাহিদা বেড়েছে। ফলে সেগুলোর উত্পাদনেও অগ্রগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

বাংলাদেশে যে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হচ্ছে তার পেছনে যে শক্তিগুলো কাজ করছে তার মধ্যে ক্রমবর্ধমান রপ্তানি আয় বিশেষ করে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয়। ক্রমাগত রেমিটেন্সে ঊর্ধ্বগতি এবং তথ্য-প্রযুক্তির ব্যাপক বিকাশ অবশ্যই উল্লেখযোগ্য। তবে আমার বিবেচনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতির সাম্প্রতিক বিকাশ। এটি শুধু কৃষিখাতে নয়, বরং কৃষি বহির্ভূত বিভিন্নখাতে দ্রুত ঘটছে। ইতিমধ্যেই সারা দেশে নানান ধরনের ক্ষুদ্র উদ্যোগ সৃষ্টি হচ্ছে এবং এগিয়ে চলেছে। কৃষিতেও শুধু শস্য নয়, পশু, হাঁস, মুরগি, মাছ,ফল,ফুল এই সব ক্ষেত্রেও লক্ষণীয় অগ্রগতি ঘটছে। অকৃষিক্ষেত্রে কৃষিপণ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণ কৃষিসহায়ক ছোট-খাট যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ তৈরি, জুতা তৈরি, নানা ধরনের সৌখিন জিনিসপত্র তৈরি, বাঁশ-বেত লোহাসহ বিভিন্ন ধরনের কাঁচামালভিত্তিক ব্যবহারিক জিনিসপত্রসহ নানা ধরনের সেবায় ব্যাপক তত্পরতা লক্ষণীয়। এই সব কর্মকাণ্ডে যদি অর্থায়ন, প্রশিক্ষণও প্রযুক্তিগত এবং বাজারজাতকরণ বিষয়ে সহায়তা প্রদান করা হয় তাহলে এ ধরনের কর্মকাণ্ড বাংলাদেশে বিশেষ করে গ্রামীণ খাতে ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করবে। ফলে স্বকর্মসংস্থান এবং মজুরিভিত্তিক কর্মসংস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। অপেক্ষাকৃত স্বল্প সম্পদের অধিকারী এবং দরিদ্র মানুষরাই এই সকল কর্মকাণ্ডে উদ্যোগ নিচ্ছে ও নেবে এবং এখানে তাদের মধ্য থেকেই মানুষ কর্মসংস্থানে ব্যাপৃত হবে। অর্থাত্ দরিদ্রদের বা পিছিয়ে পড়াদের আয় বাড়বে, তা বৈষম্য কমিয়ে আনতে সহায়ক হবে। অবশ্যই তাদের অর্জন জাতীয় আয় বৃদ্ধিতেও অবদান রাখবে। এর অর্থ এই দাঁড়াচ্ছে যে, এ সকল কর্মকাণ্ড একই সাথে দারিদ্র্য নিরসনে, বৈষম্য হ্রাসে এবং জাতীয় আয় বৃদ্ধিতে অবদান রাখে। যে অগ্রগতি ইতিমধ্যে ঘটেছে তাকে এগিয়ে নিতে এবং টেকসই ধারায় স্থাপন করতে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর দিকে অবশ্যই নজর দিতে হবে। অর্থাত্ অর্থনৈতিক নীতি কাঠামো-বিন্যাস এমনভাবে করতে হবে যাতে আর্থ-সামাজিক অগ্রগতি ন্যায্যভাবে সুবণ্টিত হতে পারে। এই ধারণা সরকারের ভিশন ২০২১-এ বিধৃত আছে।

কৃষি অনেক বিকশিত হয়েছে। যখন কোন পণ্যের উত্পাদন চাহিদার তুলনায় অনেক বেড়ে যায় তখন কৃষক তার ন্যায্য দাম পান না। এটা নতুন সমস্যা নয়, এটা অতি পুরনো সমস্যা এদেশের জন্য। কয়েকটি পদক্ষেপ নিলে এই সমস্যার সমাধান হতে পারে। এরমধ্যে রয়েছে কৃষকদের স্থানীয় বা অন্যান্য পর্যায়ে সংগঠিত হতে হবে। যাতে তারা বাজারের উপর কিছুটা প্রভাব বিস্তার করতে পারেন। অর্থাত্ তারা এক সাথে কাজ করে ফসল উঠানোর সঙ্গে-সঙ্গেই তা বাজারজাত না করে কিছুদিন ধরে রাখতে পারেন। সেদিকে সম্মিলিতভাবে প্রচেষ্টা নিতে পারেন। এছাড়াও অবশ্য গোদামের প্রয়োজন পণ্য ধরে রাখার জন্য। সেক্ষেত্রে সরকার বা বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সহায়তা করতে পারে। এছাড়াও যেহেতু ফসল উঠার পরপরই কৃষকদের ঋণ ফেরত দেয়া এবং কিছু কিছু সামাজিক কর্মকাণ্ডের জন্যে অর্থের প্রয়োজন হয় তাই সহজশর্তে ঐ সময়ের জন্য তাদেরকে ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন হবে। এছাড়াও আমি মনে করি এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যাপক ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। এ বিষয়ে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং ব্যাংক ও অন্যান্য অর্থায়নকারী সংস্থার ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড সম্প্রসারিত হলে শুধু কৃষক লাভবান হবে তা নয় ব্যাপক আকারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে যাতে ভূমিহীন ও অন্যান্য শ্রমিক কাজ পাবেন এবং তাদের আয় বাড়বে। উল্লেখ করা যায়, গ্রামীণ খাতে মজুরি বর্তমানে চালের হিসাবে দৈনিক ৯-১০ কেজি। এটা আগের তুলনায় অনেক বেশি। তবে তারা সারাবছর কাজ পান না। কৃষি মৌসুমেই তাদের কর্মসংস্থান বেশি হয়। যদি প্রক্রিয়াজাতকরণে অগ্রগতি হয় তাহলে অন্যান্য মৌসুমেও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে যা থেকে তারাও লাভবান হবেন।

এ বলে শেষ করা যায় যে, আমরা নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ হিসাবে ইতোমধ্যে উন্নীত হয়েছি। স্বল্পোন্নত দেশ থেকেও প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বেড় হয়ে আসার। এই প্রক্রিয়া অবশ্য আয় ছাড়াও মানব সক্ষমতা ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি নির্ধারিত পর্যায়ে উন্নীত হতে হবে। এই দুদিকই আমাদের অগ্রগতি যথেষ্ট। নির্ধারিত মাত্রা অর্জনে খুব বেশি সময় লাগার কথা নয়। তবে লক্ষ্য রাখতে হবে আমাদের এই এগিয়ে চলা টেকসই হতে হলে তা হতে হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ন্যায়ভিত্তিক। প্রত্যেকেই যাতে তার ন্যায্য অধিকার পায় সে ব্যবস্থা করতে হবে। অর্থাত্ সকলকে ন্যায্যভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে কাউকে বাদ দেয়া যাবে না।

n লেখক : অর্থনীতিবিদ